বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গত সেপ্টেম্বরে ধ্বংসস্তূপে বসে শিশুদের পাঠদানের ছবিটি তোলেন এএফপির আলোকচিত্রী খালেদ জিয়াদ। তিনি বলেন, ‘পরিবারকে সাহায্যের জন্য স্কুলে না গিয়ে কাজে যাওয়ার ব্যাপক চাপে থাকে শিশুরা। ইয়েমেনে এমন অনেক শিশু রয়েছে, যাদের বয়স ১০ বছর হয়ে গেছে, কিন্তু তারা স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায়নি।

রিবারগুলো যদি তাদের সন্তানদের খাবার, ওষুধ ও হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা দিতে না পারে, তাহলে তাঁরা কীভাবে তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাবেন?’

ইয়েমেনে এখনো দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করেনি জাতিসংঘ। কারণ দেশটির বর্তমান পরিস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্ভিক্ষ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার মতো নির্ভরযোগ্য যে তথ্য-উপাত্ত প্রয়োজন, সেগুলো সংস্থাটি এখনো পায়নি। কিন্তু দেশটির অর্ধেক জনগোষ্ঠী অর্থাৎ ১ কোটি ৬২ লাখের বেশি মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতির কারণে পুষ্টিহীনতায় ভুগছে পাঁচ বছরের কম বয়সী ২৩ লাখের বেশি শিশু। এসব কারণে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ায় ডেঙ্গু ও কলেরার মতো রোগগুলোর প্রাদুর্ভাব ছড়িয়েছে। দেশটির অধিকাংশ মানুষের কাছে এসবের তুলনায় কোভিড মহামারি নিয়ে উদ্বেগ অনেকটাই কম।

ইয়েমেনে শিশুদের শৈশব আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। সংঘাত শুরু হওয়ার আগে কিছু গ্রামাঞ্চলে গড়ে মাত্র ১৪ বছর বয়সে মেয়েদের বিয়ে হচ্ছিল। সংঘাত শুরুর পর থেকে তা আরও কমতে শুরু করে। অপর দিকে ১১ বছর বয়সী পর্যন্ত কিশোরদের বেশ জটিল একটি যুদ্ধে বিবদমান পক্ষগুলোর হয়ে লড়াই করতে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

এএফপির আলোকচিত্রী খালেদ জিয়াদ বলছেন, হায়েসের স্কুলটিতে প্রাথমিক সাক্ষরতা ও সংখ্যার পাঠ পাওয়া বেশির ভাগ শিশু ইতিমধ্যে অন্যান্য এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। কারণ বেশির ভাগ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণকারী ইরান–সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত নেতৃত্বাধীন জোটের লড়াই থেকে প্রাণে বাঁচতে পরিবারগুলো পালিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছে। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের হয়ে যুদ্ধ করছে এই জোট।

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বিবদমান পক্ষগুলো ২০১৫ সালের মার্চ থেকে অন্তত ২৩১ বার বিভিন্ন স্কুলে হামলা করেছে। ওই বছর ইয়েমেনে অভিযান শুরু করে সৌদি-আমিরাতের সামরিক জোট। ২০১৮ সালে হুতিদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত সাদা প্রদেশে একটি স্কুলবাসে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় ৪৪ শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর জোটের বিমান হামলার সংখ্যা অবশ্য কিছুটা কমেছে।

খালেদ জিয়াদ বলছেন, ‘স্কুলে যাওয়ার পর শিক্ষার্থীরা নিজেদের নিরাপদ মনে করে না। শিক্ষা উপকরণ কেনার সামর্থ্য নেই তাদের। স্কুলগুলো একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছে। বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে এমনটা চলছে এবং এখনো তাদের যথোপযুক্ত শিক্ষা পাওয়ার মতো কোনো সুযোগ তৈরি হয়নি।’

দেশের অনেক এলাকার সরকারি চাকরিজীবীরা কয়েক বছর ধরে বেতন পাচ্ছেন না। অর্থাৎ অনেক শিক্ষক ও চিকিৎসককে বিনা বেতনে কাজ করে যেতে হচ্ছে। ইয়েমেনের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার। এসব শিক্ষকের মধ্যে প্রায় তিন ভাগের দুই ভাগই নিয়মিত বেতন পান না।

জিয়াদ জানান, ‘শিক্ষকেরা তাঁকে বলেন, বেতন না পেয়ে বেঁচে থাকাটা কষ্টকর হলেও শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাকে তাঁরা দায়িত্ব মনে করেন। তাঁরা যদি তাঁদের এ দায়িত্ব ছেড়ে চলে যান, তাহলে তাঁরা জানেন বিপর্যয় আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে। তাই এ তো কিছুর পরও তাঁরা তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ এ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।’

হোদেইদাহ শহরের পাশে থাকেন খালেদ জিয়াদ। তিনি আশা করেন, আলোকচিত্রী হিসেবে তাঁর কাজ বিশ্ববাসীকে ইয়েমেনের এ ভয়াবহ পরিস্থিতিটা বুঝতে সাহায্য করবে। তবে তিনি তাঁর দুই বছরের ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুবই চিন্তিত। জিয়াদ বলেন, ‘যুদ্ধ চলতে থাকলে আমার ছেলে বা হোদেইদাহর অন্য শিশুরা ভালো একটি ভবিষ্যৎ পাবে বলে মনে হয় না। তাদের ভবিষ্যৎও শেষ হয়ে যাবে।’

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন