সর্বশেষ ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় শাসনক্ষমতায় ছিল তালেবান। সে সময় তারা ইসলামি আইনের উদার দৃষ্টিভঙ্গির বদলে এর কঠোর ব্যাখ্যা গ্রহণ করে।

শিক্ষালাভের সুযোগ ও বাইরে চলাচলের ক্ষেত্রে নারীদের ওপর আরোপ করে নানা বিধিনিষেধ। নিষ্ঠুরভাবে দমন করে বিরোধীদের। হাজারাদের মতো বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর চলে দমনপীড়ন।

অবশ্য এবার নারীদের অধিকারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তালেবান। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠনেও অঙ্গীকারবদ্ধ তারা।

ইতিমধ্যে আফগান সমাজের নানা মত-পথের মানুষ ও রাজনীতিবিদদের সঙ্গে আলোচনাও শুরু হয়েছে। এ রাজনীতিবিদদের একজন যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সাবেক আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই। এমনকি ১৯৯০-এর দশকে নির্যাতনের শিকার সংখ্যালঘু শিয়া হাজারা সম্প্রদায়ের কাছে প্রতিনিধিদের পাঠিয়েছে তালেবান।

পুরো আফগানিস্তানের ওপর তালেবানের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর সহিংসতা থামায় এখন কিছু গ্রামীণ এলাকায় স্বস্তি নেমে এসেছে। অবশ্য অনেক আফগানই বলছেন, তাঁরা কথা নয়, কাজ দেখতে চান।

অর্থনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয়
বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ আফগানিস্তান। ২০০১ সালে দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন শুরুর পর তৎকালীন তালেবান সরকারের পতন ঘটে। এরপর দেশটিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক সহায়তা আসা শুরু করে। ২০২০ সালে আফগানিস্তানে আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিমাণ ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪০ শতাংশের বেশি।

তালেবান ক্ষমতা গ্রহণের পর আফগানিস্তানকে দেওয়া আন্তর্জাতিক এ সহায়তার অধিকাংশ স্থগিত করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেশগুলো। বাকি সহায়তা পাওয়ারও নিশ্চয়তা নেই। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থাকা আফগান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ খরচের সুযোগও নেই তালেবানের। এই অর্থ সংকট তালেবানের নেতৃত্বাধীন সরকারকে আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দিতে পারে। সরকারে সামনে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠবে সরকারি কর্মীদের বেতন-ভাতা প্রদান, বিদ্যুৎ-পানি-যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সব খাত সচল রাখার বিষয়টি।

ইতিমধ্যে আফগানিস্তানে খাদ্যের মজুত ফুরিয়ে আসতে থাকায় ও খরা দেখা দেওয়ায় জাতিসংঘ দেশটিতে মানবিক বিপর্যয় শুরু হতে পারে বলে সতর্ক করে দিয়েছে।

দক্ষ ও মেধাসম্পন্ন জনবলের ঘাটতি
অর্থের ঘাটতিকে পেছনে ফেলে আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য আরও বড় সংকট হয়ে দেখা দিতে পারে দক্ষ ও মেধাসম্পন্ন জনবলের ঘাটতির বিষয়টি।

গত ১৫ আগস্ট কাবুল নিয়ন্ত্রণে নেন তালেবান যোদ্ধারা। এরপর ৩১ আগস্টের সময়সীমাকে সামনে রেখে আফগানিস্তান থেকে সব বিদেশি সেনা সরিয়ে নেওয়ার শেষ ধাপের কাজ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। একই সঙ্গে মরিয়া হয়ে দেশ ছাড়েন গত ২০ বছরে বিদেশি সেনাদের সহায়তা করা বহু আফগান ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অনেক দক্ষ, অভিজ্ঞ ও মেধাবী মানুষ রয়েছেন। বিদেশে পাড়ি জমানো এই ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন আমলা, ব্যাংকার, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, অধ্যাপক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটরা।

দেশের অর্থনীতিতে এসব দক্ষ জনবলের দেশ ছাড়ার ক্ষতি সম্পর্কে তালেবান ভালোভাবে অবগত। সে জন্য এরই মধ্যে সংগঠনটির মুখপাত্র আফগানদের আতঙ্কে দেশ ছেড়ে চলে না যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দেশের জন্য চিকিৎসক, প্রকৌশলীদের মতো ‘বিশেষজ্ঞ’ দরকার।

কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা
প্রথমবার ক্ষমতায় থাকাকালে আন্তর্জাতিক কূটনীতি থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন ছিল তালেবান। এবার দৃশ্যত ব্যাপকভাবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে আগ্রহী তারা। যদিও অনেক দেশ ইতিমধ্যে কাবুলে তাদের কূটনৈতিক মিশন স্থগিত বা বন্ধ করে দিয়েছে।

তালেবান এ পর্যন্ত পাকিস্তান, ইরান, চীন, রাশিয়া ও কাতারের মতো আঞ্চলিক প্রভাবশালী বেশ কিছু দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তবে কেউ এখনো তাদের স্বীকৃতি দেয়নি। আর যুক্তরাষ্ট্র তালেবানকে বৈধতার স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে নানা শর্ত আরোপ করেছে।

আইএসের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের হুমকি
তালেবান আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিলেও দেশটিতে আইএসের মতো জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর হামলার হুমকি কাটেনি। সম্প্রতি কাবুল বিমানবন্দরে ভয়াবহ আত্মঘাতী হামলা এর অন্যতম প্রমাণ। ওই হামলায় ১৭০ জনের মতো মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। আইএস বলেছে, আফগানিস্তানে তাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে। তাদের কথায়, তালেবান ‘ধর্মত্যাগী’।

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন