জীবনসায়াহ্নে হিবাকুশাদের প্রজন্ম

বিজ্ঞাপন
default-image

আণবিক বোমা হামলায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া সত্ত্বেও শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে জীবনভর তাঁরা ভুগেছেন এবং এখনো ভুগছেন। মানুষের সেদিনের বর্বর অন্যায় আচরণ নিয়ে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করে দিতে ৭৫ বছর ধরে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। নিয়মিত সংখ্যা কমলেও এখনো তাঁরা তা করে চলেছেন। হিবাকুশা নামে পরিচিত হিরোশিমা ও নাগাসাকির সেই প্রজন্মের শেষ প্রতিনিধিদের গড় বয়স এখন ৮৩ বছরের বেশি।

এর অর্থ, খুব তাড়াতাড়ি তাঁরা হয়তো হারিয়ে যাবেন। তখন আর মানুষের বয়ে আনা সেই দুর্দশার কথা বলার কোনো লোক থাকবে না। এই বাস্তবতা নিয়ে হিরোশিমা ও নাগাসাকি সচেতন এবং তাঁদের সেই শূন্যস্থান পূরণ করে নিতে কী করা দরকার, সে বিষয়ে কয়েক বছর ধরে নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

এ বছর হিরোশিমা ও নাগাসাকির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চালানো আণবিক বোমা হামলার ৭৫তম বার্ষিকী। তিন দিনের ব্যবধানে চালানো দ্বিতীয় হামলায় বিধ্বস্ত শহর ছিল দক্ষিণ-পশ্চিম জাপানের কিউশু দ্বীপের নাগাসাকি। ৯ আগস্ট নাগাসাকির বোমা হামলার বার্ষিকীর আগে অনলাইন সংবাদ ব্রিফিংয়ে পারমাণবিক বোমার বিভীষিকা থেকে বিশ্বকে মুক্ত করায় নাগাসাকির নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের বর্ণনা দেওয়ার পাশাপাশি হিবাকুশাদের বিদায়ে তাঁদের শূন্যস্থান পূরণ করতে কী পরিকল্পনা তাঁরা করছেন, সে কথা তুলে ধরেন নাগাসাকির মেয়র তোমিহিসা তাওউয়ে।

মেয়র তাওউয়ে পরপর চার মেয়াদে নগর প্রশাসনের প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। এই দীর্ঘ সময়ের দায়িত্ব পালনে শান্তি আন্দোলনের সামনে দেখা দেওয়া বিভিন্ন বাধা সম্পর্কে তিনি ভালোভাবে অবগত। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক লোক যে হিরোশিমা-নাগাসাকির দুর্দশার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে পরমাণুমুক্ত বিশ্বের লক্ষ্য অর্জনের ধারণ সমর্থন করে চলেছেন, সেটাও তাঁর অজানা নয়। ফলে যে বার্তা নাগাসাকি বিশ্বজুড়ে পৌঁছে দিতে চাইছে তা হলো, ‘নাগাসাকি যেন হয় আণবিক কিংবা পরমাণু হামলার শিকার হওয়া বিশ্বের শেষ শহর।’

সংবাদ ব্রিফিংয়ের শুরুতে গত ৭৫ বছরে আণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়ে তোলায় হিবাকুশাদের চালানো প্রচেষ্টার পাশাপাশি নাগাসাকির নেওয়া কয়েকটি উদ্যোগের বর্ণনা মেয়র তাওইয়ে দিয়েছেন। ১৯৪৫ সালে আণবিক বোমা হামলার সময় নাগাসাকির জনসংখ্যা ছিল আনুমানিক ২ লাখ ৪০ হাজার। বোমা হামলায় তাৎক্ষণিকভাবে প্রাণ হারিয়েছে ৭০ হাজার মানুষ এবং আহত হয়েছে আরও প্রায় ৭৫ হাজার। তেজস্ক্রিয়তার সংস্পর্শে আসায় গভীর শারীরিক ও মানসিক ক্ষত যাঁদের মধ্যে দেখা দিয়েছিল, সে রকম কঠিন অবস্থার মধ্যে বেঁচে থাকা সত্ত্বেও নিজেদের ভোগ করা যন্ত্রণা থেকে পরবর্তী প্রজন্মকে রক্ষা করার আকাঙ্ক্ষায় তাঁদের অনেকেই ছিলেন শান্তি আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। সেই দিনের স্মৃতি বর্ণনা করে যাওয়ার মধ্য দিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে যুদ্ধ, বিশেষ করে পারমাণবিক যুদ্ধের ভয়াবহতার বার্তা এ কারণে তাঁরা পৌঁছে দিচ্ছেন। কারণ তাঁরা মনে করেন, তাঁদের সেই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে আগামী দিনের নাগরিকদের সচেতন করে তুলতে পারলে শান্তি আন্দোলনকে তাঁরা ভবিষ্যতে আরও এগিয়ে নেবেন।

তবে মেয়র তাওউয়ে বলেছেন, হিবাকুশারা বৃদ্ধ হওয়ায় নগর প্রশাসন বুঝতে পেরেছিল যে নাগাসাকির শান্তির বার্তা বিশ্বব্যাপী পৌঁছে দিতে হলে নতুন কিছু করা দরকার। সেই ধারণা থেকেই কেবল হিবাকুশাদের কথা শুনে যাওয়া নয়, পাশাপাশি স্কুলের ছাত্ররা যেন সক্রিয়ভাবে শান্তি আন্দোলনে যুক্ত হয়ে অবদান রাখা শুরু করতে পারে, সেই লক্ষ্যে ভিন্ন ধরনের কয়েকটি উদ্যোগ সাত বছর আগে থেকে এই শহর হাতে নেয়। এগুলোর মধ্যে আছে পরমাণু অস্ত্র বিলুপ্তির আহ্বান জানিয়ে স্বাক্ষর গ্রহণ অভিযানে এদের যোগ দেওয়া এবং শান্তির দূত হিসেবে জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামে উপস্থিত হয়ে স্বাক্ষর জমা দেওয়ার পাশাপাশি নিজেদের বক্তব্য সেখানে তুলে ধরা। নাগাসাকির মেয়র বলেছেন, সীমিত আকারের হলেও সেই কার্যক্রম শান্তির কণ্ঠস্বরকে আরও জোরালো করে তুলছে।

এর বাইরে নাগাসাকি হচ্ছে হিরোশিমার পাশাপাশি শান্তির জন্য মেয়র নামে পরিচিত সারা বিশ্বের বিভিন্ন শহরের মেয়রদের অংশ নেওয়া একটি জোটের প্রধান উদ্যোক্তা। ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত সেই জোটে এখন পর্যন্ত ১৬৩টি দেশের ৬ হাজার ৯০০ শহর যোগ দিয়েছে। পরমাণুমুক্ত বিশ্ব গড়ে তোলায় সক্রিয় অবদান রাখা হচ্ছে সবার অভিন্ন লক্ষ্য।

যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু ছত্রচ্ছায়ায় অবস্থান করা অবস্থায় নাগাসাকির সেই উদ্যোগ কতটা ফলপ্রসূ হবে, মেয়রের কাছে তা জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেছেন, জাপান সরকার বলছে, পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী ও পরমাণু অস্ত্র যাদের নেই, সে রকম রাষ্ট্রের মধ্যে একটি সংযোগ–সেতু হিসেবে জাপান কাজ করতে চাইছে। তবে কীভাবে জাপান তা করবে, সে বিষয়ে পরিষ্কার কোনো ধারণা সরকারের পক্ষ থেকে আসেনি। সরকার যেন সুস্পষ্ট অবস্থান ঘোষণা করে, সেই আহ্বান তিনি জানিয়ে আসছেন।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এসব উদ্যোগের পাশাপাশি প্রতিবছর ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে অনুষ্ঠিত হয় শান্তির জন্য প্রার্থনার অনুষ্ঠান, হিরোশিমার মতোই মেয়র যেখানে শহরের পক্ষ থেকে শান্তির একটি ঘোষণা পাঠ করেন। করোনাভাইরাসের কারণে এবার সেই আয়োজন সীমিত পর্যায়ে রাখা হলেও শান্তির সেই বার্তা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ায় সহায়তা করতে সংবাদমাধ্যমকে তিনি অনুরোধ করেছেন।

হিবাকুশাদের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ার মুখে নাগাসাকিতে এখন তালিকাভুক্ত কতজন হিবাকুশা রয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে কতজন নিজেদের অভিজ্ঞতার বর্ণনা তুলে ধরার কর্মকাণ্ডে যুক্ত আছেন, সেই প্রশ্নের জবাবে মেয়র তাওউয়ে বলেন, নাগাসাকিতে ঠিক এ মুহূর্তে তালিকাভুক্ত হিবাকুশার সংখ্যা ২৬ হাজারের মতো হলেও তাঁদের মধ্যে অনেকেই নিজেদের সেই অতীতের দুঃখ আর বেদনার কথা অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে নারাজ। সেই দুঃস্বপ্নকে তাঁরা ভুলে যেতে চান বলেই জীবনের বেদনাময় সেই অধ্যায়কে আবার মনে করে বিষাদগ্রস্ত তাঁরা হতে চান না​। নাগাসাকি তাঁদের এই মনোভাবের প্রতি সহানুভূতিশীল। ফলে তাঁদের মনের শান্তি যেন বিঘ্নিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে নগর প্রশাসন সচেষ্ট। তবে তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ রকম দেখা গেছে যে দীর্ঘ সময় ধরে যাঁরা নিশ্চুপ ছিলেন, তাঁদের মধ্যে অনেকে শেষ বয়সে এসে তাঁদের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার কথা বলতে শুরু করেছেন। নাগাসাকির আণবিক বোমা জাদুঘর সেসব বর্ণনা ধারণ ও লিপিবদ্ধ করে রাখছে।

এ রকম একই ধরনের উদ্যোগ অবশ্য আগে থেকে হাতে নিয়েছে হিরোশিমার শান্তি স্মৃতি জাদুঘর। ফলে ওরাল হিস্ট্রি বা বর্ণনামূলক ইতিহাসের ভান্ডার দুই শহরেই সমৃদ্ধ আকার নিচ্ছে, আগামীর গবেষকদের জন্য যা মূল্যবান উৎস হিসেবে কাজ করবে। এসব উদ্যোগের পাশাপাশি উভয় শহরের জাদুঘর জীবিত হিবাকুশাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের বক্তব্য শোনার ব্যবস্থাও তরুণদের জন্য করে দিচ্ছে। ফলে হিবাকুশারা হারিয়ে গেলেও থেকে যাবে তাঁদের বর্ণনা করে যাওয়া ভয়াবহ সেই দিনের অভিজ্ঞতার কথা, জাপানের পাশাপাশি সারা বিশ্বের জনগণকে যা বলে যাবে কতটা জরুরি বিশ্বকে পরমাণু অস্ত্রের ভান্ডার থেকে মুক্ত করে সত্যিকার অর্থে কল্যাণমূলক এক পৃথিবী গড়ে তোলা। ধারণা অলীক মনে হলেও এর সত্যতা উপেক্ষা করার উপায় নেই।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন