default-image

ভারত মহাসাগর সাক্ষী—আপাদমস্তক অহিংস প্রতিবাদের এক বিশুদ্ধ সুনামি ছিল কলম্বোর ৯ জুলাই। কিন্তু এই গণ–অভ্যুত্থান কোনো বিপ্লবের জন্ম দেয়নি। তার জন্য শ্রীলঙ্কার নাগরিকেরা কোনো বিষণ্নতায়ও ভুগছে না। তারা ডিম ভেঙে দিয়েছে—কিন্তু অমলেট ভেজে নেওয়ার মতো কোনো সক্রিয় হাত নেই।

অহিংসার মহাকাব্য গড়ে ঘরে ফিরছে মানুষ

প্রায় ছয় মাস ধরে বিশ্বজুড়ে প্রচারমাধ্যম শ্রীলঙ্কার সংকট নিয়ে লিখেছে। কিন্তু সেসব প্রতিবেদন যা বুঝতে পারেনি—তীব্র সংকটের ভেতর দিয়েই লঙ্কায় মানসিকভাবে প্রচণ্ড শক্তিশালী একদল তরুণ–তরুণীর জন্ম হয়েছে। তাদের হাতেই ৯ জুলাইয়ের জন্ম।

কিন্তু এখন প্রশ্ন উঠেছে, ‘প্রাসাদ দখল’-এর পর কী হবে? জনতা এখন কী করবে? আর রাজনীতিবিদদের পরবর্তী ভূমিকা কী হবে? এসব প্রশ্নের সবচেয়ে নির্মম উত্তর হলো, শ্রীলঙ্কার এই গণ-অভ্যুত্থানের তাৎক্ষণিক কোনো ইতিবাচক প্রাপ্তি নেই। দেশটির রাজনৈতিক কাঠামো ও রাজনৈতিক দলগুলো জনতার আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে নতুন সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের হিম্মত রাখে না এ মুহূর্তে। আবার এই জনতাকে দুমড়ে-মুচড়ে ট্যাংকের শাসন কায়েমও শ্রীলঙ্কার কুলীনদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

রাজনৈতিক দলগুলো এখন কী করবে—সেটা দেখার জন্য জনতার কৌতূহল আছে, তবে তারা বড় কোনো আশা নিয়ে বসে নেই। তারা হতাশও নয়, দেশকে লজ্জার হাত থেকে বাঁচাতে পেরে গৌরবান্বিত।

প্রভাবশালী রাজাপক্ষে পরিবারের অন্যায়, দুর্নীতি ও ঔদ্ধত্যে শ্রীলঙ্কা কেবল অর্থনৈতিকভাবে ডুবেনি, তার নাগরিকদের আত্মমর্যাদা বোধ নিয়ে বহির্বিশ্বেও প্রশ্ন উঠেছিল। সেই কলঙ্ক থেকে লঙ্কানরা নিজেদের মুক্ত করতে পেরে তৃপ্ত। ৯ জুলাই তারা দেশের মর্যাদা বোধ উদ্ধারের শপথ নিয়ে বেরিয়েছিল—‘অ্যাসাইনমেন্ট’ শেষ করে তারা জাতীয় পতাকা উড়িয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছে। কোনো রাজনৈতিক দলের অফিসের সামনে জড়ো হয়নি।

এটা ছিল একটা সমাজের পুনর্জন্মের মুহূর্ত। মানুষ মনে করছে তারা পরের প্রজন্মের কাছে মাথা নিচু করে থাকার গ্লানি থেকে নিজেদের উদ্ধার করতে পেরেছে। এটা জাতীয় ইতিহাসের কাছে দায়মুক্ত থাকার মতো। ৯ জুলাই এই অর্থে শ্রীলঙ্কার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক উল্লম্ফন। সেদিন হিন্দু তামিল, মুসলমান তামিল, বৌদ্ধ সিংহলিরা বাদশাহি প্রাসাদ দখলের সময় কেউ কারও ধর্ম-বর্ণ নিয়ে আগ্রহী ছিল না। তারা দেখেছে কালো আর বাদামি বেশ কাছাকাছি রং। কিন্তু সেটা আরব সাগরের সবুজের চেয়ে শক্তিশালী হতে পারে!

মূলত এভাবে অহিংস বিশ্বাসের জোরে দেশটির স্বাধীনতার ৭৪ বছর পর একটা নতুন আকাঙ্ক্ষার গোড়াপত্তন করেই আপাতত বিজয়ীর সুখ পাচ্ছে লঙ্কাবাসী। যে দেশে অন্তত দুই দশক কেটেছে গৃহযুদ্ধের হানাহানিতে, সেখানে ‘অহিংসা’র এত মহিমান্বিত উত্থান সমাজবিজ্ঞানের তুমুল এক বিস্ময়ই বটে।

তবে শ্রীলঙ্কা এ–ও বুঝতে পারছে, ৯ জুলাই প্রাসাদপন্থী রাজনীতির গোড়া উপড়ে ফেলা যায়নি—সে রকম কোনো কর্মসূচিও ছিল না। কিন্তু সেটা চায় নাগরিকেরা। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাঁটার সময়, আড্ডায়, চিৎকারে তারা ‘ব্যবস্থা-বদল’-এর কথাও তুলছে, বলছে। কিন্তু মানুষদের চাওয়ার সঙ্গে শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়ার ব্যবধান দুস্তর। শ্রীলঙ্কা বিপ্লব আহ্বান করছে, কিন্তু দেশটিতে বিপ্লবী অভ্যুত্থানের কোনো রাজনৈতিক শক্তি নেই। মিসরও এভাবে তাহরির স্কয়ারকে কিছু দিতে পারেনি।

তবে এরপরও রাজনৈতিক সরকার থাকবে শ্রীলঙ্কায়। কায়রো থেকে কলম্বো এভাবেই আপাতত এক ধাপ এগিয়ে আছে। প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ দখল অধ্যায়কে অহিংস রেখে মানুষ ট্যাংকবাদীদের রাস্তায় নামতে দেয়নি। ষড়যন্ত্রকারীরা প্রধানমন্ত্রীর বাড়িতে আগুন দিয়ে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকে কলঙ্কিত করে সামরিক বাহিনীকে উসকে দেওয়ার চেষ্টা করলেও প্রকল্পটি সফল হয়নি।

তবে রাজাপক্ষেরা না থাকলেও তাঁদের ‘ক্যাডার’রা বিভিন্ন স্তরে রয়েছে। তারা প্রতিমুহূর্তে চলমান আন্দোলনকে সাংস্কৃতিকভাবে স্যাবোটাজ করছে। তবে প্রায় ছয় মাসের গণ–আন্দোলনে শ্রীলঙ্কার মধ্যবিত্তও রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে যে মধ্যবিত্ত বিগত বছরগুলোতে নিজেদের এবং সন্তানদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে পছন্দ করত। গণ–আন্দোলনের ব্যাকরণে রাজনীতিবিদের মাঝে যথেষ্ট বিস্ময়েরও জন্ম দিয়ে ফেলেছে তারা গত কয় দিনে।

মূলত নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে পরিস্থিতি

রাজনীতি-অর্থনীতির কুলীনদের অক্সিজেন হিসেবে শ্রীলঙ্কায় এত দিন ছিল রাজাপক্ষে পরিবার। এ মুহূর্তে কুলীন সমাজের অপর অংশ, সামরিক আমলাতন্ত্র এবং আন্তর্জাতিক শক্তিসমূহ পরবর্তী সরকার গড়ার চেষ্টায় নেমেছে। দূতাবাসগুলোতে বেশ ব্যস্ততা আছে। রাজাপক্ষেদের বাদ দিয়ে বাকি সবাইকে আপসের একটা পাটাতনে আনার কসরত চলছে। নতুন একটা সরকার হবে শিগগির। সেখানে জনতা বিমুক্তি পেরামুনা (জেভিপি) ও ‘সঙ্গী জন বালাওয়েগা’ নামের দুই প্রধান বিরোধী দল বড় ভূমিকায় থাকবে।

কে প্রেসিডেন্ট হবেন আর কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, সেটা এ মুহূর্তে খবর হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবতা হলো, শ্রীলঙ্কাকে শিগগির নতুন নির্বাচনে যেতে হবে। যে অভ্যুত্থান বিপ্লব উপহার দিতে পারছে না—তাকে অন্তত একটা নির্বাচন করে জনগণকে সন্তুষ্ট রাখতেই হবে। সম্ভাব্য সেই নির্বাচনে উগ্র জাতীয়তাবাদের বিপরীতে সংস্কারপন্থী শক্তিগুলো ভালো করবে—এই প্রত্যাশাটুকুই কেবল চলতি গণ–অভ্যুত্থানের প্রাপ্তি।

বর্তমান পরিস্থিতি আমূল পাল্টে না গেলে জেভিপির অনূঢ়া কুমার দেশনায়েকে এবং ‘সঙ্গী জন বালাওয়েগা’ দলের সাজিথ প্রেমাদাসার হাতে থাকবে নির্বাচন–পরবর্তী পরিস্থিতি। এই দুই শক্তির মাঝে জেভিপিতে রয়েছে পুরোনো বামপন্থী ঐতিহ্যের সঙ্গে সিংহলি জাতীয়তাবাদের মিশেল। আর প্রেমাদাসা চাইছেন সিংহলি মধ্যপন্থীদের সঙ্গে তামিল মধ্যপন্থীদের সমন্বয়। শ্রীলঙ্কার পরবর্তী রাজনৈতিক লড়াই হবে এই দুই ধারার। এদের কারও সঙ্গে ফিল্ড মার্শাল শরথ ফনসেকার জোট হলে সেটা অন্যদের জন্য বিপর্যয়কর হবে। তবে এ সবকিছু দূরের হিসাব-নিকাশ। এখন কিছুদিন বরং অস্থিরতার কাল যাবে। এই সময়টুকুতে অনিবার্য খলনায়কের ভূমিকায় থাকবে আইএমএফ।

গোতাবায়াকে প্রাসাদ থেকে তাড়ানোর পর জনগণের রাজনৈতিক ক্ষুধার অনেকখানি তৃপ্ত। বাকি অতৃপ্তিটুকু নিয়ে তারা এখন ডলার, গ্যাস ও বিদ্যুৎ পেলেই সন্তুষ্ট হবে। রান্নাঘর আর রাজপথ পর্যন্ত মূলত এখন অসহনীয় অপেক্ষা চলছে আইএমএফের।

ব্যক্তি ফনসেকার উত্থান

শ্রীলঙ্কায় ‘৯ জুলাই’ তৈরি হয়েছিল মূলত যে জন–আন্দোলনের ভেতর দিয়ে, তার বয়স প্রায় ছয় মাস। এই সময়ে লঙ্কানরা নতুন রাজনৈতিক উত্থানের জন্য উন্মুখ হয়ে থেকেছে। কিন্তু পুরোনো শক্তি-সমীকরণের ভেতর থেকে সে রকম কিছু ঘটেনি। দল হিসেবে জেভিপি কিছুটা এগোলেও সরকার গড়ার মতো সাহস ও জোর তাদের এখনো হয়নি। এর মাঝে লক্ষণীয়ভাবে এগোলেন কেবল ফনসেকা। তামিলদের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী সাবেক সেনাপ্রধান ফনসেকা এ মুহূর্তে দারুণ জনপ্রিয়তা উপভোগ করছেন। তামিলবিরোধী গৃহযুদ্ধে গোতাবায়া ও মাহিন্দা রাজাপক্ষেদের মূল সাহস ছিলেন তিনি। ফলে নিশ্চিতভাবে তাঁকে নিয়ে তামিলদের রয়েছে গভীরতম ক্ষত। কিন্তু রাজনীতিতে শেষ কথা বলে বোধ হয় কিছু নেই। ফনসেকা নিজে সেটাই দেখালেন রাজাপক্ষেদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে।

গৃহযুদ্ধকালে গোতাবায়া-মাহিন্দা-ফনসেকা ছিল সিংহলি জিঘাংসার অপর নাম। কিন্তু এবার রাজাপক্ষেদের বিরুদ্ধে ফনসেকাকে জনগণ পাশে পেয়েছে আপসহীনভাবে। তামিলদের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পারলে আগামী যেকোনো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাঁকে মোকাবিলা করা অন্য যেকোনো সিংহলির জন্য কঠিন হবে। অন্যদিকে তাঁর মতো শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের সূত্রে সিংহলিদের সঙ্গে তামিলদের সামাজিক মৈত্রী অপ্রতিরোধ্য এক শ্রীলঙ্কার নবজন্ম দিতে পারে—যাদের কাছে দেশ বাঁচাতে কয়েক বিলিয়ন ডলার জোগাড় করা কোনো বড় ম্যাচ হবে না।

কিন্তু আপাতত এসবই দূর-কল্পনা। ভূরাজনীতি এই ছোট দ্বীপদেশটিকে কতটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে দেবে, সে–ও বিবেচনা রাখার মতো বিষয়।

ঠান্ডাযুদ্ধের নগ্ন থাবার নিচে ছোট্ট দেশটি

কয়েক দিন ধরে শ্রীলঙ্কাজুড়ে উৎসবের আবহ বিরাজ করছে। বিশেষ করে কলম্বোতে। এ যেন জাতীয় কোনো কলঙ্কমুক্তির উদ্‌যাপন। কিন্তু এ–ও সত্য, শ্রীলঙ্কার এখন যা দরকার, তার কোনো প্রতিদান দিতে পারছে না ৯ জুলাইয়ের অভ্যুত্থান। প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার বিদেশি দেনার মধ্যে অন্তত ২৫ বিলিয়ন আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশটিকে জোগাড় করতে হবে। অর্থনীতিকে আবার সচল করতে প্রতিদিন যে জ্বালানি দরকার, সেটাও তাদের হাতে নেই। স্কুল–কলেজ, অফিস–আদালত প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আছে। হাসপাতালে ওষুধ নেই।

এসবের জোগান পেতে শ্রীলঙ্কার পাশে দাঁড়াতে পারে প্রধানত আমেরিকা-ইউরোপ, চীন ও ভারত। কিন্তু এরা দেশটিতে ত্রিমুখী এক নীরব মল্লযুদ্ধে লেপটে আছে। এই তিন শক্তিই সম্ভাব্য যেকোনো সরকারের পূর্ণ অনুগত দেখতে ইচ্ছুক। সাহায্য–সহযোগিতার বড় এক শর্ত হয়ে উঠেছে সেটা। বৈশ্বিক ঠান্ডাযুদ্ধ যে খুবই নির্মম ও নগ্ন এক চেহারায় হাজির হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায়, তার বড় নজির শ্রীলঙ্কায় আন্তর্জাতিক শক্তিসমূহের টানাপোড়েন।

তবে দেশটির মানুষের চীন-ভারত নিয়ে দুই ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। যদিও প্রধান প্রধান রাজনীতিকেরা এই দুই দেশের রাষ্ট্রদূতদের চাওয়াকে বেশ সমীহ করে চলেন। অন্যদিকে আইএমএফকে সঙ্গে পেতে কলম্বোর নতুন সরকারকে ওয়াশিংটনের প্রবল সমর্থনও দরকার। তাহলেই কেবল প্রয়োজনীয় ডলার একসঙ্গে হাতে পেতে পারেন পরবর্তী অর্থমন্ত্রী।

আগামী দু-তিন সপ্তাহ শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক ঘটনাবলি স্পষ্ট করে দেবে দেশটির সামরিক আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক কুলীনরা ভূরাজনৈতিক উপরিউক্ত ছকের মাঝে কীভাবে নিজেদের ভবিষ্যৎকে স্থাপন করবে। কিন্তু রাজনৈতিক অর্থনীতিকে আইসিইউ থেকে বের করে আনতে হলে লঙ্কাকে আগে ভূরাজনৈতিক পছন্দ ঠিক করতেই হবে। ঐতিহাসিক এই দুর্ভাগ্য সে আর এড়াতে পারছে না।

৯ জুলাইয়ের ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান এখানে এসে অসহায়। কিন্তু এ–ও সত্য, প্রতিটি জন-অভ্যুত্থান পরিবর্তনের বীজ ছড়িয়ে দেয়। উর্বর মাটি আর বৃষ্টি পেলে কিছু বীজ প্রাণ জাগিয়ে রাখে। শ্রীলঙ্কার তরুণদের মাঝে এবার যে জাতীয় ঐক্য দেখা গেল, সেটা ভবিষ্যতের যেকোনো উদ্ধত-রাজনীতিবিদের জন্য লাল কার্ডের মতো ঝুলে থাকবে। এমনকি শ্রীলঙ্কার সীমানা ছাড়িয়ে আশপাশের অঞ্চলেও ৯ জুলাইয়ের সাংস্কৃতিক ছাপ পড়তে পারে। ঔদ্ধত্যের হাতে জিম্মি নাগরিক আত্মমর্যাদা রক্ষায় মানুষ অনন্তকাল রাজনৈতিক নেতৃত্বের অপেক্ষায় না–ও বসে থাকতে পারে।

আলতাফ পারভেজ: শ্রীলঙ্কার তামিল-ইলম (ঐতিহ্য, ২০১৭) গ্রন্থের লেখক।

এশিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন