default-image

ক্যাথলিন ফলবিগ একজন মা। একে একে জন্ম দিয়েছিলেন চারটি সন্তান। কিন্তু তাদের সবারই মৃত্যু হয় ১০ বছরের ব্যবধানে। এই শোকে যখন বুকজুড়ে হাহাকার, তখনই তাঁর মাথার ওপর চেপে বসে চার সন্তানকে হত্যার অভিযোগ। আদালতে দোষীও সাব্যস্ত হন, দেওয়া হয় ৩০ বছরের কারাদণ্ড। এরপর কেটে গেছে ১৮টি বছর। এখন জানা যাচ্ছে, তিনি সম্ভবত নিরপরাধ। বিজ্ঞানই হয়তো তাঁকে সন্তান হত্যার দায় থেকে মুক্তি দিতে যাচ্ছে।

ক্যাথলিন ফলবিগ অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। নিউ সাউথওয়েলস (এনএসডব্লিউ) অঞ্চলের হান্টার ভ্যালি এলাকার বাসিন্দা তিনি।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চার সন্তান খুনের অভিযোগে ক্যাথলিনকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। ২০০৩ সালে বিচারকাজ চলাকালে তাঁকে আখ্যায়িত করা হয় ‘অস্ট্রেলিয়ার জঘন্যতম নারী ক্রমিক খুনি’ হিসেবে। দোষী সাব্যস্ত করা হয় নিজ সন্তান ক্যালিব, প্যাট্রিক, সারাহ ও লরাকে হত্যার দায়ে।

বিজ্ঞাপন

এত দিন পর বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে গত সপ্তাহে ৯০ জন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী, আইনজীবী ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ এক যৌথ আবেদনে সই করে তা নিউ সাউথওয়েলসের গভর্নরের হাতে তুলে দিয়েছেন। এ আবেদনে ক্যাথলিনকে ক্ষমা করে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তাঁরা।

আবেদনে সইকারী এই ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন নোবেল পুরস্কারজয়ী, অস্ট্রেলিয়ার দুজন বর্ষসেরা ব্যক্তি, একজন সাবেক প্রধান বিজ্ঞানী ও অস্ট্রেলিয়ান একাডেমি অব সায়েন্সের সভাপতি অধ্যাপক জন শাইনও রয়েছেন।

দুর্ভাগা ওই মায়ের ঘটনা প্রসঙ্গে অধ্যাপক জন শাইন বলেন, ‘এ ঘটনায় যে বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসা প্রমাণাদি পাওয়া গেছে, তাতে তাঁকে মুক্তি দেওয়ার জন্য আবেদনে সই করা ছিল সঠিক কাজ।’

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ক্যাথলিন ফলবিগের চার সন্তানের মৃত্যুর রহস্য লুকিয়ে ছিল তাদের জিনের মধ্যে। সাম্প্রতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ক্যাথলিন ও তাঁর মৃত মেয়ে সারাহ ও লরার মধ্যে জিনগত বিশেষ রূপান্তার ধরা পড়েছে। তাঁর দুই মেয়ের মৃত্যু সম্ভবত এ কারণেই। ক্যাথলিনের দুই ছেলে ক্যালিব, প্যাট্রিকের মধ্যেও একইভাবে ভিন্ন ধরনের জিন রূপান্তর ঘটে এবং তাদেরও মৃত্যু সম্ভবত এ কারণে। অর্থাৎ ক্যাথলিনের চার সন্তানের মত্যুই স্বাভাবিক, তারা কেউ খুন হয়নি।

শিশু ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক ফায়োনা স্ট্যানলি বলেন, ‘চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এ মামলায় গুরুত্ব না দেওয়া গভীর উদ্বেগের। ক্যাথলিনের সন্তানদের মৃত্যুর বিকল্প ব্যাখ্যা এখন আমাদের কাছে রয়েছে। আর এটি এই মা ও তাঁর সন্তানদের জিনগত বৈশিষ্ট্যের রূপান্তরের সঙ্গে যুক্ত।’ বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই জিনগত রূপান্তরের কারণেই তাঁর সন্তানদের স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটেছে।

ক্যাথলিন মুক্তি পেলে ও তাঁর সাজার আদেশ উল্টে গেলে অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে তা হবে সবচেয়ে বাজে রায় দেওয়ার ঘটনা। এমনকি খারাপ দৃষ্টান্ত হিসেবে এটি লিন্ডে চ্যাম্বারলেইনকে দেওয়া রায়কে ছাপিয়ে যাবে। দেশটির ইউলুরু এলাকার বাসিন্দা এই মাকেও এক ভুল রায়ে নিজের শিশুসন্তানকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে জেলে পাঠানো হয়েছিল। পরে তিন বছর জেলে কাটান তিনি।

বিজ্ঞাপন

ক্যাথলিনকে মুক্তিদানের ওই আবেদনে তাঁর মামলায় বিজ্ঞান ও আইনের মধ্যকার ফাঁকফোকর উঠে এসেছে।

এ আবেদন জানানোর আগে ক্যাথলিনের রায়ের বিরুদ্ধে একাধিকবার আপিল করা হয়। বিস্তারিত তদন্তও হয় একবার। তাতে তাঁকে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করার বিষয় পুনঃ পরীক্ষা করে দেখা হয়। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বিচারপতিরা তাঁর ঘটনায় কোনো রকমের সংশয় থাকার কথা সরাসরি নাকচ করে দেন। বিচারে চার শিশুর মৃত্যুকালীন পরিস্থিতি ও ক্যাথলিনের লেখা বিভিন্ন ডায়েরিতে দ্ব্যর্থবোধক বক্তব্যের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছিলেন বিচারকেরা।

দুই বছর আগে নিউ সাউথওয়েলস সরকার জনগণকে আশ্বস্ত করে, কোনো কিছুই খতিয়ে দেখা বাদ রাখা হয়নি। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এ উপসংহারে এসেছেন, ক্যাথলিনকে দোষী সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবেই সন্দেহের কারণ রয়েছে। মানব জিনতত্ত্ববিদ ও গবেষক যোজেফ গেজ বলেন, ‘এই ঘটনায় বিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। এটিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।’

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন