বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

দুতার্তের ‘নাটকীয়তা’

ফিলিপাইনের বর্তমান প্রেসিডেন্টের রদ্রিগো দুতার্তের মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছরের জুনে। দেশটির সংবিধান অনুযায়ী তিনি আর প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করতে পারবেন না। তবে ক্ষমতা ছাড়াটাও সুখবর হবে না দুতার্তের জন্য। কারণ, গত ছয় বছরের শাসনকালে তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতেও তদন্ত চলছে। এমন পরিস্থিতিতে ফিলিপাইনে বিরোধীপক্ষের হাতে ক্ষমতা গেলে গতি পেতে পারে ওই তদন্ত কার্যক্রম।

সবকিছু হিসাব-নিকাশ করেই দুতার্তে জানিয়েছিলেন, এবারের নির্বাচনে তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে লড়বেন। তবে পরে গত সপ্তাহে দুতার্তে জানান দেন, তিনি আর রাজনীতিতে থাকছেন না। দুতার্তের এমন ঘোষণা নিয়ে সন্দেহ আছে বিশ্লেষকদের। কারণ, এর আগেও ২০১৫ সালে তিনি রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দেন। এর পরপরই সুর বদলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেন তিনি।

শুধু তা-ই নয়, এবারে নির্বাচনে রদ্রিগো দুতার্তের মেয়ে সারা দুতার্তে-কারপিও প্রেসিডেন্ট পদে লড়বেন বলে গুঞ্জন উঠেছে। এমনটি সত্যি হলে সিদ্ধান্ত নিতে তাঁর হাতে এখনো এক মাস সময় রয়েছে। মনে করা হচ্ছে, মেয়ের মাধ্যমেই ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাবেন দুতার্তে।

default-image

স্বৈরশাসকের ছেলে ‘বংবং’

ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র ফিলিপাইনে ‘বংবং’ নামেও পরিচিত। তিনি দেশটির সাবেক স্বৈরশাসক ফার্দিনান্দ মার্কোসের ছেলে। ৬ অক্টোবর তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিজের মনোনয়নপত্র জমা দেন। মার্কোস জুনিয়র মনে করছেন, করোনা মহামারিতে বিধ্বস্ত ফিলিপাইনকে একত্র করতে পারবেন তিনিই।

ফিলিপাইনে দুই দশকের বেশি সময় ধরে শাসন করেছিলেন ফার্দিনান্দ মার্কোস। ১৯৮৬ সালে আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেন। এই মার্কোস পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ফিরিস্তিটা বেশ লম্বা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দীর্ঘ সময়ের শাসনে এক হাজার কোটি মার্কিন ডলারের বেশি অর্থ অবৈধভাবে নিজেদের পকেটে ভরেছে পরিবারটি। তবে নিজেদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের অনেকই মিথ্যা বলে দাবি করেছেন মার্কোস জুনিয়র।

এদিকে দুর্নামের বোঝা ঘাড়ে থাকা মার্কোস পরিবার ফিলিপাইনের সর্বোচ্চ পদের জন্য লড়বে—এমনটি মানতে নারাজ দেশটির মানবাধিকার সংস্থাগুলো। গত বুধবার ম্যানিলায় মানবাধিকার কমিশন কার্যালয়ের বাইরে এ নিয়ে বিক্ষোভও হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা কারাপাতানের কর্মকর্তা ক্রিস্টিনা পালাবে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, মার্কোস পরিবারের কাউকে এখনো কারাগারে যেতে হয়নি। তারা এখনো দেশের মানুষের কাছে থেকে হাতিয়ে নেওয়া অর্থ ফেরত দেয়নি। সবকিছুর মধ্যেই তারা আবার ফিলিপাইনের সর্বোচ্চ পদে ফিরে আসতে চাইছে। এটি একধরনের ‘নির্লজ্জতা’।

default-image

নির্বাচনী দৌড়ে পর্ন তারকা

তাঁর জনপ্রিয়তার শুরু পর্ন ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে। এর বেশ পরে এসেছেন রাজনীতিতে। তিনি ম্যানিলার মেয়র ইসকো মোরেনো। এবার প্রেসিডেন্ট পদের জন্য লড়তে যাচ্ছেন। মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

মোরেনো কিন্তু আদতেই তাঁর আসল নাম নয়। মা-বাবা রেখেছিলেন ফ্রান্সিসকো দোমাগোসো। তারকা থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া এই ব্যক্তির দাবি, ছেলেবেলাটা তাঁর কেটেছে বেশ কষ্টের মধ্যে। বাস করতেন ম্যানিলার বস্তিতে। জীবিকার তাগিদে আবর্জনা কুড়িয়ে বিক্রি করতেন।

মোরেনোর রাজনৈতিক জীবন শুরু ম্যানিলার একজন কাউন্সিলর হিসেবে ১৯৯৮ সালে। পরে ২০০৭ সালে এসে ভাইস মেয়র নির্বাচিত হন তিনি। মোরেনো ম্যানিলার মেয়রের চেয়ারে বসেন ২০১৯ সালে। এবার তিনি নামছেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দৌড়ে।

default-image

বক্সার থেকে কোটিপতি, রাজনীতিবিদ

ম্যানি পাকিয়াওয়ের ছেলেবেলাটাও কেটেছে দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে। রোজগারের জন্য চকলেট আর সিগারেট বিক্রি করেছেন। কিশোর বয়সে পরিবারের খরচ মেটাতে দিনমজুর হিসেবেও খাটাখাটনি করেছেন। তবে বক্সিং শুরুর পর থেকে দিন বদলেছে তাঁর। পাকিয়াওকে এখন ফিলিপাইনের সর্বকালের সেরা বক্সারদের মধ্যে একজন ধরা হয়। ছেলেবেলার দারিদ্র্য কাটিয়ে তিনি এখন কোটিপতি।

পাকিয়াও ফিলিপাইনের সিনেট সদস্য। বক্সার হিসেবে যতটা জনপ্রিয়তা কুড়িয়েছেন, রাজনীতিবিদ হিসেবে ততটা সুনাম মেলেনি তাঁর। বিশ্লেষকেরা বলছেন, একজন সিনেটর হিসেবে তেমন সাফল্যের দেখা পাননি পাকিয়াও।

default-image

প্রেসিডেন্ট দুতার্তের সঙ্গেও পাকিয়াওয়ের সখ্য ছিল। দুতার্তে তাঁকে নিজের উত্তরসূরি বলে মনে করতেন। তাঁরই ছায়ায় ২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন পাকিয়াওকে। তবে পরে এসে তাঁদের দুজনের সম্পর্ক ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। দুতার্তের নানা বিষয় নিয়ে অভিযোগ তোলেন পাকিয়াও। এমনকি করোনা মহামারির সময় সহায়তার ২০ কোটি ডলার দুতার্তে প্রশাসন নিজের পকেটে ভরেছে বলেও দাবি তাঁর। এসবের জেরে দুজনের সম্পর্কে দেখা দেয় তিক্ততা।

দুতার্তের কড়া সমালোচক

আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী হতে মনোনয়ন নিয়েছেন ফিলিপাইনের বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট লেনি রোব্রেদো। রদ্রিগো দুতার্তের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত তিনি। দুতার্তের মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে হাজারো মানুষকে হত্যার অভিযোগ নিয়েও কথা বলেছেন তিনি।

তবে যাঁর বিরুদ্ধে রোব্রেদোর এত অভিযোগ, সেই দুতার্তেই কিন্তু তাঁকে ২০১৯ সালে ফিলিপাইনের মাদকবিরোধী সংস্থার উপপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ গড়াতেই তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয় ওই পদ থেকে। সে সময় অভিযোগ আনা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করেছেন রোব্রেদো।

গত বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট পদের জন্য মনোনয়ন নিয়েছেন রোব্রেদো। তবে জনপ্রিয়তার নিরিখে তিনি অন্যদের তুলনায় বেশ পিছিয়ে আছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

দুতার্তের ছায়া

ফিলিপাইনে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য মনোনয়ন নেওয়া শেষ হয়েছে। তবে এখনো সুযোগ শেষ হয়নি দুতার্তের মেয়ে সারা দুতার্তে-কারপিওর। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ফিলিপাইনের আইন মেনেই এখনো তাঁর হাতে সময় রয়েছে প্রেসিডেন্ট পদে লড়ার জন্য।

default-image

গত শুক্রবার পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট পদের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেননি সারা দুতার্তে। তবে দাভাদো শহরের মেয়র পদে লড়ার জন্য কাগজ জমা দিয়েছেন। এর আগে গত সোমবার সারার বরাত দিয়ে তাঁর মুখপাত্র বলেছিলেন, বাবার রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দেওয়ার কোনো ইচ্ছাই নেই তাঁর। তবে আইন মেনেই আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে প্রেসিডেন্ট পদে লড়ার বিষয়টি জানান দিতে পারবেন সারা। তাঁর বাবা রদ্রিগো দুতার্তেও এমনটিই করেছিলেন ২০১৬ সালে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, নানা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্যদের মতামত নিয়ে থাকেন সারা দুতার্তে, যেমনটি তাঁর বাবা কখনোই করেননি।

গণতন্ত্রের অস্তিত্বের নির্বাচন

২০২২ সালের নির্বাচন ফিলিপাইনের ‘গণতন্ত্রের অস্তিত্বের’ নির্বাচন বলে মনে করেছেন চলতি বছরে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মারিয়া রেসা। তিনি ফিলিপাইনের সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট র‌্যাপলারের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিইও।

মারিয়া রেসা বলেন, ‘আমরা একেবারে খাদের কিনারায় রয়েছি। ফিলিপাইনে আইনের শাসন থাকবে কি না, আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতি হবে কি না, আমরা করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে বাঁচতে পারব কি না, আমরা সামাজিক সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারব কি না, তা নির্বাচনে জয়ী প্রার্থীই নির্ধারণ করে দেবেন।’

সিএনএন ও রয়টার্স অবলম্বনে শেখ নিয়ামত উল্লাহ

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন