নিষেধাজ্ঞার ঘটনায় রাশিয়াও হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। ইতিমধ্যে জাপানকে বৈরী রাষ্ট্রের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে দেশটি। এর ফলে রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি কিনতে হলে মূল্য এখন থেকে রুশ মুদ্রা রুবলে পরিশোধ করতে হবে। এ বিষয়ে জাপানের পক্ষ থেকে কড়া প্রতিবাদ এলেও রুবলে মূল্য পরিশোধ করা থেকে টোকিও বিরত থাকবে কি না, সেই বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

জাপানের নেওয়া এসব পদক্ষেপে ভূখণ্ড বিরোধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা আলোচনা স্থগিত করে দেয় রাশিয়া। তারা ঘোষণা দেয়, জাপানের উত্তরের চারটি দ্বীপের মালিকানা নিয়ে টোকিওর সঙ্গে আর কোনো আলোচনা চালাতে মস্কো রাজি নয়। এর ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দুই দেশের মধ্যে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর নিয়ে চলা অচলাবস্থা এখন নিশ্চিতভাবে আরও দীর্ঘ হবে।

তড়িঘড়ি নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিয়ে নিজেই বিপাকে পড়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত জাপানের একেবারে কম নয়। প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা শুরু থেকেই একের পর এক নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিয়েই কেবল বসে থাকেননি। একই সঙ্গে এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেন নিষেধাজ্ঞায় যোগ দেয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও নিজের কাঁধে নিয়েছেন। সেই লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্য নিয়ে গত মাসে তিনি গিয়েছিলেন ভারত ও কম্বোডিয়া সফরে।

কিন্তু ওই সফরে তেমন কোনো অর্জন হয়নি। তাই বলে এখনই হাল ছেড়ে দিচ্ছেন না ফুমিও কিশিদা। আগামী মাসের শুরুতে মধ্য এশিয়ার কয়েকটি দেশ সফর করে একই বার্তা সেসব দেশেও পৌঁছে দেবেন তিনি। তবে ওই সফরে কোনো সাফল্য আসবে কি না, তা নিয়ে জাপানের অনেকেই নিশ্চিত নন।

default-image

একের পর এক নিষেধাজ্ঞায় রাশিয়ার অর্থনীতি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। হামলার দুই মাস পার হওয়ার পর এখন অবশ্য দেখা যাচ্ছে, ক্ষতির হিসাব জাপানের বেলায় কোনোভাবেই কম নয়। জাপানের জ্বালানি অনেকাংশে আমদানিনির্ভর। দেশটির জ্বালানির প্রায় ৮ শতাংশ আসছে রাশিয়া থেকে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় রুশ জ্বালানির বিকল্প বাজার এখনো তৈরি হয়নি।

ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে জাপান বলেছিল, রাশিয়ার সঙ্গে পণ্য ও অর্থের সব রকম লেনদেন বন্ধ করে দেবে তারা। রাশিয়া থেকে আমদানি করা পণ্যের তালিকার শীর্ষে তেল, গ্যাস ও কয়লা। রাশিয়া থেকে আমদানি করা শস্যের পরিমাণও একেবারে কম নয়। এসব আমদানি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে জাপানের অর্থনীতির বেশ কিছু খাতের বিপাকে পড়ে যাওয়া। বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ার পর থেকে ক্রমাগত নিষেধাজ্ঞা কমানো কিংবা নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের সময়সীমা পেছানোর ঘোষণার জন্য ইদানীং জাপানে প্রচারণা চলছে। ইতিমধ্যে রাশিয়া থেকে কয়লা আমদানি আপাতত বন্ধ না করার ঘোষণা দিয়েছে টোকিও।

জাপানি অর্থায়নে শুরু হওয়া শাখালিন-২ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এলএনজি প্রকল্প থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল টোকিও। ওই ঘোষণা প্রচার হওয়ার ঠিক পরপর চীনসহ আরও কিছু দেশ প্রকল্পটিতে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। এরপর জাপান এখন বলছে, শাখালিন-২ প্রকল্প থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেবে না তারা। অর্থাৎ রাশিয়ার সঙ্গে আর্থিক লেনদেন এ ক্ষেত্রে আগের মতোই চলবে।

এর কারণ হিসেবে অবশ্য যুক্তি উপস্থাপন করেছেন জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী কোইচি হাগিউদা। তিনি বলেছেন, তৃতীয় কোনো দেশ শাখালিন প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার অর্থ হলো পশ্চিমের নিষেধাজ্ঞাকে দুর্বল করে দেওয়া। আর সেটি হলে আর্থিক দিক থেকে রাশিয়া লাভবান হবে। রাশিয়া যেন সে রকম কোনো লাভের গুড়ের ভাগ পেতে না পারে, তা নিশ্চিত করে নিতে প্রকল্প থেকে সরে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে জাপানকে। তবে রাশিয়ার সঙ্গে আর্থিক লেনদেন কীভাবে চলবে, সেই বিষয়ে মন্ত্রী কিছুই বলেননি।

গত সপ্তাহে জাপান ও রাশিয়া স্যামন ও ট্রাউট মাছের সরবরাহ নিয়ে নতুন একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ২০২২ সালে জাপানের নিজস্ব এলাকায় নির্ধারিত কোটার এসব মাছ ধরার জন্য রাশিয়াকে প্রায় ৫০ কোটি ইয়েন পরিশোধ করতে সম্মত হয়েছে টোকিও। স্যামন ও ট্রাউট মাছ জাপানিদের খুবই পছন্দের। তাই এসব মাছের চালান বিঘ্নিত হওয়া দেখতে নারাজ টোকিও।

জাপানের একান্ত নিজস্ব এলাকায় ধরা এসব মাছের জন্য রাশিয়াকে কেন মূল্য পরিশোধ করতে হবে, তা নিয়ে অনেকের মনে হয়তো প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। জাতিসংঘের সমুদ্র আইন অনুযায়ী, এসব মাছের ডিম পাড়ার প্রক্রিয়া যেখানে শুরু হয়, সেই দেশই মাছের মালিক। স্যামন ও ট্রাউট পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে রাশিয়ার সমুদ্রসীমায় জন্ম নেয়। সেখান থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অন্য কোনো দেশে ওই মাছ ধরা হলে এর জন্য উৎসের দেশকে মূল্য পরিশোধ করতে হয়। জাপান ও রাশিয়া—উভয়েই সমুদ্র আইন চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ। এর ফলে জাপানের উত্তরের দ্বীপ হোক্কাইডোর অদূরের সমুদ্রে এসব মাছ ধরা হলেও রাশিয়া আইনগতভাবে এ মাছের মালিক। এ কারণে নিজের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা জাপানকে এড়িয়ে যেতে হয়েছে।

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন