করোনা মহামারি মোকাবিলায় ব্যর্থতার জন্যও রদ্রিগো দুতার্তে সমালোচিত। এ মহামারিতে দেশটিতে কমপক্ষে ৬০ হাজার ৫০০ জন মারা গেছেন।

রদ্রিগো দুতার্তের স্থলাভিষিক্ত হতে ১০ জন প্রার্থী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়ছেন। তবে তাঁদের মধ্যে দুজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে রয়েছেন।

প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সবার চেয়ে এগিয়ে থাকা দুই প্রার্থীর একজন ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র। তিনি তাঁর দেশে ‘বংবং’ নামে সুপরিচিত। তাঁর বাবার নাম ফার্দিনান্দ মার্কোস। তিনি স্বৈরশাসক হিসেবে ফিলিপাইন শাসন করেছিলেন। ১৯৮৬ সালের গণ-অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। পরে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন।

দ্বিতীয় প্রার্থী হলেন দেশটির বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট লেনি রোব্রেডো। তিনি অধিকতর জবাবদিহিমূলক ও স্বচ্ছ সরকারব্যবস্থার পাশাপাশি দেশে গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত করার অঙ্গীকার করেছেন।

মার্কোস জুনিয়র ও লেনি রোব্রেডোর মধ্যকার পার্থক্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে ফিলিপাইনের ডিলিমান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যারিস আরুগে বলেন, ‘এ নির্বাচন সত্যিই ভালো বনাম মন্দের লড়াই। বিষয়টি একদম পরিষ্কার।’

অ্যারিস আরুগের মতে, এ নির্বাচনে প্রধান দুই প্রার্থীর একটি পক্ষ (মার্কোস জুনিয়র) পরিবারতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র ও অপরাধের দায়মুক্তির প্রতিনিধিত্ব করে। অন্য পক্ষ (লেনি রোব্রেডো) প্রতিনিধিত্ব করে সততা, জবাবদিহি ও গণতন্ত্রের।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচন

১৮ বছর ও তার চেয়ে বেশি বয়সী ভোটাররা আজ ভোট দিচ্ছেন। দেশটিতে মোট ভোটার ৬৭ দশমিক ৫ মিলিয়ন। প্রবাসী ভোটার ১ দশমিক ৭ মিলিয়ন।

স্থানীয় সময় আজ সকাল ছয়টায় ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে। ভোট গ্রহণ চলবে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত।

ভোট শেষ হওয়ার পরই শুরু হবে গণনা। সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া প্রার্থীই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হবেন।

ভোট শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে জয়ী প্রার্থীর নাম জানা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। জয়ী প্রার্থী আগামী মাসে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন।

ফিলিপাইনের রাজনীতিতে সহিংসতার ইতিহাস আছে। তাই আজকের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

প্রধান দুই প্রার্থী

জনমত জরিপে মার্কোস জুনিয়র এগিয়ে রয়েছেন। তবে তাঁর সঙ্গে ব্যবধান কমিয়ে আনছেন লেনি রোব্রেডো।

৬৪ বছর বয়সী মার্কোস জুনিয়র ইংল্যান্ডের প্রাইভেট স্কুলে পড়েছেন। পরে পড়েছেন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে।

মার্কোস জুনিয়রের অফিশিয়াল জীবনবৃত্তান্ত অনুযায়ী, তিনি স্নাতক ডিগ্রিধারী। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য বলছে, তিনি সামাজিক গবেষণায় ‘বিশেষ ডিপ্লোমা’ করেছেন।

১৯৮০ সালে মার্কোস জুনিয়র রাজনীতিতে নাম লেখান। যে এলাকায় তিনি রাজনীতি শুরু করেন, সেটি তাঁর পরিবারের শক্ত ঘাঁটি।

মার্কোস জুনিয়র প্রাদেশিক গভর্নর ছিলেন। তিনি এমন সময় গভর্নর ছিলেন, যখন তাঁর বাবা ক্ষমতাচ্যুত হন, দেশে গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার ঘটে।

১৯৯২ সালে মার্কোস জুনিয়র কংগ্রেসের সদস্য নির্বাচিত হন। তিন বছর পরে তিনি কর ফাঁকির জন্য দোষী সাব্যস্ত হন।

২০১০ সালে মার্কোস জুনিয়র সিনেটর নির্বাচিত হন। পরে তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট হতে নির্বাচন করলেও ব্যর্থ হন।

নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সময় মার্কোস জুনিয়র ঐক্যের কথা বলেন। কিন্তু তিনি তাঁর নীতির বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি। তিনি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেওয়া ও বিতর্ক এড়িয়ে গেছেন।

মার্কোস জুনিয়রের রানিংমেট হিসেবে আছেন সারা দুতার্তে-কারপিও। তিনি রদ্রিগো দুতার্তের মেয়ে। সারা দুতার্তে মেয়র ছিলেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে তিনি এগিয়ে আছেন।

অন্যদিকে, বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট লেনি রোব্রেডো একসময় মানবাধিকার আইনজীবী ছিলেন। তাঁর স্বামী মন্ত্রী ছিলেন। উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় স্বামীর মৃত্যুর পর ২০১৩ সালে তিনি রাজনীতিতে নামেন।

মার্কোসকে নিয়ে কেন শঙ্কা

মার্কোস জুনিয়রের বাবা ফার্দিনান্দ মার্কোস ১৯৬৫ সালে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট হন। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে তিনি ১৯৬৯ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে জয়লাভ করেন।

তিন বছর পর দেশে সামরিক আইন জারি করেন ফার্দিনান্দ মার্কোস। তিনি দাবি করেন, কমিউনিস্টদের হাত থেকে জাতিকে বাঁচানোর জন্য সামরিক আইন জারির বিকল্প ছিল না।

স্বৈরশাসক হিসেবে ফার্দিনান্দ মার্কোস ১৪ বছর দেশ শাসন করেন। তাঁর শাসনামলে তিন হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়। অন্যদের মধ্যে ভয় ঢুকিয়ে দিতে লোকজনকে মেরে লাশ রাস্তার পাশে ফেলে রাখা হতো।

ফার্দিনান্দ মার্কোসের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ ছিলেন বেনিগনো অ্যাকুইনো জুনিয়র। তিনি ১৯৮৩ সালে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ড ফিলিপাইনের জনগণকে ক্ষুব্ধ করে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ফার্দিনান্দ মার্কোসের শাসনামলের ব্যাপক দুর্নীতি ও বাড়াবাড়ি থেকে ক্ষোভ।

ফিলিপাইনে অনেক মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছিল। অথচ মার্কোসের পরিবার নিউইয়র্ক ও ক্যালিফোর্নিয়ায় সম্পত্তি কেনে। এই পরিবারের সদস্যরা বিলাসী জীবন যাপন করছিলেন। পরিবারটির সদস্যদের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে।

ফার্দিনান্দ মার্কোসের পতনের পর একপর্যায়ে তাঁর পরিবারের সদস্যরা নিজেদের ফিলিপাইনের রাজনীতিতে ফের প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন। তাঁরা ফার্দিনান্দ মার্কোসের স্বৈরশাসনামলকে ফিলিপাইনের ‘স্বর্ণযুগ’ বলে প্রচার চালাতে থাকেন। একপর্যায়ে দুতার্তের পরিবার মার্কোসদের মিত্র বনে যায়।

ফিলিপাইনের অনেকেই মার্কোস জুনিয়রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বিগ্ন। একই সঙ্গে তাঁরা মার্কোস জুনিয়রের রানিংমেটের (সারা দুতার্তে-কারপিও) জয়ের সম্ভাবনা নিয়েও চিন্তিত। কারণ, মার্কোস-দুতার্তে পরিবারের শাসনে ফিলিপাইনে দমনপীড়নের একটি নতুন যুগের সূচনা হতে পারে।

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন