default-image

জাতীয় পতাকার রঙে নিজেকে রাঙিয়ে ২২ বছর বয়সী ডানা লেবাননের বিপ্লবে অংশ নিয়েছেন। স্বদেশ তাঁকে জাতীয়তা দিতে অস্বীকৃতি জানালেও গর্বের কমতি নেই মেয়েটির।

রাজধানীতে অন্য বিক্ষোভকারীদের মধ্যে দাঁড়িয়ে ডানা বলেন, বৈরুতে লেবাননের নাগরিক এক মায়ের গর্ভে তাঁর জন্ম। সারা জীবন তিনি এ দেশেই কাটিয়েছেন। তবে লেবাননের অন্য সহস্রাধিক নাগরিকের মতো ডানার বাবাও বিদেশি। লেবাননে জাতীয়তা অনুযায়ী সন্তানের নাগরিকত্ব দেওয়ার নিয়ম না থাকায় নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছেন ডানার মতো সন্তানেরা।

বার্তা সংস্থা এএফপিকে ডানা বলেন, ‘আমার জন্মের আগেই আমার মা-বাবার বিচ্ছেদ ঘটে। আমি মায়ের কাছেই বড় হয়েছি। নিজেকে লেবাননের নাগরিক বলেই মনে করি। তবে তারা আমার এ পরিচয়ের স্বীকৃতি দিতে চায় না।’ তিনি বলেন, যে রাজনীতিবিদেরা শতাব্দীর পুরোনো আইনটি বদলাতে চান না, তারা ‘পুরুষতান্ত্রিক’ ও ‘বর্ণবাদী’।

লেবাননে ১৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ব্যাপক বিক্ষোভের মধ্যে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে নাগরিকত্বের অধিকার। অনেক দিন ধরে এই অধিকারের দাবি জানিয়ে আসছেন লেবাননের অসংখ্য বাসিন্দা।

দুর্নীতি ও গোষ্ঠীতন্ত্রের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে দুই সপ্তাহের বিক্ষোভের পর গত মাসে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি সরকারের পতন হয়। তবে বিক্ষোভকারীদের অনেক দাবিই পূরণ হয়নি।

১৭ বছর বয়সী ওমর জানায়, সারা জীবনে কেবল একবার সে সিরিয়ায় গিয়েছিল। কিন্তু বাবার জাতীয়তার জন্য তাকে নানাভাবে ভুগতে হচ্ছে। লেবাননের নাগরিক নয়, এমন অন্য অনেকের মতো তাকেও প্রতিবছর আবাসনের অনুমতি নিতে জেনারেল সিকিউরিটি সদর দপ্তরে যেতে হয়। লেবাননের লাল-সবুজ-সাদা পতাকা ধারণ করে সে বলছিল, ‘তারা আমাদের সঙ্গে বিদেশিদের মতো আচরণ করে। এটি অবমাননাকর।’

গত বছর হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) আইনটির তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলেছে, নাগরিকত্বের ইস্যুতে এই অঞ্চলের অন্য কয়েকটি দেশের চেয়ে লেবানন অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

আলজেরিয়া, মিসর, মরক্কো, তিউনিসিয়া ও ইয়েমেন নারী ও পুরুষ উভয়ের সন্তানকে সমানভাবে নাগরিকত্বের অধিকার দেয়। এইচআরডব্লিউয়ের তথ্য অনুসারে, ইরাক ও মৌরিতানিয়া তাদের দেশে জন্মগ্রহণকারীদের জাতীয়তা দেয়।

বৈরুতের একটি আন্দোলনের সময় অল্প কিছু লোকের মধ্যে দাঁড়িয়ে হাত উঁচিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন সামির। অদক্ষ ও দুর্নীতিগ্রস্ত এসব রাজনীতিবিদের বেশির ভাগই ১৯৯০ সালে দেশটির ১৫ বছরের গৃহযুদ্ধের পর থেকে ক্ষমতায় রয়েছেন।

৩৩ বছর বয়সী সামিরের বাবা ফিলিস্তিনি। তিনি বলেন, ‘নাগরিকত্বের অধিকার আমাদের আদায় করতেই হবে। আমার তিনটি বাচ্চা আছে। ওদের স্কুলে ভর্তি করাতে, সামাজিক নিরাপত্তা দিতে এর কোনো বিকল্প নেই।’

রাজনৈতিক নেতারা ১৯২৫ সালের জাতীয়তা আইন সংশোধন করার প্রচারণা চালালেও লেবানন কর্তৃপক্ষ তা করতে খুব একটা রাজি নয়।

কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, আইনটি সংশোধন করা হলে বিদেশিদের সঙ্গে লেবাননের নাগরিকদের বিয়ের হার বেড়ে যাবে। আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয়েছে, ৪৫ লাখ বাসিন্দার ছোট দেশটিতে ১৫ লাখ সিরিয়ান এবং প্রায় ১ লাখ ৭৪ হাজার ফিলিস্তিনি বাস করছে।

গত বছর, তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিবরান বসিল লেবাননের নাগরিক মায়েদের জাতীয়তা অনুযায়ী সন্তানদের নাগরিকত্বের অনুমতি দেওয়ার জন্য আইনটি সংশোধন করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে বাবা ফিলিস্তিনি বা সিরিয়ান না হলেই কেবল এ আইন কার্যকর করার কথা বলা হয়।

লেবাননের নারী ও শিশুদের নাগরিকত্বের দাবিতে ‘আমার জাতীয়তা, আমার গৌরব’ অভিযানের সমন্বয়ক রান্ডা কাব্বানি বলেছেন, এটি বর্ণবাদ। তিনি বলেন, অভিযানে প্রায় ১০ হাজার পরিবার নাগরিকত্ব নিয়ে সমস্যায় ভুগছে বলে জানা যায়। এদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ সিরিয়ান, ১০ শতাংশ মিসরীয় এবং মাত্র ৭ শতাংশ ফিলিস্তিনি রয়েছে। অন্যরা জর্ডান, ইরাক, আমেরিকা বা ইউরোপের নাগরিক। তাদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ মুসলমান এবং ২০ শতাংশ খ্রিষ্টান।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0