বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
অন্যান্য পরিবারের মতো নারী বিচারকদের নির্ভয়ে বাস করা উচিত। কেউ তাঁদের অবশ্যই হুমকি দেবেন না। আমাদের বিশেষ সামরিক ইউনিট এ ধরনের অভিযোগ তদন্ত করবে ও বিধি লঙ্ঘন হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।
বিলাল কারিমি, তালেবানের মুখপাত্র

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তার জন্য আফগান নারী বিচারকদের অনেকেই নিজেদের নাম বদলে ফেলেছেন। যাতে সহজে তাঁদের সন্ধান পাওয়া না যায়। বিবিসির সঙ্গে কথা বলেছেন বিচারক মাসুমা (ছদ্মনাম)। পেশা জীবনে তিনি সফলতার সঙ্গে ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের শতাধিক মামলায় আসামিদের সাজা দিয়েছেন।

আফগানিস্তানের একটি শহরে এতদিন নিরাপদে বসবাস করছিলেন মাসুমা। তবে তাঁর শহরে তালেবান যোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর সেখানকার কারাগার থেকে হাজারও সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীকে মুক্তি দেওয়া হয়। এর পরই বদলে যায় মাসুমার জীবন। তাঁর আদেশে যেসব আসামি কারাগারে গিয়েছিলেন, বেরিয়ে এসে তাঁরা মাসুমাকে হত্যার হুমকি দিতে শুরু করেন। অপরিচিত নম্বর থেকে হুমকিসহ ক্ষুদে বার্তায় ভরে ওঠে তাঁর মুঠোফোন।

বিবিসিকে মাসুমা বলেন, ‘মধ্যরাতে আমরা জানতে পারি তালেবান স্থানীয় কারাগার থেকে সব কয়েদিকে মুক্ত করে দিয়েছে। এ ঘটনায় দ্রুত আমরা পালিয়ে আসি। বাড়ি–ঘর, সবকিছু ফেলে এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছি।’ মাসুমা জানান, যাতে কেউ চিনতে না পারে সে জন্য বোরকা পরে সব চেকপয়েন্ট পার হয়েছেন। তিনি বাড়ি থেকে পালানোর পর প্রতিবেশীদের কাছে জানতে পারেন, তালেবান সদস্যরা তাঁর খোঁজে বাড়িতে এসেছিলেন।

গত ২০ বছরে আফগানিস্তানে ২৭০ জন নারী বিচারক পদে এসেছেন। তাঁদের অনেকেই দেশটিতে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ২২০ জনের বেশি নারী বিচারক নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে অজ্ঞাত জায়গায় লুকিয়ে রয়েছেন, প্রাণভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

ফোনে প্রতিবেশীদের কাছে বর্ণনা শুনে মাসুমা ওই ব্যক্তিকে চিনতে পেরেছেন। তিনি জানান, তাঁকে খুঁজতে আসা ওই ব্যক্তি তালেবান সদস্য। তালেবানের ক্ষমতা দখলের কয়েক মাস আগে তাঁর আদালতে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে একটি মামলা চলেছিল। সে তাঁর স্ত্রীকে হত্যা করেছিল। তদন্তে দোষি প্রমাণিত হওয়ায় ওই ব্যক্তিকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেন মাসুমা। তবে তালেবানের ক্ষমতা দখলের পর মুক্তি পান সাজাপ্রাপ্ত ওই ব্যক্তি।

মামলার রায় ঘোষণার পরও ওই ব্যক্তি মাসুমাকে হুমকি দিয়েছিল। এ বিষয়ে মাসুমা বলেন, ‘রায় শুনে সাজাপ্রাপ্ত ওই আসামি বলেছিল, আমি আমার স্ত্রীকে হত্যা করেছি। কারাগার থেকে বেরিয়ে আমি আপনার সঙ্গেও একই কাজ করব।’ মাসুমা আরও বলেন, ‘ওইসময় আমি তাঁর এমন কথাকে গুরুত্ব দেইনি। কিন্তু এখন সময় বদলে গেছে। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর ওই ব্যক্তি আমাকে একাধিকবার ফোন করেছে। সে আদালত থেকে আমার সম্পর্কে সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ করেছে। সে আমাকে হত্যা করে প্রতিশোধ নিতে চায়।’

তিন দশকের বেশি সময় ধরে আফগানিস্তানে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন সানা (ছদ্মনাম)। মূলত নারী ও শিশুদের ওপর পরিচালিত নির্যাতনের বিচার করতেন তিনি। তাঁর আদালতে বেশিরভাগ মামলা ছিল তালেবান ও জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সদস্যদের বিরুদ্ধে। তালেবানের আমলে এখন তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাড়ি ছেড়ে গোপন জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন।

এ বিষয়ে সানা বিবিসিকে বলেন, ‘আমি ২০টির বেশি ফোন কল পেয়েছি। এসব কলে আমাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। হুমকিদাতারা সবাই সাজাপ্রাপ্ত আসামি। তালেবান ক্ষমতা নেওয়ার পর তাঁরা মুক্ত জীবনযাপন করছে।’

পশ্চিমা সমর্থিত সরকারের শাসনামলে আফগানিস্তানের বিচার বিভাগে নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছিল। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২০ বছরে আফগানিস্তানে ২৭০ জন নারী বিচারক পদে এসেছেন। তাঁদের অনেকেই দেশটিতে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ২২০ জনের বেশি নারী বিচারক নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে অজ্ঞাত জায়গায় লুকিয়ে রয়েছেন, প্রাণভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে বিবিসির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তাঁদের অনেকেই ফোন নম্বর বদলে ফেলেছেন। নিরাপত্তার জন্য কয়েকদিন পর পর তাঁদের লুকিয়ে থাকার জায়গা বদলাতে হচ্ছে।

default-image

মাসুমাসহ ছয়জন আফগান নারী বিচারকের সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি। তালেবানের আমলে তাঁদের সবাই হত্যার হুমকি পেয়েছেন। দেশটিতে তালেবানের ক্ষমতা দখলের আগে স্ত্রী হত্যার দায়ে যাদের সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছিলেন, এখন তাঁরা কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে হত্যার হুমকি দিচ্ছেন এসব নারী বিচারকদের।

এ বিষয়ে তালেবানের সঙ্গেও কথা বলেছে বিবিসি। অভিযোগের জবাবে তালেবানের মুখপাত্র বিলাল কারিমি বলেন, ‘অন্যান্য পরিবারের মতো নারী বিচারকদের নির্ভয়ে বাস করা উচিত। কেউ তাঁদের অবশ্যই হুমকি দেবেন না। আমাদের বিশেষ সামরিক ইউনিট এ ধরনের অভিযোগ তদন্ত করবে ও বিধি লঙ্ঘন হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।’

বিলাল কারিমি আরও বলেন, ‘আফগানিস্তানজুড়ে বিদায়ী সরকারের সঙ্গে কাজ করা সকল সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারিদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছে তালেবান। এর পরও কেউ যদি দেশ ছাড়তে চান, তাঁদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, এটা করার প্রয়োজন নেই। তাঁরা আফগানিস্তানে থাকতে পারবেন।’

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন