বৈরুতের শিশুরা ট্রমাগ্রস্ত

বিজ্ঞাপন
default-image

আবেদ ইতানি। বয়স তিন বছর। ৪ আগস্ট লেবাননের বৈরুতে যখন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, তখন সে খেলছিল। কিন্তু এই বিস্ফোরণে তার ঘরের কাচের দরজা টুকরা টুকরা হয়ে যায়। আর এই কাচের টুকরা দিয়ে ইতানির হাত–পা কেটে যায়। তারপর আহত অবস্থায় তাকে নেওয়া হয় হাসপাতালে। সেখানে জরুরি কক্ষে তখন অনেকেই ছিলেন, যাঁরা আহত ও রক্তাক্ত। ইতানি তাঁদের দেখেছিল। তারপর থেকে আর স্বাভাবিক আচরণ করছে না ইতানি।

এবিসি নিউজ ও বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়েছে, ইতানির মতো অনেকেই ট্রমাগ্রস্ত। শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অধিকার ও অর্থনীতি নিয়ে কাজ করা যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন সেভ দ্য চিলড্রেনের হিসাব অনুসারে, এই বিস্ফোরণে প্রায় এক লাখ শিশু গৃহহীন হয়েছে। এর মধ্যে এটি বড় অংশ ট্রমাগ্রস্ত।

আবেদ ইতানির মা হিবা আচি। তিনি বলেন, ‘আমি যখন হাসপাতালে যাই, তখন দেখতে পাই, ইতানি জরুরি সেবাকক্ষের এক কোনায় বসে কাঁপছে এবং রক্তাক্ত মানুষগুলোকে দেখছে। জরুরি সেবাকক্ষের পুরো মেঝে তখন রক্তে ভেসে যাচ্ছিল।’ তিনি বলেন, তারপর থেকে ইতানি লাল যেকোনো কিছু দেখলেই ভয় পাচ্ছে। সে লাল জুতা পরতেও ভয় পাচ্ছে। ইতানি চাইছে এই লাল জুতাগুলো ধুয়ে দেওয়া হোক।

বৈরুত বন্দরে ওই বিস্ফোরণে কমপক্ষে ১৭০ জন নিহত হন। আহত হন প্রায় ছয় হাজার মানুষ। জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ জানিয়েছে, কমপক্ষে ৩১টি শিশু প্রাণ হারিয়েছে এই বিস্ফোরণে।

হিবা আচি বলেন, যেকোনো শব্দ শুনলে ইতানি কেঁপে ওঠে। খাবার খাচ্ছে না ঠিকমতো। সে হাসিখুশি ছিল, কিন্তু এখন আর কথা বলছে না। এ প্রসঙ্গে সেভ দ্য চিলড্রেনের মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ জয় আবি হাবিব বলেন, ট্রমাগ্রস্ত হয়ে বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন ধরনের আচরণ করে।

ইতানির মতো আরও দুই শিশু ইয়াসমিন (৮) ও তালিয়া (১১)। এই দুই শিশুর মা জয়নাব গাজালে বলেন, এই বিস্ফোরণে তাঁদের ঘরের জানালা ভেঙে গেছে। তারপর থেকে শিশু দুটি আর একা ঘুমাতে চায় না। তিনি আরও বলেন, ‘আমার মেয়ে ইয়াসমিন আমাকে জিজ্ঞেস করে, “আমার ছোটবেলা এমন কেন?”’

এই বিস্ফোরণের পর অনেক শিশুর চিকিৎসা দিয়েছেন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ মাহা গাজালে। তিনি বলেন, অনেক শিশু অনিশ্চয়তার মধ্যে
রয়েছে। তারা জিজ্ঞেস করছে, এমন ঘটনা আবার ঘটবে না তো? অনেক শিশু বাড়ি ফিরে যেতে ভয় পাচ্ছে। কাচের দরজা-জানালার কাছে যেতে
ভয় পাচ্ছে।

রিকার্ডো মোলাসচির বাবা ইতালির এবং মা লেবাননের। ছয় বছর বয়সী এই শিশু লেবানন এসেছিল নানার বাড়িতে। তার নানা মারা গেছেন এই বিস্ফোরণে। তারপর থেকে রিকার্ডো সারাক্ষণ ক্ষিপ্ত থাকে। সে বিস্ফোরণের কারণ জানে না। কিন্তু বলছে, ‘আমি ওদের আগ্নেয়গিরির মধ্যে ফেলে দিতে চাই।’

রিকার্ডো, ইতানি, ইয়াসমিন ও তালিয়ার মতো অনেকে অস্বাভাবিক আচরণ করছে। এদের অনেকেরই মা–বাবা চিন্তা করছেন দেশ ছাড়ার।
এ প্রসঙ্গে ইতানির মা বলেন, ‘এই দেশ ইতানির জন্য নিরাপদ নয়। কখনো ছিল না। কোনো দিনই নিরাপদ হবে না। আমি আর এখানে থাকতে
চাই না।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন