মরিশাসে জাপানের সমুদ্র বিপর্যয়

বিজ্ঞাপন
default-image

ভারত মহাসাগরের দ্বীপ দেশ মরিশাসকে গণ্য করা হয় প্রকৃতির এক বিরল আশীর্বাদ হিসেবে। বিস্তীর্ণ শান্ত সমুদ্রের স্বচ্ছ পানির নিচে সেখানে দেখা যায় প্রবালপ্রাচীর আর নানা ধরনের সামুদ্রিক জীবনের আনাগোনা। আর সেই আকর্ষণে মরিশাসে প্রতিবছর আগমন ঘটে প্রচুরসংখ্যক পর্যটকের। এখন অবশ্য করোনাভাইরাস আতঙ্কের কারণে বন্ধ হয়ে আছে পর্যটন ব্যবসা। ফলে অন্যান্য অনেক দেশের মতোই মরিশাসের এ খাতটি এখন বিপর্যয়ের মুখে। চলমান সেই বিপর্যয়ের সঙ্গে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে নতুন এক বিপদ। মরিশাসের বিস্তৃত সমুদ্র উপকূলকে যা ঠেলে দিয়েছে অন্য এক বিপর্যয়ের মুখে। মারা যাচ্ছে নানা প্রজাতির সামুদ্রিক জীবন, ধ্বংস হচ্ছে প্রবালপ্রাচীর। আগের সেই স্বচ্ছ নীল সমুদ্রজুড়ে এখন ছড়িয়ে পড়েছে তৈলাক্ত কালো বিষ।

ঘটনার পেছনে আছে জাপানের একটি তেলবাহী ট্যাংকার। জাপানের জাহাজ কোম্পানি মিৎসুই ও এ এস কে লাইনের একটি তেলবাহী ট্যাংকার এমভি ওয়াকাশিও গত মাসের ২৫ তারিখে মরিশাসের উপকূলের অদূরে পৌঁছে বিকল হয়ে যায়। চার হাজার টন জ্বালানি তেল সেই ট্যাংকার বহন করছে। এরপর থেকেই জাহাজ থেকে তেল চুইয়ে পড়তে শুরু করে এবং একই সঙ্গে জাহাজটিও ধীরে ধীরে ডুবে যেতে থাকে। জাহাজ এমনি ডুবে গেলে ক্ষতি তেমন নেই। তবে এর বহন করা মালামাল ক্রমেই বিস্তৃত এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ায় নতুন এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে ভারত মহাসাগরের এই দ্বীপরাষ্ট্র।

পর্যটন খাত হচ্ছে মরিশাসের অর্থনীতির প্রধান চালনশক্তি। পর্যটন খাতকে চাঙা করে তুলতে ২০০০ সাল থেকে মরিশাসের সরকার অগভীর উপকূল সংরক্ষণে পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করে। দুই দশক ধরে চালানো প্রচেষ্টায় সামুদ্রিক প্রাণী ও উদ্ভিদের পাশাপাশি প্রবালপ্রাচীরও ধীরে ধীরে নতুন জীবন লাভ করতে শুরু করছিল। এখন একটি জাহাজের কারণে এর সবটাই প্রায় ভেস্তে যাওয়ার পথে।

জাপান সরকার পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে ছয় সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল মরিশাসে পাঠিয়েছে এবং সংকট মোকাবিলায় সব রকম সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দেশটিকে দিয়েছে। তবে যা ঘটে গেছে, তা থেকে উত্তরণের সহজ কোনো পথ কারও জানা নেই। অন্যদিকে জাহাজটি ডুবে যেতে থাকায় তেল চুইয়ে পড়া অব্যাহত আছে। মরিশাসের প্রধানমন্ত্রী প্রাভিন্দ জগুনাথ গত সোমবার রাতে সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, দুই হাজার টন অশোধিত তেল জাহাজটিতে তখন পর্যন্ত ছিল। ধারণা করা হচ্ছে যে ডুবে যাওয়ার আগে সেটি ভেঙে পড়লে সেই অবশিষ্ট জ্বালানির সবটা সমুদ্রে মিশে গিয়ে বিপর্যয়ের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেবে।

default-image

টোকিওভিত্তিক জাপানের এই জাহাজ কোম্পানির মালিকানাধীন জাহাজে দুর্ঘটনা এবারই প্রথম নয়। ২০০৬ সালে কোম্পানির একটি ট্যাংকার ভারত মহাসাগরের গভীর সমুদ্রে দুর্ঘটনাকবলিত হলে প্রায় সাড়ে চার হাজার টন জ্বালানি তেল তখন সমুদ্রে গিয়ে মিশেছিল। তবে লোকালয় থেকে অনেক দূরে সেই দুর্ঘটনা ঘটায় তেল পরিষ্কার না করে সেখান থেকে কোম্পানি ক্রুদের উদ্ধার করে নিয়ে আসে। গভীর সমুদ্রের দূষণ মুক্ত করার ভার সেবার ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল প্রকৃতির ওপর। এরপর ২০১৩ সালে ওই কোম্পানির একটি কনটেইনার জাহাজ ভারত মহাসাগরে নিমজ্জিত হয়। তবে তেলবাহী ট্যাংকার সেটা না হওয়ায় ব্যাপক সমুদ্রদূষণ এর থেকে দেখা দেয়নি।

এবারের দুর্ঘটনা অবশ্য আগেরগুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। উপকূলের কাছাকাছি দুর্ঘটনা ঘটায় শুধু সামুদ্রিক প্রাণিকুলের জীবনই সেখানে হুমকির মুখে পড়েনি। একই সঙ্গে সমুদ্রের অপরূপ সৌন্দর্য ও পরিচ্ছন্ন পানির উপস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে যেসব ব্যবসা সেখানে এত দিন ধরে গড়ে উঠেছিল, তার সবটাই এখন বলা যায় অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের মুখে দাঁড়িয়ে। এই দুর্যোগ থেকে মরিশাসকে উদ্ধার করতে কোন পদক্ষেপ জাপান সরকার ও সেই সঙ্গে জাপানের কোম্পানি গ্রহণ করবে, তা এখনো স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন