default-image

মিয়ানমারে বিক্ষোভকারীদের ওপর জান্তা সরকারের দমন–পীড়ন অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিনই রাজপথে ঝরছে রক্ত। নিজ দেশের নাগরিকদের ওপর এই নৃশংসতা চালানোর জন্য সেনাবাহিনী থেকে পক্ষত্যাগ করে বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন এক সেনাসদস্য।

বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়েছে, ওই সেনাসদস্যের নাম শিং লিং। ৩০ বছর বয়সী ওই সেনাসদস্য গত সপ্তাহে ফেসবুকে একটি ছবি পোস্ট করেন। সেখানে সেনাবাহিনীর পোশাক পরা শিং লিংকে তিন আঙুলের স্যালুট দিতে দেখা যাচ্ছে। ওই স্যালুট মিয়ানমারের বিক্ষোভকারীদের কাছে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ওই ছবিটি ভাইরাল হয়েছে। তাঁর ওই সাহসী কাজের প্রশংসা করে হাজারো ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন। ছবিটি শেয়ার হয়েছে এক হাজারের বেশিবার।

গত ১ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারে রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বেসামরিক নেতা অং সান সু চিকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীর দাবি, গত নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির মাধ্যমে বিজয়ী হয় সু চির দল এনএলডি।
যদিও বিভিন্ন সংগঠন বলছে, সেনাবাহিনীর ওই দাবির গ্রহণযোগ্যতা নেই। ক্ষমতা দখলের পর জরুরি অবস্থা জারি করে জান্তা সরকার। কিন্তু সেটা অমান্য করেই রাজপথে বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন হাজারো বিক্ষোভকারী। অভ্যুত্থানের পর শুরু হওয়া বিক্ষোভে সবচেয়ে রক্তাক্ত দিন ছিল রোববার। এদিন দেশটির প্রধান শহর ইয়াঙ্গুনের উপকণ্ঠ হ্লাইংথায়ায় অন্তত ৩৭ জন বিক্ষোভকারী প্রাণ হারান। এ নিয়ে মোট ১৮০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

ইয়াঙ্গুনে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় শিং লিং এএফপিকে বলেন, ‘১ ফেব্রুয়ারির পর থেকে নিজেকে খুব অপরাধী ও লজ্জিত মনে হচ্ছে।’ তিনি বলেন, সু চিকে গ্রেপ্তারে ‘মর্মাহত’ হলেও মার্চের প্রথম দিকে ইয়াঙ্গুনের ওকালাপা পৌর এলাকায় বিক্ষোভ দমনের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। সেখানে বিক্ষোভকারীদের ওপর নিপীড়নের ঘটনা তাঁকে গণ–অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিতে উৎসাহিত করে।

শিং লিং বলেন, ‘আমি নর্থ ওকালাপায় আন্দোলনকারীদের খুব কাছে দায়িত্বে ছিলাম। আমার বন্দুকের গুলিতে নিরস্ত্র মানুষের প্রাণ যেত পারত। কিন্তু আমি সেটা করতে দিইনি। সে জন্য আমি বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।’

default-image

মিয়ানমারের একটি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী পরিবার থেকে উঠে আসা শিং লিংয়ের। মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য চিনে এতিম অবস্থায় তাঁর বেড়ে ওঠা। ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে প্রতিনিয়ত সেনাবাহিনীর পোশাক পরা ছবি পোস্ট করতেন তিনি। তাঁর পরিচিতি ততটা ছিল না। কিন্তু সেনাবাহিনী থেকে পক্ষত্যাগ করার পর তিনি মানুষের কাছে ব্যাপক পরিচিত হয়ে উঠেছেন।

তবে এটা ঠিক, মিয়ানমারে পুলিশ ও সেনাসদস্যদের প্রকাশ্যে পক্ষত্যাগের ঘোষণা বিরল। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নিপীড়নের ভয়ে তাঁরা এটা করেন না। দেশটিতে সেনাবাহিনীর আদেশ অমান্যের জন্য মার্শাল লর অধীনে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে এরপরও নিরাপত্তা বাহিনীর অনেকের জান্তা সরকারের পক্ষ ত্যাগ করার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

ভারতের নিরাপত্তা বাহিনীর তথ্যমতে, অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব ছেড়ে মিয়ানমারের প্রায় ২০০ পুলিশ সদস্য ও তাঁদের পরিবার পালিয়ে ভারতের মিজোরাম রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছেন।

সেনাবাহিনীতে যোগদানের বিষয়ে শিং লিং বলেন, ‘কিশোরকালে সেনাবাহিনীকে একটি পরিবারের মতো মনে করতাম। সে কারণে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া। আমরা ভাইয়ের মতো ছিলাম। একে অন্যের মধ্যে ছিল বেশ উষ্ণ সম্পর্ক। আমার কাছে সেটা (সেনাবাহিনী) পরিবারের মতো মনে হতো। কিন্তু ২০১১ সালে সাবেক জান্তা সরকার ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার পর সেনাবাহিনীর প্রতি মোহ আস্তে আস্তে কাটতে শুরু করে। ওই সময় ইন্টারনেটের বিপ্লব ও বিশ্বের কাছে মিয়ানমারকে উন্মুক্ত করা হয়। তখন ফেসবুকে রাজনীতির বিষয়ে জানাবোঝা বাড়তে থাকে।’

default-image

২০১৫ সালের নির্বাচনে সু চির দল এনএলডিকে ভোট দেন বলে জানান শিং লিং। দলটি আশানুরূপ কাজ না করায় তাদের ওপর থেকে সমর্থন উঠে যায়। লিং বলেন, ‘সেনাবাহিনীতে থাকা আমার বাকি বন্ধুরা ভোট (এনএলডিকে) দিতে সাহস পাননি। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সু চিকে ভোট দেওয়া পছন্দ করেন না। ফলে তাঁরা ভোট দিতে ভয় পান।’

বিজ্ঞাপন
এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন