বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

স্কুলে যাচ্ছে না ১৬ বছর বয়সী চিকা কো-ও (ছদ্মনাম)। জান্তা সরকারের প্রতিহিংসার ভয়ে নিজের আসল পরিচয় সামনে আনেনি এই কিশোর। চিকার ভাষ্য, স্কুলে বিস্ফোরক পাওয়া গেছে বলে খবর মিলেছে। এর ভয়েই সে বাসায় অবস্থান করছে। স্কুলে যাচ্ছে না তার বন্ধুরাও। সাধারণ সময়ে স্কুলে ৬০০ জনের মতো শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকে। তবে গত সপ্তাহগুলোতে মাত্র ২০ জনের মতো শিশু-কিশোরকে দেখা গেছে বলে জানিয়েছে চিকা কো।

দুই সন্তানকে স্কুলে পাঠাচ্ছেন না ইয়াঙ্গুনের বাসিন্দা ৪৮ বছর বয়সী নে জিন ও । তিনি বলেন, ‘স্কুলগুলো চলছে সেনাবাহিনীর অধীনে। তাদের বিরুদ্ধে বিপ্লবের অংশ হিসেবে আমি সন্তানদের স্কুলে পাঠাচ্ছি না। যদি আমরা অভিভাবকেরা সন্তানদের স্কুলে পাঠাই, এর অর্থ আমরা সেনাবাহিনীকে সমর্থন করছি। যদি মিয়ানমারে অন্য কোনো দল জয় পায়, তাহলেই শুধু আমি তাঁদের স্কুলে পাঠাব।’

চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি সেনা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) বেসামরিক সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতায় বসে সামরিক জান্তা। এর পর থেকে দেশটিতে শুরু হয় সামরিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ। মিয়ানমারে বেসামরিক সরকার ফিরিয়ে আনতে বিক্ষোভে শামিল হয়েছেন নে জিন ও। তাঁর বিশ্বাস, স্কুল বর্জন এই বিক্ষোভকে আরও জোরদার করবে।

মিয়ানমারের সেকেলে শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধেও কথা বলেছেন নে জিন ও। তাঁর মতে, মিয়ানমারের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা থেকে তেমন কিছুই পাওয়ার নেই। তাই শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে পাঠানোর কোনো যৌক্তিকতা দেখেন না তিনি। মিয়ানমারের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া ডিগ্রি শুধু দেশেই ভেতরেই কাজে আসে, তা–ও তেমন একটা না।

default-image

প্রকৌশল ও পদার্থবিদ্যা থেকে আলাদা আলাদা ডিগ্রি রয়েছে নে জিন ওর। তবে সেগুলোর একটিও তাঁর জীবিকায় কোনো পরিবর্তন আনেনি। এই মুহূর্তে জীবিকার তাগিদে ট্যাক্সি চালান তিনি।

উভয়সংকটে শিক্ষকেরা

মিয়ানমারে সামরিক সরকার ক্ষমতা দখলের পর গত জুনেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খোলা হয়েছিল। সেবারও দেখা গিয়েছিল একই চিত্র। স্কুল-কলেজ নয়, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল জান্তাবিরোধী আন্দোলনে।

মিয়ানমারে সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখলের পর যাঁরা প্রথম বিক্ষোভে নেমেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন এই শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাই। ক্লাস বর্জন ছাড়াও শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারে সামরিক সরকারের পাশে দাঁড়াতে অস্বীকৃতি জানান তাঁরা। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেশটির ৪ লাখ শিক্ষকের অর্ধেকের বেশি বিক্ষোভে যোগ দেন।

তবে স্কুলে ফিরে যেতে সামরিক সরকার শিক্ষকদের ওপর চাপ দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন মিয়ানমারের শিক্ষা সংস্কার নিয়ে কাজ করা ‘বেসিক এডুকেশন ইউনিয়নের’ একজন সদস্য। আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, প্রতিবাদ জানিয়ে অনেক শিক্ষক চাকরি ছেড়ে দিলেও অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না বাকিদের। ফলে তাঁদের শিক্ষকতা চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

default-image

আল–জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, প্রতিবাদে অংশ না নেওয়া শিক্ষকদের সামরিক সরকার কাছে টেনে নিলেও, উগ্রবাদী নানা গোষ্ঠীর রোষানলে পড়েছেন তাঁরা। অনেকেই সহিংসতা-হামলার শিকার হয়েছেন। গত সপ্তাহেই মানদালয় শহরের একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এর আগে ৫ নভেম্বর স্কুলে যাওয়া পথে হত্যা করা হয় আরেক শিক্ষককে। সেনা সরকারকে সমর্থন দেওয়ায় তাঁদের বিরুদ্ধে সহিংসতার পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেছে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো।

হামলা চালাচ্ছে সেনাবাহিনীও

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানো মিয়ানমারের সামরিক সরকারের জন্য নতুন না। স্কুল খোলার পরও স্কুল প্রাঙ্গণে এমনকি শ্রেণিকক্ষের ভেতরেও সেনাসদস্যদের উপস্থিতি দেখা গেছে। এর জের ধরে হামলার শঙ্কায় স্কুলে যাচ্ছে না শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

সেভ দ্য চিলড্রেনের বরাত দিয়ে আল–জাজিরা বলছে, শুধু গত মে মাসেই ১০০টির বেশি স্কুলে হামলা চালিয়েছেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। এর পর থেকে হামলার পরিমাণ বাড়তির দিকেই রয়েছে।

সম্প্রতি মানদালয় শহরে সেনা সরকারের হয়ে কাজ করতে অস্বীকার করেন দুই শিক্ষক। এর জের ধরে সেনাবাহিনীর মারধরের শিকার হন তাঁরা। বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগে তাঁদের গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। এখানেই শেষ না। ১২ নভেম্বর শহরটির একটি কম্পিউটার ট্রেইনিং স্কুলও পুড়িয়ে দেয় সেনাবাহিনী। অং সান সু চি–সংশ্লিষ্ট একটি সংস্থার সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ আনা হয় তাদের বিরুদ্ধে।

default-image

ক্লাসে যেতে নারাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও

১ নভেম্বর শুধু প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলগুলো খুলেছে। আলোচনায় রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার বিষয়টিও। বলা হচ্ছে, আগামী মাসেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চালু করা হবে। তবে ক্লাসে যেতে নারাজ শিক্ষার্থীরা।

এ নিয়ে কথা বলেছেন মিয়ানমারের সাগাইং রাজ্যের ছাত্র সংগঠন ‘সাগাইং স্টুডেন্ট ইউনিয়নের’ সাধারণ সম্পাদক ওয়ে ইয়ান পিও। সেনা অভ্যুত্থান শুরু আগে মাত্র কয়েক সপ্তাহ ক্লাস করার সুযোগ হয়েছে তাঁর। ওয়ে ইয়ান পিও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় খুললেও আমি ক্লাসে যাব না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সেনা সরকারের অধীনে আমি ডিগ্রি নিতে চাই না।’

আল–জাজিরা জানিয়েছে, সেনা সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা এখনো শক্ত অবস্থানে আছেন। নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল নে জিন ওর মতো অভিভাবকেরাও। তাঁরা জানেন এই পরিস্থিতি আরও কিছুদিন চলবে। তবে সহজে হাল ছাড়ছেন না তাঁরা। নে জিন ও বলেন, ‘যদি কয়েক বছরও লাগে, আমি আমার সন্তানদের বাড়িতেই পড়ালেখা করাব, তবুও সেনাবাহিনীর অধীনে তাদের স্কুলে পাঠাব না।’

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন