বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

উইঘুররা উদ্বিগ্ন কেন

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় জিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুরদের ধরপাকড়ের ঘটনা বেড়েছে। চীনা সরকার তাদের ওপর নানা বিধিনিষেধ জারি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রদেশটির অন্তত ২০ লাখ উইঘুর ও অন্য সংখ্যালঘু মুসলিমকে জোর করে বন্দিশিবিরে রাখা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসবের প্রমাণও মিলেছে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে। জিনজিয়াংয়ে থাকা একসময়ের বন্দীরা অভিযোগ করেছেন, বন্দিশিবিরে জোর করে রাজনৈতিক মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ করা, ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করতে বাধ্য করা, নির্যাতন করা, এমনকি যৌন নিপীড়নও করা হয়। যদিও চীন মানবাধিকার লঙ্ঘনের এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। উল্টো এসব বন্দিশিবিরকে ‘কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র’ বলে দাবি করেছে তারা।

তুহান বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে আমরা খুবই কঠিন সময় পার করছি। কিন্তু এখন যা ঘটছে, তা আরও খারাপ।’ তালেবানের ক্ষমতা দখলের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তালেবান শিগগির জানতে পারবে আমরা উইঘুর। আমাদের জীবন এখন ঝুঁকিতে।’ ফলে, তুহান ও অন্য উইঘুররা ভবিষ্যতে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা নিয়ে ভয়ে রয়েছেন। জোর করে চীনে পাঠিয়ে দেওয়া হবে কি না, এমন ভয় পাচ্ছেন তাঁরা।

চীনা শরণার্থী

মাত্র সাত বছর বয়সে তুহান মা-বাবার সঙ্গে আফগানিস্তানের ইয়ারকান্দে পালিয়ে আসেন। প্রাচীন সিল্ক রোডের একটি মরূদ্যানের কাছে আফগান-চীন সীমান্তে এলাকাটির অবস্থান। ওই সময়ে কাবুল ‘প্রাচ্যের প্যারিস’ হিসেবে পরিচিত ছিল। উইঘুরদের জন্যও সেখানে বসবাস নিরাপদ ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শন রবার্টসের মতে, আফগানিস্তানে তুহানের মতো আরও তিন হাজার উইঘুর বসবাস করছে। ‘দ্য ওয়্যার অন দ্য উইঘুরস’ নামে একটি বইয়ে তিনি লিখেছেন, ৩ কোটি ৭০ লাখের বেশি মানুষের দেশ আফগানিস্তানে উইঘুররা সংখ্যালঘু। ১৯৪৯ সালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি জিনজিয়াং দখলের পরেই অনেক উইঘুর আফগানিস্তানে পালিয়ে যায়। এ ছাড়া তুহানের মতো অনেকে ১৯৭০-এর দশকে দেশান্তরী হয়। এমন ঘটনা ঘটেছে গত বছরও। জিনজিয়াংয়ের দক্ষিণ দিয়ে পালিয়েছে তারা।

default-image

আফগানিস্তানে বসবাসরত অধিকাংশ উইঘুর সেখানকার নাগরিকত্ব পেলেও তাদের পরিচয়পত্রে এখনো ‘চীনা শরণার্থী’ লেখা। এমন এক শরণার্থী আবদুল আজিজ নাসেরি। তাঁর মা-বাবা ১৯৭৬ সালে জিনজিয়াং থেকে পালিয়ে আফগানিস্তানে যান। আজিজের জন্ম কাবুলে। কিন্তু এখনো তাঁর পরিচয়পত্রে লেখা ‘চীনা শরণার্থী’।

নাসেরি বর্তমানে তুরস্কে বসবাস করছেন। তিনি বলেন, আফগানিস্তান ছেড়ে অন্যত্র যেতে চান—এমন এক শর বেশি পরিবারের সদস্যদের নাম সংগ্রহ করেছেন তিনি। তিনি বলেন, উইঘুররা চীনকে নিয়ে ভয় পাচ্ছে। কারণ, পর্দার আড়ালে তালেবান চীনের সঙ্গেই কাজ করছে। তাদের চীনে ফেরত পাঠানো হতে পারে, এই ভয়টাই পাচ্ছে তারা।

চীন-তালেবান ‘ভালো বন্ধু’

উইঘুরদের শঙ্কিত হওয়া পেছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে বলে মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। গত জুলাই মাসে তালেবানের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল চীনের তিয়ানজিন সফর করেছে। সেখানে তারা চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে। এ সময় ওয়াং তালেবানকে ‘আফগানিস্তানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি’ হিসেবে আখ্যা দেন। এ ছাড়া আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলেও আশ্বাস দেন ওয়াং ই।

এ সময় তালেবানও চীনকে ‘ভালো বন্ধু’ হিসেবে ঘোষণা দেয়। তালেবানের পক্ষ থেকে এ–ও বলা হয়, আফগানিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহার করে চীনবিরোধী কোনো কাজ করতে দেওয়া হবে না। গত সপ্তাহে বিষয়টিকে আবারও সামনে আনেন তালেবানের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিজিটিএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘চীন আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী প্রতিবেশী দেশ। অতীতেও তাদের সঙ্গে আমাদের খুবই ইতিবাচক সুসম্পর্ক ছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এই সম্পর্ক আরও জোরদার করতে চাই এবং পারস্পরিক আস্থারও উন্নতি ঘটাতে চাই।’

default-image

অধ্যাপক শন রবার্টস বলেন, চীনের কাছ থেকে আরও বেশি সাহায্য পাওয়ার আশায় তালেবান উইঘুরদের চীনে ফেরত পাঠাতে পারে। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের জন্য চীনকে সমর্থন দেওয়ার পেছনে তালেবানের অসংখ্য কারণ রয়েছে। এ ছাড়া আর্থিক সহায়তার জন্য বিকল্প কোনো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এগিয়ে না আসায় চীনের ওপর আস্থা রাখছে তালেবান।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে উইঘুরদের জিনজিয়াংয়ে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। যেসব দেশ থেকে এই উইঘুরদের ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অনেক মুসলিম দেশও রয়েছে। চীনের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব থেকে উইঘুর মুসলিমদের ফেরত পাঠানো হয়েছে। গত জুনে প্রকাশিত উইঘুর হিউম্যান রাইটস প্রজেক্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৯৫ জন উইঘুর মুসলিমকে বিভিন্ন দেশ থেকে চীনে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

তবে চীন এসব তথ্যকে পাত্তা দিচ্ছে না। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, এই উইঘুর হিউম্যান রাইটস প্রজেক্ট একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন। তথাকথিত এসব প্রতিবেদনের কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা ও ভিত্তি নেই।

সিএনএনের প্রতিবেদন থেকে অনুবাদ করেছেন মেহেদি হাসান

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন