default-image

করোনাভাইরাস সম্পর্কে প্রথম সতর্কবার্তা দেওয়া চীনা চিকিৎসক লি ওয়েনলিয়াংয়ের মৃত্যুতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে চীনের সাধারণ মানুষ। বলা হচ্ছে, লি ওয়েনলিয়াংয়ের মৃত্যুর কারণও ওই করোনাভাইরাসই। তাঁর মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর থেকেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করে চীনের সাধারণ মানুষ। আজ শুক্রবার বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে এই কথা জানানো হয়।

করোনাভাইরাসের উৎপত্তিস্থল চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান। উহান সেন্ট্রাল হসপিটালে চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত ছিলেন লি। এই হাসপাতালেই পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হন তিনি।

গত ডিসেম্বরে লি ওয়েনলিয়াং তাঁর সহকর্মীদের একটি সতর্কবার্তা পাঠান, যেখানে তিনি সার্সের (প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের একটি প্রজাতি) মতো একটি ভাইরাসের কথা জানান। কিন্তু এ জন্য উল্টো তাঁকে হেনস্তার শিকার হতে হয়। চীনের জননিরাপত্তা ব্যুরো তাঁকে ডেকে ‘গুজব না ছড়ানোর’ জন্য সতর্ক করে এবং একটি চিঠিতে সই করতে বাধ্য করে, যেখানে তিনি মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ করা হয়।

লি ওয়েনলিয়াংয়ের দেওয়া সতর্কবার্তা যে গুজব ছিল না, তা তো এখন অসংখ্য আক্রান্ত ব্যক্তি ও মৃত্যুর ঘটনাই সাক্ষ্য দিচ্ছে। এ অবস্থায় চীনের সরকারের বিরুদ্ধে এত বড় একটি ঝুঁকিকে গুরুত্ব না দেওয়া এবং শুরুতে এটিকে গোপন রাখার চেষ্টা করার অভিযোগ উঠেছে। খোদ দেশটির নাগরিকেরাই সরকারের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ তুলছেন। এত দিন বিষয়টি চাপা থাকলেও লি ওয়েনলিয়াংয়ের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তা ভাষা পেতে শুরু করেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে চীনের দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরুর কথা জানিয়েছে।

এ বিষয়ে লির বাবা লি শুইং বিবিসিকে বলেন, ‘তাঁর কথা কি এখন বাস্তবে পরিণত হয়নি? আমার ছেলে ছিল অসাধারণ।’

চীনের সরকার এরই মধ্যে অবশ্য স্বীকার করে নিয়েছে যে, ভাইরাসটির সংক্রমণ ঠেকাতে ব্যবস্থা গ্রহণে ঘাটতি ছিল।

কিন্তু সাধারণ মানুষ শুধু স্বীকারোক্তিতে শান্ত হবে কেন। কারণ, এরই মধ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে শুধু চীনেই মারা গেছে ৬৩৬ জন। আর আক্রান্তের সংখ্যা ৩১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে দীর্ঘদিন চীনে যা দেখা যায়নি, সেই বিক্ষোভই দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সাধারণ মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ উগরে দিচ্ছে। এরই মধ্যে চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ওয়েইবুতে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়েছে যে দুটি হ্যাশট্যাগ, তার মূল কথাই হচ্ছে ‘সরকারের উচিত লিওয়েনলিংয়ের কাছে ক্ষমা চাওয়া’ এবং ‘বাক্‌স্বাধীনতা চাই’। তবে চীন সরকারও বসে নেই। এই হ্যাশট্যাগ মুছে ফেলার কাজটি তারা দ্রুততার সঙ্গে করছে।

বিবিসি অনলাইন জানাচ্ছে, শুক্রবার ওয়েইবুতে ঢুকে দেখা যায়, ওই দুটি হ্যাশট্যাগের অধিকাংশই মুছে ফেলা হয়েছে। মাত্র কিছুসংখ্যক টিকে আছে। লাখ লাখ ব্যবহারকারীর ওয়াল থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে সেগুলো।

ওয়েইবুতে প্রকাশিত এক পোস্টে লেখা হয়েছে, ‘এটি একজন হুইসেলব্লোয়ারের মৃত্যু নয়, এটি এক নায়কের মৃত্যু।’

অনেকের পোস্টেই লেখা হয়েছে, ‘তুমি কি বুঝতে পারছ? সামলাতে পারবে?’ এই বাক্যের উল্লেখ সরাসরি সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়। কারণ, প্রথম সতর্কবার্তা দেওয়ার পর লি ওয়েনলিয়াংকে ‘অস্থিরতা’ ছড়ানোর অভিযোগে অভিযুক্ত করে এমন কথাই বলা হয়েছিল। সই দিতে বাধ্য করা হয়েছিল নিরাপত্তা বাহিনীর লেখা চিঠিতে।

উল্লেখ্য, গত ৩০ ডিসেম্বর লি একটি চ্যাট গ্রুপে বার্তা দিয়ে তাঁর সহকর্মী চিকিৎসকদের ভাইরাসটির ব্যাপারে সতর্ক করেন। ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে তিনি তাঁর সহকর্মী চিকিৎসকদের সুরক্ষামূলক পোশাক পরার পরামর্শ দেন। এর চার দিন পর লিকে তলব করে জননিরাপত্তা ব্যুরো। ১০ জানুয়ারি লির কাশি শুরু হয়। পরদিন আসে জ্বর। দু দিন পর তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। ৩০ জানুয়ারি চিকিৎসক লির করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার বিষয়টি শনাক্ত হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় লি চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ওয়েইবুতে তাঁর গল্প শেয়ার করেছিলেন। পোস্টে চিকিৎসাধীন অবস্থার একটি ছবিও দিয়েছিলেন। চীনের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় লি মারা যান।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0