বিশ্বের প্রায় ২০০টি দেশ জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত এক আলোচনায় সর্বসম্মত একটি খসড়া দলিল তৈরি করেছে। জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত ছয় দিনব্যাপী এই আলোচনা গত শুক্রবার জেনেভায় শেষ হয়। আগামী নভেম্বরে মাসে প্যারিসে অনুষ্ঠেয় শীর্ষ সম্মেলনের আগে এমন সর্বসম্মত দলিলে মতৈক্য হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তন রোধে একটি আশার আলো দেখা যাচ্ছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। খবর গার্ডিয়ান ও এএফপির।
বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা ৮৬ পৃষ্ঠার দলিলটি গ্রহণ করেন। জলবায়ু পরিবর্তন রোধে এ বছর যে চারটি আলোচনা হওয়ার কথা, এর একটি জেনেভার এই আলোচনা। আগামী জুন মাসে দ্বিতীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির মাত্রা দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে প্যারিসে একটি চুক্তি হওয়ার কথা বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে। এসব আলোচনা তারই প্রস্তুতি। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে পেরুর লিমা জলবায়ু সম্মেলনে গৃহীত ৩৭ পৃষ্ঠার দলিলের দ্বিগুণ জেনেভারটি।
জেনেভায় গৃহীত হওয়া এই দলিল চূড়ান্ত না হলেও সব পক্ষই একমত হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত কোনো আলোচনায় এমন ঘটনা বিরল। জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত আলোচনা সব সময়ই ব্যাপক উত্তেজনায় ভরপুর থাকে।
ইউনিয়ন অব কনসার্নড সায়েন্টিস্টস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষক অ্যালডেন মেয়ার বলেন, প্যারিস চুক্তির পথে যেতে প্রক্রিয়াগত এবং মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে জেনেভার সভাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে অনেক আলোচনা হয়েছে। সবাই এই প্রক্রিয়াটি বুঝতে সক্ষম হয়েছেন। দলিলটি সবার।
দলিলে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বৈপ্লবিক নানা প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। কোনোটিতে পর্যায়ক্রমে ২০৫০ সালের মধ্যে মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ রোধের পক্ষে বলা হয়েছে। আবার কেউ এই গ্যাস নিঃসরণের সর্বোচ্চ হার যত দ্রুত সম্ভব বেঁধে দেওয়ার পক্ষে। সব প্রস্তাবই সম্মিলিতভাবে গৃহীত হয়েছে। গৃহীত দলিলে আছে একটি আন্তর্জাতিক জলবায়ুবিষয়ক ট্রাইব্যুনাল স্থাপনে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ বলিভিয়ার অভিনব প্রস্তাবও। এ প্রস্তাবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য ক্ষতিকর গ্যাসের নির্গমন রোধে নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ দেশের বিচার করার বিধান আছে।
পরিবেশবাদীরা এভাবে সবার মত গ্রহণ করাকে ইতিবাচক বলেই মনে করছেন।
ইউনিয়ন অব কনসার্নড সায়েন্টিস্টসের বিশ্লেষক মেয়ার বলেন, দলিলে সমস্ত প্রস্তাবই কোনো বিরোধ ছাড়া এবং আলোচনা ছাড়া গ্রহণ করা হয়েছে। সব রাষ্ট্রই যেন নিশ্চিত হয় যে তাদের চাওয়াটা দলিলে আছে, তা দেখাতেই এটা করা হয়েছে। আর প্যারিসের আলোচনায় এটি একটি ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত সচিবালয়ের প্রধান ক্রিস্টিনা ফিগুরেস বলেন, এই দলিলটি অনেক বড়। তবে দেশগুলো একে অপরের অবস্থান সম্পর্কে এখন পুরো অবগত।
জেনেভা দলিলের ধরন এবং আলোচ্য বিষয়ে বেশ কিছু সম্পাদনার কাজ বাকি আছে। এর পরও এতে আশার আলো খুঁজছেন অনেকেই। তাঁদের একজন ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জোটের প্রতিনিধি আহমেদ সারির বলেন, ‘মিথ্যা এবং প্রতিজ্ঞাভঙ্গের যে প্রবণতা চলছে, তাতে আমাদের ছোটখাটো কোনো অর্জনও নেই। সে দিক দিয়ে এবার আমরা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে একটা কিছু অন্তত পেয়েছি।’
সমমনা উন্নয়শীল দেশগুলোর জোটও জেনেভার আলোচনাকে একটি ‘উন্মুক্ত, স্বচ্ছ এবং সবার অংশগ্রহণমূলক’ আখ্যা দিয়েছে। এই জোটের মধ্যে আছে চীন, ভারত, সৌদি আরব এবং আফ্রিকা, এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশ।
ইউরোপের দেশগুলো জেনেভার খসড়া দলিলে আরও কাটছাঁট করতে চেয়েছিল। এর পরও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলের প্রধান এলিনা বারডাম জেনেভা আলোচনাকে ‘একটি সর্বজনীন চুক্তিতে পৌঁছার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ’ বলে বর্ণনা করেছেন।

বিজ্ঞাপন
এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন