করোনার আঘাতে বিপর্যস্ত জাপানের অর্থনীতি

বিজ্ঞাপন
default-image

জাপানে করোনাভাইরাসের সংক্রমণে ইতি টানার লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। চিহ্নিত সংক্রমণের দৈনিক হারে ওঠানামা দেখা গেলেও রাজধানী টোকিওসহ বড় শহরগুলোতে করোনার দাপট এখনো বিরাজমান। অন্যদিকে সংক্রমণ মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া প্রাথমিক কিছু কঠোর পদক্ষেপ অর্থনীতিকে বিপদে ফেললেও সংক্রমণ সামাল দেওয়া এখনো সম্ভব হয়নি। ফলে জাপান সরকার এখন আর সে রকম পথে না এগিয়ে; বরং নাগরিকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করার মধ্য দিয়ে করোনার ধাক্কা সামলে ওঠার চেষ্টা করছে।
জাপানে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বাধ্যতামূলকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ এখন আর দেওয়া হচ্ছে না। বরং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে অর্থনীতিকে সক্রিয় রাখতে সরকার অনেক বেশি তৎপর। তবে তা সত্ত্বেও অর্থনীতিতে এর কোনোরকম ইতিবাচক প্রভাব এখনো দেখা যাচ্ছে না। বরং জাপানের অর্থনীতি যে এখনো নিম্নমুখী পথে হাঁটছে, তার কিছু প্রমাণ উঠে এসেছে সাম্প্রতিক সময়ের কিছু পরিসংখ্যানগত হিসাবে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

জাপান সরকার বলছে, গত সোমবার পর্যন্ত করোনাভাইরাসের কারণে সারা দেশে যাঁরা চাকরিচ্যুত হয়েছেন, তাঁদের সংখ্যা এখন দাঁড়িয়েছে মোট ৫০ হাজার ৩২৬। শ্রম মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, মাসিক ভিত্তিতে চাকরি হারানো মানুষের সংখ্যা সামান্য কমে এলেও এখনো তা উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। মে থেকে শুরু করে জুলাই মাস পর্যন্ত প্রধানত নিম্ন আয়ের খণ্ডকালীন কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রতি মাসে চাকরি থেকে ছাঁটাই হওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল আনুমানিক ১০ হাজার। আগস্ট মাসে তা ১ হাজার হ্রাস পেয়ে নেমে আসে ৯ হাজারে।
চাকরি হারানো লোকজনের মধ্যে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক হচ্ছেন শিল্প খাতে কাজ করা মানুষ এবং এরপর আছে সেবা খাত। সরকার অবশ্য কোম্পানির কর্মীদের বেলায় ছুটি–সম্পর্কিত ভর্তুকি প্রদানের একটি ব্যবস্থা কার্যকর করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে বেকারত্বের হার নিম্নপর্যায়ে ধরে রাখছে। এ ব্যবস্থার অধীন কর্মচারীদের ছাঁটাই না করে স্বল্পকালীন ছুটিতে যেতে বাধ্য করা হয় এবং সরকারের কাছ থেকে এর মধ্য দিয়ে ভর্তুকি পাওয়া যায়। ছুটিতে থাকার সময়ের মেয়াদ সরকার এখন ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বাড়িয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। ফলে বেসরকারি খাতের প্রচুর কর্মচারী ছাঁটাই হওয়া সত্ত্বেও জুলাই মাসে জাপানে বেকার জনসংখ্যার হার ছিল ২ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে পরিস্থিতির বদল না হলে বেকার জনসংখ্যার হিসাব খুব শিগগির ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বড় আকারের বিভিন্ন কোম্পানি আর্থিক অবস্থানগত কারণে কর্মচারী ছাঁটাইয়ের পর নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারলেও খুচরা বিক্রি ও রেস্তোরাঁ ব্যবসার অনেক কোম্পানিকে সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়তে হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের এ রকম প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করার সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে জাপানে এ পর্যন্ত মোট ৪৪৬টি প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে পড়ে, যাদের সম্মিলিত ঋণ দায়বদ্ধতার পরিমাণ হচ্ছে ২৫ হাজার কোটি ইয়েনের মতো।
ফেব্রুয়ারি মাসে আইচি জেলার একটি জাপানি পান্থশালা করোনাভাইরাসের কারণে প্রথম নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করেছিল। এরপর থেকে ভাইরাসের সংক্রমণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জাপানজুড়ে এ প্রবণতা বিস্তৃত হয়। অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো ইঙ্গিত এখনো পর্যন্ত না পাওয়া যাওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে যে দেউলিয়া হয়ে পড়ার এই গোলকধাঁধা থেকে জাপান হয়তো শিগগিরই বের হয়ে আসতে পারবে না।
অন্যদিকে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে বড় আকারের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা করপোরেট সংস্থার মুনাফার আনুমানিক ২০ শতাংশ হ্রাস পাওয়ার হিসাব দিয়েছে জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয়। ২০০৮ সালের বিশ্ব আর্থিক সংকটের পরের সবচেয়ে খারাপ অবস্থার প্রতিফলন এই হিসাবে পাওয়া যায়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক জরিপে দেখা যায়, দেশজুড়ে বছরওয়ারি হিসাবে বিক্রি হ্রাস পেয়েছে ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ এবং চলতি মুনাফা ৪৬ দশমিক ৬ শতাংশ কমে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর মধ্যে আছে হোটেল ও পানাহারের জায়গার মতো বিভিন্ন সেবাপ্রতিষ্ঠান। এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে যেখানে মুনাফা হ্রাস পেয়েছে ৫৩ দশমিক ৭ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বড় আকারের কোম্পানির অবস্থাও ভালো নেই। তবে এদের শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তি বিক্রি ও মুনাফা হ্রাস পাওয়া সত্ত্বেও বিপদ এড়িয়ে চলতে সাহায্য করছে। মোটরগাড়িশিল্পের বেলায় যেমন দেশে ও বিদেশে গাড়ির বিক্রি ব্যাপকভাবে পড়ে যাওয়ায় নির্মাতাদের চলতি মুনাফা হ্রাস পেয়েছে ৭৬ দশমিক ১ শতাংশ। পাশাপাশি অর্থনীতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ থাকায় কারখানা ও যন্ত্রপাতি খাতে বিভিন্ন কোম্পানির পুঁজি বিনিয়োগ ১১ দশমিক ৩ শতাংশ হ্রাস পাওয়ায় জাপানের অর্থনীতি আরও কঠিন অবস্থায় পড়েছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন