default-image

মিয়ানমারে জান্তাবিরোধী বিক্ষোভে সহিংসতা ও কয়েক শ বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এই নিন্দা জানায়। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়।

দুই দিন ধরে চেষ্টার পর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমারের ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে সর্বসম্মতভাবে একটি বিবৃতি দিতে সক্ষম হলো। তবে চীন ও রাশিয়ার কারণে এই বিবৃতির ভাষা আরও কঠোর করা সম্ভব হয়নি।

মিয়ানমার ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদ থেকে এই বিবৃতি দেওয়ার উদ্যোক্তা যুক্তরাজ্য। বিবৃতি আসার আগে মিয়ানমারে সহিংসতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে দেশটির পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য যুক্তরাজ্য নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছিল।

নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতিতে বলা হয়, মিয়ানমারে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির ঘটনায় পরিষদের সদস্যরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং নারী-শিশুসহ কয়েক শ বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় নিরাপত্তা পরিষদ তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতির খসড়া হাতে পেয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। এতে দেখা যায়, পশ্চিমা দেশগুলো মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য পদক্ষেপ (নিষেধাজ্ঞা) নেওয়ার বিষয়টি বিবৃতিতে যুক্ত করতে চেয়েছিল। কিন্তু মিয়ানমারের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন বিবৃতিতে বিষয়টি যুক্ত করার বিরোধিতা করে তা আটকে দেয় বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।

নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতিতে নমনীয় ভাষা ব্যবহারের পক্ষে অবস্থান নেয় চীন। এ কারণে প্রকাশিত বিবৃতিতে শত শত বেসামরিক মানুষ ‘হত্যার’ পরিবর্তে ‘মৃত্যু’ শব্দ ব্যবহার করতে হয়েছে।

কূটনীতিকেরা জানান, মিয়ানমারের পক্ষে রাশিয়াও সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তারা বিবৃতির ভাষা নিয়ে একাধিকবার আপত্তি জানায়। আটকে দেয়। মিয়ানমারে বিক্ষোভের ঘটনায় দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মৃত্যুর বিষয়ে নিন্দা জানাতে চেয়েছিল মস্কো।

দীর্ঘ সময় ধরে সমঝোতার পর হলেও নিরাপত্তা পরিষদ থেকে মিয়ানমারের বিষয়ে যে একটা সর্বসম্মত বিবৃতি এসেছে, সেটিকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কূটনীতিক এমনটাই বলেছেন।

মিয়ানমারে গত ফেব্রুয়ারিতে সেনা অভ্যুত্থানের পর এখন পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদ থেকে তিনটি সর্বসম্মত বিবৃতি এসেছে। তবে প্রতিবারই বিবৃতির ভাষা নমনীয় করতে চীন ভূমিকা রাখে। মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থান হওয়ার বিষয়টিকেই স্বীকার করে না চীন।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওপর নিরাপত্তা পরিষদের সবশেষ অবস্থানের প্রভাব খুবই সীমিত বলে উল্লেখ করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

বিজ্ঞাপন
default-image

মিয়ানমারে সহিংসতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে দেশটির পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য গত বুধবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ জরুরি বৈঠক করে।

নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত ক্রিস্টিন শ্রেনার বার্গেনার বলেন, গত ১ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারের ক্ষমতা দখলকারী সেনাবাহিনী দেশ পরিচালনায় সক্ষম নয়। দেশটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি কেবল খারাপের দিকেই যাবে।

জাতিসংঘের বিশেষ দূত ক্রিস্টিন নিরাপত্তা পরিষদে আরও বলেন, মিয়ানমারে অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর দমনপীড়ন তীব্র হওয়ায় মিয়ানমারে একটি রক্তগঙ্গা আসন্ন হয়ে উঠেছে। এই রক্তগঙ্গা এড়াতে নিরাপত্তা পরিষদকে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

মিয়ানমারের ব্যাপারে সম্মিলিত পদক্ষেপ নিতে গ্রহণযোগ্য সব উপায় বিবেচনা করতে নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানান ক্রিস্টিন। নিরাপত্তা পরিষদকে ক্রিস্টিন বলেন, ‘যা ঠিক, মিয়ানমারের জনগণ যা পাওয়ার যোগ্য, তা করুন। এশিয়ার কেন্দ্রে বহুমাত্রিক বিপর্যয় রোধ করুন।’

মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত ৫৪৩ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। তার মধ্যে ১৪১ জন নিহত হন গত শনিবার। স্থানীয় পর্যবেক্ষক সংস্থা দ্য অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার্স (এএপিপি) এই তথ্য দিয়েছে।

এদিকে, আন্তর্জাতিক দাতব্য সংগঠন সেভ দ্য চিলড্রেন জানিয়েছে, মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অন্তত ৪৩ শিশু নিহত হয়েছে। এ ছাড়া এই সংঘাতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু আহত হয়েছে।

মিয়ানমারে গত ১ ফেব্রুয়ারি রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে দেশটির সেনাবাহিনী। গ্রেপ্তার করা হয় অং সান সু চিসহ তাঁর দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) শীর্ষ নেতাদের। সেনাবাহিনী মিয়ানমারে এক বছরের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করেছে।

মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়নের মুখেও দেশটির গণতন্ত্রপন্থীরা টানা বিক্ষোভ-প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন। বিক্ষোভকারীরা বেসামরিক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর ও গ্রেপ্তার হওয়া নেতাদের মুক্তির দাবি জানিয়ে আসছেন।

মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান ও নৃশংসতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিন্দা-সমালোচনার ঝড় বইছে। মিয়ানমারের জান্তার ওপর নিষেধাজ্ঞাসহ নানাভাবে চাপ বাড়িয়ে চলছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন