রাজধানী সিউলের গ্যাংনাম জেলার ড্রিম স্লিপ ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক জি-হাইওন লি বলেন, তিনি প্রায়ই এমন রোগী পান, যাঁরা রাতে ঘুমাতে ২০টি পর্যন্ত ওষুধ (বড়ি) খেয়ে থাকেন। লি বলেন, ‘ঘুম আসতে সময় দিতে হয়। কিন্তু কোরিয়ানরা চান শুয়েই ঘুমিয়ে পড়তে। আর এ জন্য তাঁরা ওষুধ খান।’

পৃথিবীর সবচেয়ে ‘ঘুমবঞ্চিত’ আ অনিদ্রাজনিত সমস্যায় থাকা দেশগুলোর একটি দক্ষিণ কোরিয়া। বিবিসির খবরে বলা হয়, দেশটিতে ঘুমের ওষুধের প্রতি আসক্তি একটি জাতীয় মহামারি। কত রোগী ঘুমের ওষুধ খান, তা নিয়ে কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে অনুমান করা হয়, অন্তত এক লাখ কোরিয়ান ঘুমের ওষুধে আসক্ত। ওষুধ খেয়েও যখন তাঁদের ঘুম আসে না, তখন তাঁরা অ্যালকোহল খাওয়া শুরু করেন, যা আরও ভয়ংকর।

চিকিৎসক লি বলেন, অনেকেই ঘুমের মধ্যে হাঁটেন। ওই অবস্থাতেই তাঁরা অবচেতন মনে ফ্রিজ থেকে অনেক কিছু খেয়ে ফেলেন, এমনকি কাঁচা জিনিসও খেয়ে বসেন। এমন ঘুমন্ত রোগীদের কারণে অনেক গাড়ি দুর্ঘটনাও ঘটে।

চিকিৎসক লি দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রায় ভোগা রোগীদের দেখতে অভ্যস্ত। চিকিৎসাশাস্ত্রে এটিকে ‘হাইপো-উত্তেজনা’ বলা হয়। তাঁর কিছু রোগী তাঁকে বলেছেন, রাতে টানা কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়েছেন, এমনটা হয়েছে কয়েক দশক আগে। তাঁরা কেঁদে ফেলেন। তারপরও আশা নিয়ে আসেন। এটি সত্যি দুঃখজনক পরিস্থিতি।

অনিদ্রার সমস্যাটি দিন দিন কোরিয়ায় বাড়ছে উল্লেখ করে এই চিকিৎসক কোরিয়া এক্সপোজকে বলেন, ‘২০০২ সালের তুলনায় ২০১২ সালে অনিদ্রায় ভোগা রোগীর সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। এরপর প্রতিবছর এ সংখ্যা ৮ শতাংশ হারে বেড়েছে। কোরিয়ায় মানসিক চাপের পাশাপাশি কাজের চাপও বেশি। এ ছাড়া কাজের সময় (শিফট) হঠাৎ করে বা ঘন ঘন পরিবর্তন হয়। লোকজনকে নির্দিষ্ট সময়ের পরও কাজ করতে বলা হয়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রাতের জীবন। এখানে শেষরাত পর্যন্ত গণপরিবহন চালু থাকে। মানুষজন সপ্তাহান্তে অতিরিক্ত ঘুমিয়ে বিশ্রামের ঘাটতি পূরণ করার চেষ্টা করে। এটি হচ্ছে অনিদ্রার অন্যতম কারণ।’

হেলথ ইনসুরেন্স অ্যান্ড অ্যাসেসমেন্ট সার্ভিসের (এইচআইআরএ) তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক লাখ কোরিয়ান ঘুমের ওষুধ খান। তাঁরা এ জন্য বিমার সুবিধা দাবি করতে পারেন। কোরিয়ার প্রায় সবাই সরকারিভাবে বিমার সুবিধা পেয়ে থাকেন।
এইচআইআরএ জানায়, ২০২১ সালের মার্চের এক হিসাবে দেখা গেছে, প্রায় ৯২ হাজার মানুষ অনিদ্রাজনিত সমস্যার চিকিৎসায় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছেন।

অতিরিক্ত পরিশ্রম, অবসাদ ও নিদ্রাহীনতা

উন্নত দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ায় আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি। দেশটির বহু নাগরিক মদ্যপান ও বিষণ্নতা থেকে মুক্তি পেতেও ওষুধ খান। এসবের পেছনে ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে।

মাত্র কয়েক দশকে দেশটি পৃথিবীর অন্যতম দরিদ্র দেশ থেকে অন্যতম প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে। পপসংগীতে কোরিয়া বিশ্বব্যাপী প্রভাব বিস্তার করছে। একই পথে হাঁটছে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মতো দেশগুলো। এই দুটি দেশ তাদের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল।

কিন্তু কোরিয়ার এমন কোনো সম্পদ নেই। কেবল সমন্বিত জাতীয়তাবাদ ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তাঁরা একটি উন্নত জাতিতে পরিণত হয়েছেন। এতে নাগরিকদের অতিরিক্ত সময় পরিশ্রম করতে হচ্ছে। এতে অব্যাহত মানসিক চাপ ও অনিদ্রার শিকার হচ্ছেন তাঁরা।

এখন এই নিদ্রাহীনতা ঘিরেও দক্ষিণ কোরিয়ায় একটি শিল্প গড়ে উঠেছে। ২০১৯ সালে এই ‘ঘুমশিল্পে’র বাণিজ্য ধরা হয়েছিল ২৫০ কোটি ডলারের সমান।

বাড়ছে ঘুম নিয়ে বাণিজ্য

রাজধানী সিউলে শুধু ঘুমের জন্য সহায়ক নানা ধরনের সামগ্রী নিয়ে ডিপার্টমেন্ট স্টোর গড়ে উঠেছে। সুন্দর বিছানার চাদর থেকে শুরু করে আরামদায়ক বালিশ, ভেষজ ওষুধ, টনিক—এসবে সাজানো স্টোরের তাকগুলো। বিছানার উপকরণ তৈরিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো নানা অফার দিচ্ছে। ২০১৪ সালে একটি নামী প্রতিষ্ঠান ‘সুইট স্লিপ’ নামে একটি পানীয় বাজারে ছাড়ে। কয়েক বছর আগে চালু হয়েছে ‘স্লিপ ক্যাফে’।

এই ক্যাফেতে আছে ঘুমের সুব্যবস্থা; ঘণ্টা হিসাবে অর্থ দিয়ে ঘুমানো যায় সেখানে।
অনিদ্রা দূর করতে নেওয়া হচ্ছে প্রযুক্তির সহায়তাও। দুই বছর আগের কথা। তরুণ প্রজন্মের মানসিক চাপ কমানোর লক্ষ্যে ‘কোক্কিরি’ নামের একটি মেডিটেশন অ্যাপ চালু করেন ড্যানিয়েল টিউড। আরেকটি অ্যাপ আছে—‘মাবো’।

ড্যানিয়েল বলেন, তাঁর অ্যাপের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। এ ধরনের সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা তাঁর নেই। তাঁর কথায়, ‘আমরা যা করছি বা এই অ্যাপের মাধ্যমে যে চর্চা করা হয়, তা আসলে প্রতিরক্ষামূলক, সমস্যার বিরুদ্ধে ঢালের মতো কাজ করবে।’
কোরিয়া ঐতিহাসিকভাবে বৌদ্ধ রাষ্ট্র হলেও সেখানকার তরুণদের ধ্যানে আগ্রহ নেই। তাঁরা মনে করেন, ধ্যান বয়স্কদের সময় কাটানোর উপায়। সিউলের অফিসকর্মীদের জন্য ধ্যান নয়। ড্যানিয়েল বলেন, তরুণদের কাছে তিনি ধ্যানকে আকর্ষণীয় করে তুলতে এটিকে একটি পশ্চিমা ধারণা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট। অনেক সংস্থাও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

হিয়েরাং সুনিম একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। তিনি সিউলের কাছাকাছি টেম্পল–স্টে নামে একটি মন্দিরে অনিদ্রায় ভোগা রোগীদের সেবা দিয়ে থাকেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে অনিদ্রায় ভোগা লোকজন মন্দিরে এসে সময় কাটাতে পারেন, ধ্যান করতে পারেন এবং বৌদ্ধদের দর্শন সম্পর্কে জানতে পারেন।

অতীতে অবসরপ্রাপ্ত অনেকে যাঁরা পড়াতে ও প্রার্থনা করতে চাইতেন, তাঁরা এখানে আসতেন। এখন কম বয়সীরাও আসছেন, বিশেষ করে কর্মজীবীরা। তবে এর মধ্য দিয়ে অর্থ উপার্জনের বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা আছে।

হিয়েরাং সুনিম বলেন, ‘অল্পবয়সীদের বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষা গ্রহণ করতে মন্দিরে আসার ঘটনা বিরল। এখন যেহেতু তারা আসছে, এখান থেকে অনেক কিছু আত্মস্থ করতে পারছে।’

দরকার মৌলিক পরিবর্তন

অতিরিক্ত কাজের চাপে পড়ে লি হিয়ে-রি এমনই একটি কেন্দ্রে যোগ দিয়েছিলেন। সেখান থেকে তিনি চাপের মোকাবিলা করতে শিখেছেন। তিনি বলেন, ‘সবকিছুর শুরু আমার থেকে; সব সমস্যা আমাকে দিয়ে শুরু। এটাই আমি এখান থেকে শিখেছি।’

কিন্তু এভাবে মানসিক চাপ এবং অনিদ্রাজনিত সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে এটিকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমস্যা হিসেবে দেখানো নিয়ে আপত্তি উঠতে পারে। যাঁরা মনে করেন, অযৌক্তিক কাজের সংস্কৃতি এবং সামাজিক চাপের কারণে এ ঘুমের সমস্যা হচ্ছে, তাঁরা এটিকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমস্যা হিসেবে দেখানোর সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, এটি ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার সমতুল্য। সমালোচকেরা বলেন, ধ্যান বা মন শিথিল করা হলো সমস্যার ওপর চিত্তাকর্ষক আবরণ দেওয়া (প্লাস্টার)। সমাজে মৌলিক পরিবর্তনের মাধ্যমেই শুধু প্রকৃত সমাধান আসতে পারে।

জি-হিউন কাজের চাপ নিতে না পেরে শেষ পর্যন্ত চাকরিটি ছেড়েই দেন। এখন তিনি একজন ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করছেন। করোনা মহামারিতে ঘরে বসেই কাজ করতে পারছেন। তিনি ঘুমের সমস্যা কাটিয়ে উঠতে চিকিৎসক লির শরণাপন্নও হয়েছিলেন।
সূত্র: বিবিসি