ব্রিকসের সদস্য দেশগুলো হলো—ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা। জোটের ১৪তম এই শীর্ষ সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন ছাড়াও চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিন পিং, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারো ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা অংশ নেন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়, ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন পশ্চিমাদের একটি বার্তা দিয়েছেন। সেই বার্তাটি হলো, ইউক্রেনে হামলার জেরে মস্কোর বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাশিয়া ‘একা’ নয়।

ইউক্রেনে হামলার জেরে রাশিয়ার ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমারা। অভূতপূর্ব এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় খোদ পুতিনও পড়েছেন।

পশ্চিমাদের এ নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য রাশিয়াকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা। রাশিয়ার অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া। রাশিয়াকে দুর্বল করে দেওয়া।

ইউক্রেনে রুশ হামলার কয়েক সপ্তাহ আগে চীনের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল যে, বেইজিং ও মস্কোর মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো ‘সীমা’ নেই। ব্রিকস জোটভুক্ত প্রতিটি দেশের নেতাই ইউক্রেনে রুশ হামলার ঘটনায় মস্কোর সরাসরি নিন্দা করা এড়িয়ে গেছেন।

এখন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিয়ে পুতিন পশ্চিমাদের বার্তা দিলেন যে রাশিয়াকে বিচ্ছিন্ন করা যায়নি।

উল্টো পুতিন ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিয়ে পশ্চিমাদের একহাত নিয়েছেন।

বিশ্বের প্রধান উদীয়মান অর্থনীতির পাঁচ দেশের এই জোটের বয়স এক দশকের বেশি। কিছু সাধারণ স্বার্থ থাকা সত্ত্বেও এই জোট দীর্ঘদিন ধরে সংহতির প্রশ্নে জর্জরিত।

জোটের সদস্যদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পার্থক্য আছে। আছে ভিন্ন ভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ। জোটের সদস্যদের মধ্যে অবিশ্বাসও লক্ষণীয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নানা অস্বস্তি সত্ত্বেও ইউক্রেন সংকটসহ বর্তমান পরিস্থিতিতে জোটের ১৪তম এই শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন বৈশ্বিক শৃঙ্খলা সম্পর্কে ব্রিকস দেশগুলোর একটি দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটায়, যে দৃষ্টিভঙ্গিটি পশ্চিমাদের থেকে ভিন্ন।

দুই দিনব্যাপী চলমান ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন প্রসঙ্গে নয়াদিল্লিভিত্তিক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের (সিপিআর) সিনিয়র ফেলো সুশান্ত সিং বলেন, ‘আমরা এমন কিছু বড় অর্থনীতির দেশের কথা বলছি, যে দেশগুলোর নেতৃত্ব পুতিনের সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছুক, এমনকি তা যদি শুধু ভার্চ্যুয়াল প্ল্যাটফর্মেও হয়।’

সুশান্ত সিং আরও বলেন, এই সম্মেলনে পুতিনকে স্বাগত জানার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ এই দিক দিয়ে যে, বিশ্বে তিনি অচ্ছুত নন। তিনি সমাজচ্যুত নন। তাঁকে সমাজের বাইরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে না। এটা পুতিনের জন্য একটি ইতিবাচক দিক।

কিছুদিন আগেই বিশ্বের উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর জোট জি-৭-এর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জোট সদস্যদের সোচ্চার থাকতে দেখা যায়। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল করে রাশিয়া। ক্রিমিয়া দখলের জেরে এই জোট থেকে রাশিয়াকে বহিষ্কার করা হয়।

জি-৭ সম্মেলনে ইউক্রেন ইস্যুতে জোটের সদস্যদের যেভাবে কঠোর মনোভাব প্রদর্শন করতে দেখা গেছে, তার বিপরীতে চলমান ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে তেমন কিছু দেখা যাবে না। ইউক্রেন ইস্যুতে ব্রিকস জোটের অন্য সদস্যরা সতর্কতার সঙ্গে কথাবার্তা বলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সম্ভবত তারা ইউক্রেন সংকটের একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে কথা বলবে।

রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে কতটা পড়ছে, তা যাচাই করার জন্য পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি সতর্কতার সঙ্গে ব্রিকস জোট আহ্বান জানাতে পারে বলে মত পর্যবেক্ষকদের।

সম্মেলনের আয়োজক দেশ চীন তার নিজস্ব অ্যাজেন্ডায় গুরুত্ব দেবে বলে মনে হচ্ছে। সম্মেলনে বেইজিং তার নতুন বৈশ্বিক উন্নয়ন ও নিরাপত্তা উদ্যোগ প্রচার করতে পারে।

গত মাসে ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে শি চিন পিং বলেছিলেন, জোটের সদস্য দেশগুলোর উচিত রাজনৈতিক পারস্পরিক আস্থা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করা। গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ইস্যুতে সমন্বয় করা। একে অপরের মূল স্বার্থের বিষয়টি মিটমাট করা। আধিপত্যবাদ ও ক্ষমতার রাজনীতির বিরোধিতা করা। সম্মেলনে তিনি এই অস্থির ও রূপান্তরের সময়ে উন্নয়নের প্রচার-প্রসারের জন্য জোটের সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন।

গতকাল ব্রিকস সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে চীনা প্রেসিডেন্ট মস্কোর ওপর পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞার অপপ্রয়োগ স্নায়ুযুদ্ধের মানসিকতার শামিল।

কয়েকটি দেশের একতরফা নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি কুক্ষিগত করার প্রচেষ্টার বিরোধিতা বিশ্বের করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন সি চিন পিং।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ব্রিকস বিশ্বের বিভিন্ন ফোরামে প্রধান উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর আরও প্রতিনিধিত্বের আহ্বান জানিয়ে আসছে।

ব্রিকস বিভিন্ন ক্ষেত্রে পশ্চিমা শক্তিগুলোর একটি অসম আধিপত্য লক্ষ করার কথা বলে আসছে। তারা এই আধিপত্যের বিরোধিতা করছে। তারা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকে সংস্কারের জন্য চাপ দিচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ শাহার হামিরি বলেন, মার্কিন ডলার ব্যবস্থার বাইরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কীভাবে নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য করতে পারে, তা নিয়ে আগে আলাপ-আলোচনা-উদ্যোগ দেখা গেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে এই বিষয়টি এখন ব্রিকসের জন্য আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে।

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন