default-image

জাপান সরকার ইতিমধ্যে দেশের ৪৭টি জেলার মধ্যে ৩৯টি থেকে জরুরি অবস্থা তুলে নিয়েছে। সেই জেলাগুলোর অধিকাংশতে করোনা পরিস্থিতি খুব বেশি মারাত্মক আকার না নেওয়ায় সরকারের গত সপ্তাহের সেই সিদ্ধান্ত অনেকাংশেই ছিল পর্যবেক্ষণমূলক। অর্থাৎ, জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়ার সুযোগে জনগণ আবারও আগের মতো ঢিলেঢালা জীবনব্যবস্থায় ফিরে যায় কি না তা যাচাই করে দেখা।

জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়ার আগে অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে নেওয়া হলে সংক্রমণ হয়তো নতুন করে আবারও শুরু হতে পারে। তবে তেমন কিছু জাপানে এখনো ঘটেনি এবং নতুন সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার হার দেশজুড়েই ক্রমান্বয়ে কমে আসছে। ফলে সরকার এখন অবশিষ্ট আটটি জেলার মধ্যে থেকে আরও তিনটি জেলাকে জরুরি অবস্থার বাইরে নিয়ে আসার চিন্তাভাবনা করছে এবং আগামীকালের মধ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বলে জাপানের সংবাদমাধ্যম ধারণা করছে।

সেই তিন জেলা হচ্ছে পশ্চিম জাপানের কানসাই অঞ্চলের ওসাকা, কিওতো ও হিওগো। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে নতুন সংক্রমণের সংখ্যাগত হিসাব সেখানে প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে শূন্য দশমিক ৫ জন কিংবা এর নিচে সীমিত আছে। জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের বেলায় এই হিসাব হচ্ছে সরকারের একটি পূর্বশর্ত।

পাশাপাশি অবশিষ্ট পাঁচটি জেলাতেও চিহ্নিত সংক্রমণের পতনশীল হার লক্ষণীয় হলেও এখনো তা টানা সাত দিন ধরে সেই নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। ফলে তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি সত্ত্বেও জাপানের রাজধানী এবং আশপাশের জেলাগুলোকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে পেতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে।

টোকিওতে আজও দ্বিতীয় দিনের মতো চিহ্নিত হয়েছে ৫টি নতুন সংক্রমণ। এ নিয়ে জাপানের রাজধানীতে পরপর ছয় দিন ধরে নতুন সংক্রমণের সংখ্যা সীমিত আছে ২০টির নিচে। ফলে জাপান নিশ্চিতভাবেই করোনাভাইরাস সামাল দেওয়ার পথে অনেকটা এগিয়ে গেছে। সংক্রমণের হার এবং মৃত্যুর সংখ্যা—দুই হিসাবই বলছে জাপানের অনুসৃত পথ ভুল কোনো পথ ছিল না, যেমনটা প্রায় দুই মাস ধরে সমানে বলে গেছে পশ্চিমের সংবাদমাধ্যম। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে জাপানে এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৭৮১ জন, যে সংখ্যা হচ্ছে পশ্চিমের অনেক দেশের একদিনের হিসাবের চেয়েও অনেক কম। ফলে সারা দেশ থেকে জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়া এখন হচ্ছে কেবল সময়ের ব্যাপার, আগামী সপ্তাহেই যে অগ্রগতি হয়তো লক্ষ করা যেতে পারে।

আভিগানের সাফল্য প্রমাণিত হয়নি
করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় জাপানের ফুজি ফিল্ম কেমিক্যালের আবিষ্কৃত ওষুধ আভিগানের কার্যকারিতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রচুর আলাপ–আলোচনার পরও জাপানের সংবাদমাধ্যম বলছে ওষুধের কার্যকারিতার প্রমাণ ক্লিনিক্যাল টেস্টে পাওয়া যায়নি। ফলে চলতি মাসের শেষ দিকে আভিগান ব্যবহারের অনুমতি জাপান সরকার দেবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের ওপর ওষুধের পরীক্ষামূলক প্রয়োগের ফলাফল নিয়ে যে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন জাপানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে পেশ করা হয়েছে, তাতে উল্লেখ করা হয় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর দেহে রোগের বিস্তার বন্ধ করায় ওষুধের কার্যকারিতার পরিষ্কার কোনো প্রমাণ মেলেনি। জাপানের বেশ কয়েকটি হাসপাতালে এই পরীক্ষা চালানো হয়। হালকা উপসর্গ দেখা দেওয়া রোগীদের বেলায় অবস্থার উন্নতি হওয়ার পরিষ্কার কোনো চিহ্ন পরীক্ষায় দেখা যায়নি।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এর আগে বলেছিলেন যে মে মাসের মধ্যে করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় আভিগান ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার আশা তিনি করছেন এবং সেই লক্ষ্যে ওষুধের মজুত নিশ্চিত করে নেওয়ার নির্দেশ তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দিয়েছিলেন। এ ছাড়া বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশে বিনা মূল্যে আভিগান তিনি সরবরাহ করেছেন। সেসব দেশকে ওষুধ পাওয়ার বিনিময়ে যা করতে বলা হয়েছিল, তা হলো ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার উপাত্ত জাপানকে সরবরাহ করা। সে রকম কোনো উপাত্ত এখন পর্যন্ত জাপানের হাতে আসার কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

শুকিয়ে যাচ্ছে জাপানের পর্যটন খাত
জাপানের পর্যটন–শিল্পকে মাত্র মাস ছয়েক আগেও তুলনা করা হচ্ছিল প্রচণ্ড বেগবান এক নদীর সঙ্গে, যার অন্তহীন স্রোত দেশের সেবা খাতকে নিয়ে গিয়েছিল অত্যন্ত উঁচু এক আসনে। নিত্যনতুন হোটেল চালু হওয়াই কেবল নয়, পুরোনো সব হোটেলের সংস্কার সাধন করে আধুনিক সব রকম সুযোগ-সুবিধা সেগুলোতে সংযোজন করে নেওয়ার বাইরে পর্যটকদের জন্য তৈরি হচ্ছিল বিনোদনের নতুন নানা রকম ব্যবস্থা। গত এক দশকে বিদেশি পর্যটকের আগমন জাপানে সমানে বৃদ্ধি পেয়ে চলায় সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সম্প্রসারিত হচ্ছিল হোটেল ও পর্যটন ব্যবসা।

করোনাভাইরাসের বিস্তার এখন এক আঘাতে এর সবটাই বলা যায় ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক হোটেল, দেউলিয়া হচ্ছে রেস্তোরাঁ, নাইট ক্লাব এবং বিনোদনের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান। বহমান নদীর শুকিয়ে যাওয়া যেমন নদীতীরের হাটবাজারকে করে তুলে জনশূন্য, প্রায় তিন মাস ধরে চলা করোনা মহামারি জাপানের পর্যটন খাতের ওপর ফেলছে সে রকম একই ছায়া।

জাপানের পর্যটন এজেন্সি এপ্রিল মাসে জাপান ভ্রমণে আসা বিদেশি পর্যটকের যে হিসাব দিয়েছে তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। এক বছর আগের তুলনায় এপ্রিল মাসে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা জাপানে হ্রাস পেয়েছে ৯৯.৯ শতাংশ। আনুমানিক মাত্র ২ হাজার ৯০০ বিদেশি এই সময়ে জাপান ভ্রমণ করেছেন। এই বিশাল পতন একই সঙ্গে হচ্ছে প্রথমবারের মতো জাপানে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ১০ হাজারের নিচে নেমে যাওয়া।

করোনাভাইরাস পরিস্থিতির ধীর অগ্রগতি পরিলক্ষিত হলেও জাপানে পর্যটনশিল্পের আগের অবস্থা ফিরে ফিতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। পেছনের কারণ অবশ্যই হচ্ছে করোনাভাইরাসের কারণে মানুষের জীবনধারায় সূচিত হয়ে চলা ব্যাপক সব পরিবর্তন। মানুষ এখন আর আগের মতো শঙ্কামুক্ত হয়ে বিদেশ ভ্রমণ করা থেকে বিরত থাকবে। ফলে জাপানের তেজি এই খাতের সামনের দুর্দিন সহসা শেষ হওয়ার নয়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0