আজ বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে গোতাবায়া পদত্যাগ করবেন বলে গত শনিবার ঘোষণা দিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় তাঁকে গ্রেপ্তারের সুযোগ নেই। ধারণা করা হচ্ছে, ৭৩ বছর বয়সী এই নেতা আশঙ্কা করছেন, প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়ার পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। এ জন্য তিনি গত সোমবার রাতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের উদ্দেশে দেশত্যাগের চেষ্টা করেন। তবে অভিবাসন কর্মকর্তারা তাঁকে আটকে দেন। তিনি ও তাঁর স্ত্রীসহ পরিবারের ১৫ সদস্য আরব আমিরাতের চারটি ফ্লাইট ধরতে পারেননি। পরে বন্দরনায়েক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশের সামরিক ঘাঁটিতে ফিরে যান তাঁরা।

default-image

প্রতিরক্ষা বিভাগের একটি সূত্র জানায়, প্রেসিডেন্ট গোতাবায়ার ঘনিষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারা নৌপথে তাঁর দেশত্যাগের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছেন। এর আগে গত শনিবার একটি নৌযানে করে গোতাবায়া ও তাঁর সহযোগীদের বন্দরনগরী ত্রিঙ্কোমালিতে নেওয়া হয়। গত সোমবার সন্ধ্যায় সেখান থেকে হেলিকপ্টারে করে তিনি বিমানবন্দরে যান।

শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, গোতাবায়ার দেশ ত্যাগের একটি ভালো উপায় হলো সমুদ্রপথ। এই পথে তিনি মালদ্বীপ বা ভারতে যেতে পারবেন। এরপর সেখান থেকে তিনি দুবাই যেতে পারবেন। আরেক উপায় হলো, ভাড়া করা উড়োজাহাজে করে দেশ ছাড়া।

অর্থমন্ত্রী বাসিলেরও দেশ ত্যাগের চেষ্টা

প্রেসিডেন্ট গোতাবায়ার ছোট ভাই বাসিল রাজাপক্ষেও গতকাল মঙ্গলবার সকালে দেশ ছেড়ে দুবাইয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। গত এপ্রিলে অর্থমন্ত্রীর পদ ছাড়েন বাসিল। তাঁর যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব রয়েছে। এই পাসপোর্ট ব্যবহার করেও তিনি দেশ ছাড়তে পারেননি। বিমানবন্দরের এক কর্মকর্তা বলেন, বিমানবন্দরে গেলে সেখানে উপস্থিত কয়েকজন যাত্রী বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে দ্রুত বিমান বন্দর ত্যাগ করেন তিনি।

প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের ঘোষণা

প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপক্ষের স্থলাভিষিক্ত রনিল বিক্রমাসিংহকেও মেনে নেয়নি বিক্ষোভকারীরা। ফলে বিক্ষোভ থামেনি। এরপর আবার গোতাবায়ার পদত্যাগের দাবি জোরদার হলে ৮ জুলাই কলম্বোয় সেনা মোতায়েন করা হয়। এরই মধ্যে ৯ জুলাই প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে ঢুকে পড়েন বিক্ষোভকারীরা। তবে এর আগে সেখান থেকে প্রেসিডেন্টকে সরিয়ে নেওয়া হয়। বিক্ষোভের মুখে গোতাবায়া সেদিন ঘোষণা দেন, ১৩ জুলাই (আজ বুধবার) তিনি পদত্যাগ করবেন। একই দিন প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহেও পদত্যাগের ঘোষণা দেন। এর পরও বিক্ষোভকারীরা ওই দিন তাঁর বাড়িতে আগুন দেন। এরপর থেকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দুই ব্যক্তির বাড়িতে অবস্থান করছেন বিক্ষোভকারীরা। দুজন আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করা পর্যন্ত তাঁরা বাড়ি ছাড়বেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

default-image

সরকারের এই শীর্ষ দুই ব্যক্তির পদত্যাগের ঘোষণার মধ্যে আরও চার মন্ত্রী পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তাঁরা হলেন শ্রমমন্ত্রী মানুশা মানায়েক্কারা, পর্যটনমন্ত্রী হারিন ফারনন্দো ও পরিবহনমন্ত্রী বানদুলা গুনাবর্ধেনা, বিনিয়োগ বিষয়কমন্ত্রী ধামিকা পেরেরা।

সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব নাকচ

প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের ঘোষণার পর নতুন সরকার নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত রোববার সর্বদলীয় সরকার গঠনের বিষয়ে একমত হয় রাজনৈতিক দলগুলো। প্রধান বিরোধী দল সামাজি জানা বালাওয়েগায়ার (এসজেবি) মহাসচিব রণজিত মাদ্দুমা বানদারা গতকাল বলেন, ‘আমরা সব দলকে নিয়ে অন্তব৴র্তীকালীন সরকার গঠনে একমত হয়েছি। এরপরেই পার্লামেন্ট নির্বাচন হবে।’

ক্ষমতাসীন দল শ্রীলঙ্কা পদুজানা পেরামুনার (এসএলপিপি) বিদ্রোহী অংশের নেতা বিমল বিরাবানসা বলেন, ‘অন্তবর্তী সময়ের জন্য সব দলের অংশগ্রহণে সরকার গড়তে আমরা নীতিগতভাবে একমত হয়েছি।’

তবে বিক্ষোভকারীরা এই সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। তারা চায়, একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হোক। তাদের যুক্তি, সর্বদলীয় সরকার হলে তাতে রাজাপক্ষে পরিবারের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

বিক্ষোভকারীদের ছয় দাবি

বিক্ষোভকারীরা নতুন করে ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে, প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষেকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে ও তাঁর সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করতে হবে। এ সরকার এক বছর থাকতে পারবে। জনগণের সার্বভৌমত্বকে সমর্থন করে এমন একটি সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে। প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা কমাতে হবে ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করতে হবে। নতুন অন্তর্বর্তী সরকার এসব দাবি পূরণে কাজ করবে।

কে হবেন প্রেসিডেন্ট

স্পিকার মাহিন্দা ইয়াপা বলেন, আগামী শুক্রবার পার্লামেন্ট অধিবেশন শুরুর পাঁচ দিন পর নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা হবে। তাঁর ঘোষণা অনুযায়ী ২০ জুলাই নতুন প্রেসিডেন্ট পেতে পারে শ্রীলঙ্কা।

স্পিকারের এই ঘোষণার পর শ্রীলঙ্কার প্রধান বিরোধী দল এসজেবির নেতা সাজিথ প্রেমাদাসা বলেন, গোতাবায়া পদত্যাগ করলে তিনি প্রেসিডেন্ট পদে লড়তে চান।

বিবিসির খবরে বলা হয়, সমর্থন পেতে সাজিথ প্রেমাদাসার দল এসজেবি ইতিমধ্যে মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা করেছে।

সাজিথ বিবিসিকে বলেন, তাঁর দল ও মিত্ররা একমত হয়েছে, প্রেসিডেন্ট পদ শূন্য হলে সে পদে তাঁর মনোনয়ন জমা দেওয়া উচিত।

২০১৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরেছিলেন সাজিথ প্রেমাদাসা।

তবে সিএনএনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়, পার্লামেন্টে গোতাবায়ার দলের সংখ্যারগরিষ্ঠতা রয়েছে। ফলে তাঁর দলের সহযোগিতা ছাড়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হওয়া কঠিন। সাজিথ প্রেসিডেন্ট হওয়ার মতো যথেষ্ট সমর্থন পাবেন কি না, সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।

যে কারণে শ্রীলঙ্কার এ অবস্থা

একসময় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাথাপিছু আয় ছিল শ্রীলঙ্কার। বড় ধাক্কাটা আসে ২০১৯ সালে। ওই বছর কলম্বোয় তিনটি হোটেল ও তিনটি গির্জায় হামলা হয়। এতে দেশি–বিদেশি ২৫০ ব্যক্তি নিহত হন। এতে ধস নামে শ্রীলঙ্কার পর্যটন খাতে। পর্যটন খাতে আয় কমায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ধাক্কা লাগে।

default-image

ওই বছরই প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া মূল্য সংযোজন করের (মূসক) হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৮ শতাংশ করেন। এর প্রভাব পড়ে সরকারের রাজস্ব আয়ে। এরপরই আসে করোনার মহামারি। পর্যটনের যেটুকু সচল ছিল, তা–ও বন্ধ হয়ে যায়। ভাটা পড়ে প্রবাসী আয়ে। এরপর সরকারের একটি সিদ্ধান্তের কারণে কৃষি উৎপাদন কমে যায়। এতে আমদানির চাপ বেড়ে যায়। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার খরচ আরও বাড়ে। অর্থনীতিতে চাপ পড়লে চলতি বছরের শুরুর দিকে বিক্ষোভ শুরু হয়।

বিক্ষোভ যেভাবে দানা বাঁধল

রিজার্ভ কমায় জ্বালানি আমদানিতে বিপাকে পড়ে শ্রীলঙ্কা। এরপর গত ৩১ মার্চ গোতাবায়ার বাড়ির সামনে বিক্ষোভ হয়। এই বিক্ষোভ সামাল দিতে ১ এপ্রিল থেকে জরুরি অবস্থা জারি করা হয় এবং ওই দিন থেকেই ১৩ ঘণ্টা করে দৈনিক লোডশেডিং শুরু হয়। জরুরি অবস্থা উপেক্ষা করে রাস্তায় নামেন বিক্ষোভকারীরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে ৩ এপ্রিল ২৬ মন্ত্রী পদত্যাগ করেন।

ওই সময় বিক্ষোভকারীদের অন্যতম দাবি ছিল, রাজাপক্ষের পরিবারকে রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াতে হবে। মাহিন্দা ও গোতাবায়াকে পদত্যাগ করতে হবে। বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনসহ বিভিন্ন আইনপ্রণেতার বাড়িতে হামলা চালান। বাধ্য হয়ে ৯ মে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়েন মাহিন্দা রাজাপক্ষে।

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন