default-image

জাপানে করোনাভাইরাসে ঘরবন্দী মানুষের নিঃসঙ্গতা বাড়ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আত্মহননের প্রবণতা। জাপানে আত্মহত্যার হার অন্য অনেক দেশের তুলনায় এমনিতেই বেশি। মহামারি শুরুর পর এই প্রবণতা আরও বেড়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে নড়েচড়ে বসেছে সরকার। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রধানমন্ত্রী ইয়োশিহিদে সুগার সরকার একজন মন্ত্রীকে দায়িত্ব দিয়েছেন সমস্যা সমাধানের।

সুগার মন্ত্রিসভার আঞ্চলিক পুনরুজ্জীবনের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী তেৎসুশি সাকামোতো। তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জনসাধারণের নিঃসঙ্গতা কাটিয়ে ওঠার উপায় খুঁজে বের করতে। অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এখন তিনি করোনাভাইরাস সংকটের কারণে নিঃসঙ্গতা অনুভব করা মানুষদের সাহায্য করার পদক্ষেপ সমন্বয়ের দিকগুলো দেখাশোনা করবেন।

বিজ্ঞাপন

গত সপ্তাহের শেষে অতিরিক্ত দায়িত্ব পাওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে সাকামোতো বলেছেন, করোনাভাইরাস পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের জারি করা জরুরি অবস্থার কারণে সামাজিক যোগাযোগ দুর্বল হয়ে পড়েছে। মানুষ সংকটকালীন অবস্থায় আগের চেয়ে অনেক বেশি অসহায় বোধ করছেন। ফলে সাহায্য যাঁদের প্রয়োজন, তাঁদের দিকে সাহায্যের হাত প্রসারিত করে পরিস্থিতি মোকাবিলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।

তবে এই পরিস্থিতি সৃষ্টির আরেক কারণ হলো, জরুরি অবস্থা চলতে থাকায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে পড়ছে। ফলে চাকরি হারানো মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি যাচ্ছে। অন্যদিকে করোনাভাইরাস সামাল দেওয়ার জন্য সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা প্রয়োজনীয় হয়ে দেখা দেওয়ায় সাধারণ মানুষ একে অপরের সঙ্গে মেশার সুযোগ পাচ্ছেন না। এমনকি কিশোর, বালক ও তরুণেরাও এখন আর আগের মতো মেলামেশা করার সুযোগ পাচ্ছে না। এর ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রার এই বিচ্যুতি মানসিকভাবে তাদের অনেককে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং আত্মহননের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে সার্বিক পরিস্থিতির আলোকে সমস্যার সমাধান খুঁজে পেতে নতুন মন্ত্রীর নির্দেশনায় কোন পথে জাপান অগ্রসর হয়, অনেকেই এখন তা দেখার অপেক্ষায় আছেন।

জাপানিরা যে খুব বেশি সামাজিক তাও নয়। যেমন ‘হিকিকোমোরি’ নামে একটি শব্দ জাপানি ভাষায় চালু আছে। সার্বিকভাবে যে ব্যক্তি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন, তাঁর ক্ষেত্রে এই শব্দ ব্যবহার করা হয়। এমন মানুষদের ধরন হলো, সমাজের সঙ্গে তাঁদের নেই কোনো যোগাযোগ, এমনকি বাড়ির লোকজনের সঙ্গেও ক্বচিৎ এঁদের কথাবার্তা হয়। বলা হচ্ছে, করোনা সংকটকালে তাঁদের সংখ্যা জাপানে বেড়েছে।

জনসংখ্যা কমে যাওয়ার পরও গত কয়েক বছরে আত্মহত্যার মোট সংখ্যাও জাপানে কমে আসছিল। ২০০৩ সালে রেকর্ড সর্বোচ্চ ৩৪ হাজার ৪২৭ জন আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। এরপর থেকে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের নানা রকম উদ্যোগের ফলাফল হিসেবে আত্মহত্যা ধীরে কমে। তবে সাম্প্রতিক কিছু পরিসংখ্যানে দেখা যায়, করোনাকালে ২০২০ সালে এই সংখ্যা এখন আবারও ঊর্ধ্বমুখী। অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি হলো, স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আত্মহননের প্রবণতা আবারও ব্যাপকভাবে বেড়ে যাচ্ছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার আগের বছরের চেয়ে ৪০ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড সর্বোচ্চ ৪৭৯টিতে দাঁড়িয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলশিক্ষার যে প্রাথমিক পর্যায়, সেখানেও থেমে নেই আত্মহননের প্রবণতা। একই পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০ সালে জাপানে প্রাইমারি স্কুলের ১৪ জন শিক্ষার্থী নিজেদের প্রাণ হরণের পথ বেছে নিয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে জাতীয় পর্যায়ে আত্মহননের হারও করোনাকালের দুঃসময়ে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে। কলঙ্কিত কিংবা অপমানিত হওয়ার ভার থেকে মুক্ত হতে পারার সহজ উপায় হিসেবে আত্মহননের পথ বেছে নেওয়া জাপানে অতীতকাল থেকে চলে আসছে। বিগত দুই দশকে অবশ্য সরকারের চালানো নানা রকম প্রচেষ্টার পাশাপাশি সমস্যাটি নিয়ে নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি আত্মহত্যার হার পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনায় সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল।

তবে জাপানের জাতীয় পুলিশ এজেন্সির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২০ সালে আত্মহত্যার মোট সংখ্যা পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে ৭৫০টি বৃদ্ধি পেয়ে ১৯ হাজার ৯১৯টিতে দাঁড়িয়েছে। পুলিশের সেই প্রতিবেদন আরও বলছে, গত বছর পুরুষদের আত্মহত্যা ১ শতাংশ কমলেও নারীদের বেলায় বৃদ্ধি পেয়েছে ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ।

র কারণ হিসেবে ধারণা করা হয়, জাপানে নারীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেবা ও বিক্রয় খাতের চাকরিতে নিয়োজিত। করোনা মহামারির ফলে এই দুই খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কর্মজীবী নারীদের বড় এক অংশ এখন চাকরি হারিয়ে বেকার। এদের মধ্যেই একটি অংশ জরুরি অবস্থায় আরও বেশি নিঃসঙ্গ বোধ করতে শুরু করছেন। আর অর্থনৈতিক চাপ সইতে না পেরে শেষ পর্যন্ত আত্মহননের পথে এগিয়ে যাচ্ছেন।

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন