default-image

মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পরপরই যুক্তরাষ্ট্র শাসিয়ে দিয়েছিল। দেশটিতে গণতন্ত্র পুনর্বহাল না করলে, রাজনৈতিক নেতাদের মুক্তি না দিলে সামরিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সরাসরি হুমকি দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সেই হুমকি গায়ে লাগাচ্ছে না মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। উল্টো তারা বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে শক্তিপ্রয়োগের নীতি বেছে নেয়। গণতন্ত্রের দাবিতে বিক্ষোভরত ব্যক্তিদের ওপর গত মঙ্গলবার সরাসরি গুলি চালানো হয়। গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমনে রাজনীতিক-বিক্ষোভকারীদের বাড়িতে বাড়িতে হানা দিচ্ছে দেশটির সামরিক জান্তা। চলছে গ্রেপ্তার।

মিয়ানমারের সামরিক জান্তার এমন বেপরোয়া আচরণের প্রেক্ষাপটে গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তাঁর হুমকিকে কাজে রূপ দেন। তিনি প্রথম দফার নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেন।

মিয়ানমারের ১০ জন বর্তমান-সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার নিশানা করা হয়েছে। মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের জন্য এই ১০ কর্মকর্তা দায়ী বলে গণ্য করছে যুক্তরাষ্ট্র। তাঁদের মধ্যে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং আছেন। ১০ কর্মকর্তার পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যরাও নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়তে পারেন।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর মালিকানাধীন বা নিয়ন্ত্রিত তিনটি কোম্পানিকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রে থাকা মিয়ানমারের ১০০ কোটি ডলারের সরকারি তহবিল দেশটির সেনাবাহিনী যাতে ব্যবহার করতে না পারে, সে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়ে দিয়েছে ওয়াশিংটন। তা ছাড়া কঠোর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণবিধিও আরোপ করা হচ্ছে।

প্রয়োজনে মিয়ানমারের সেনাশাসকদের বিরুদ্ধে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বাইডেন। যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক অংশীদার ও মিত্রদের যুক্ত করার লক্ষ্যে কাজ করা হবে বলে উল্লেখ করেছেন বাইডেন।

যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও যুক্তরাজ্য ও ইউরোপ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো, এসব নিষেধাজ্ঞায় মিয়ানমারের জান্তারা কি দমে যাবে? তারা কি শিগগিরই ক্ষমতা ছেড়ে গণতন্ত্র পুনর্বহাল করবে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে একটু অতীতে যেতে হবে।

বিজ্ঞাপন
default-image

ইতিহাস বলে, মিয়ানমারের সামরিক জান্তার জন্য নিষেধাজ্ঞার অভিজ্ঞতা নতুন কিছু নয়। সামরিক শাসন, রাজনৈতিক নেতাদের বন্দী কিংবা রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের মতো অপকর্মের জন্য তারা আগেও একাধিকবার নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসেছে।

২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইংসহ চারজন সামরিক কমান্ডারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। নিষেধাজ্ঞায় থাকা মিয়ানমারের সেই সেনাপ্রধানই ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়ে দেশটির ক্ষমতা দখল করেন। নির্বাচিত সরকারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি, প্রেসিডেন্ট উইন মিন্টসহ শীর্ষ নেতাদের বন্দী করে এক বছরের জন্য জরুরি অবস্থা জারির মধ্য দিয়ে সামরিক জান্তা জানান দিচ্ছে, তারা এবারও সহজে যাচ্ছে না।

সহজে যাবেই-বা কেন! মিয়ানমারের জেনারেলরা আগেই প্রমাণ করেছেন, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তাঁরা টিকে থাকতে পারেন।

সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনেও এই বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ানমারের জেনারেলদের ওপর আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

অতীতে যে উদ্দেশ্য নিয়ে মিয়ানমারের জেনারেলদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তারপর দেখা গেছে—অনেকাংশেই তাঁরা অধরা থাকতে সক্ষম হয়েছেন। তাই অতীতের ধারাবাহিকতায় এবারও মিয়ানমারের জেনারেলদের ওপর নিষেধাজ্ঞা অর্থহীন হবে বলেই মনে হচ্ছে।

অন্যদিকে মিয়ানমারের ওপর ব্যাপকভিত্তিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলে তাতে দেশটির সামরিক কর্তৃপক্ষের চেয়ে বরং সাধারণ জনগণই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আগে তেমনটাই দেখা গেছে।

তা ছাড়া মিয়ানমারের সামরিক সরকারের ওপর নিষেধাজ্ঞার আরও একটা নেতিবাচক দিকও আছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নিষেধাজ্ঞার মুখে দেশটি আরও চীনমুখী হতে পারে।

default-image

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মিয়ানমারবিষয়ক উপদেষ্টা রিচার্ড হোরসি মনে করেন, নিষেধাজ্ঞার একটা প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে তা প্রভাবও ফেলতে পারে। কিন্তু এমনটা ভেবে বসে থাকার কোনো কারণ নেই যে তা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর আচরণে পরিবর্তন আনবে।

একই মত বারাক ওবামা আমলের পূর্ব এশিয়াবিষয়ক রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল রাসেলের। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওপর নিষেধাজ্ঞার পর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে করেন না তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান যে তোয়াক্কা করেন না, তা উঠে এসেছে মিয়ানমারে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত ডেরেক মিশেলের ভাষ্যে। তাঁর ভাষ্য, মিয়ানমারের সেনাপ্রধান এখন আর যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে চিন্তা করেন বলে তিনি মনে করেন না।

তাহলে উপায়?

মিয়ানমারে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা, তার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারসহ চলমান সংকটের সমাধানে টেকসই ও কুশলী কূটনীতির পথে হাঁটার পরামর্শ দিচ্ছেন ড্যানিয়েল রাসেল। এই কূটনীতি দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় উভয় ধরনেরই হতে হবে।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে চাপে ফেলার আরেকটা উপায় আছে। সে উপায়টি রয়েছে খোদ মিয়ানমারের জনগণের হাতেই। মিয়ানমারের সমাজের প্রায় সব স্তরের মানুষ সেনাশাসনকে প্রত্যাখ্যান করছেন। তাঁরা হুমকি-ধমকি, ভয়ভীতি, গ্রেপ্তার, দমন-পীড়ন উপেক্ষা করে টানা বিক্ষোভ করে যাচ্ছেন। বিপুল মানুষের এই বিক্ষোভে সামরিক জান্তা ইতিমধ্যে উদ্বিগ্ন। তাই তারা গুলিও ব্যবহার করতে শুরু করেছে।

মিয়ানমারে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলনের শক্তি প্রসঙ্গে রিচার্ড হোরসি বলেন, ‘এটাই আসল চাপ।’

বিজ্ঞাপন
এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন