'নিষেধাজ্ঞা ইরানকে আরও ঐক্যবদ্ধ করেছে'

বিজ্ঞাপন
default-image

‘আমাদের জাতীয় ঐক্য রয়েছে। পরিস্থিতি যত কঠিন হবে, এ ঐক্য তত বাড়বে।’ কথাটি ইরানি নাগরিক হাদির। আলবোরজ পার্বত্য এলাকায় ছোট একটি চা দোকান চালানো হাদির দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বিরোধে এটিই ইরানের বাস্তবতা।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা দিন দিন বাড়ছে। দুই দেশের সরকারে কাছ থেকে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আসছে। এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে ইরানের জনগণ কী ভাবছে তা সরেজমিন দেখতে সম্প্রতি ইরানে গিয়েছিলেন বিবিসি সাংবাদিক মার্টিন পেশেন্স। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর আরও দুই সহকর্মী নিক মিলার্ড ও কারা সুইফট। তাঁরা তেহরান, পবিত্র নগরী কোমসহ ইরানের বিভিন্ন এলাকার মানুষদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করেন। এ সময় ইরান সরকারের একজন প্রতিনিধি সব সময় তাঁদের সঙ্গে ছিলেন।

বিবিসি সাংবাদিকেরা সফরের সময় ইরানের আলবোরজ পার্বত্য অঞ্চল ঘুরে দেখেন। কথা বলেন সেখানকার অনেক মানুষের সঙ্গে। বিবিসি জানায়, গ্রীষ্মের এ গরমের মধ্যেও অনেক ছেলে-বুড়ো পার্বত্য অঞ্চলে ঘুরতে বের হন। তেহরানের কাছের এই পার্বত্য অঞ্চল নির্মল পরিবেশের কারণে অভ্যন্তরীণ পর্যটনের অন্যতম মূল আকর্ষণ। কিন্তু সেখানকার নির্মল পরিবেশও যুক্তরাষ্ট্র আরোপিত নিষেধাজ্ঞার হাত থেকে মুক্তি দেয় না। এর প্রমাণ পাওয়া গেল এক পর্বতারোহীর কথায়। কেমন কাটছে—এমন প্রশ্নের উত্তরে তাঁর ঝটপট উত্তর, ‘কে ভুক্তভোগী নয়?’ নিজের সঙ্গে থাকা একটি সরঞ্জাম দেখিয়ে তিনি বলেন, এক বছর আগের চেয়ে এর দাম এখন চারগুণ।

২০১৫ সালে হওয়া ছয় জাতি পরমাণু চুক্তি থেকে একতরফাভাবে বেরিয়ে আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়ার কারণ হিসেবে ট্রাম্প বলেছিলেন, আগের চুক্তিটি ইরানের পক্ষে যায়, যা তেহরানকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে ও মধ্যপ্রাচ্যে অপকর্ম চালিয়ে যাওয়ার পরোক্ষ স্বাধীনতা দেয়। ট্রাম্প ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি নেন, যাতে দেশটি আলোচনার টেবিলে ফিরে আসে। এই উত্তেজনা যুদ্ধে রূপান্তর হতে পারে বলে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করলেও যুক্তরাষ্ট্র তার পথ থেকে ফিরে আসেনি। এদিকে ইরানও ক্রমে শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করেছে। কারণ দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রতারিত হয়েছে বলে মনে করছে। একই সঙ্গে ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে বলে মনে করছে ইরান।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের গৃহীত পদক্ষেপ ইরানে কট্টরপন্থীদের শক্তিশালী করছে। এমনিতেই ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যকে বিশ্বাস করে না। ১৯৫৩ সালে ইরানে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের পতন ঘটিয়ে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানোর দায় এখনো তারা এ দুই দেশকেই দেয়। এর সঙ্গে যখন এবারের ঘটনাটি যুক্ত হয়, তখন অবিশ্বাসের মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। শুধু অবিশ্বাস নয়, যুক্তরাষ্ট্র তথা পশ্চিমা-বিরোধী মনোভাবও দিন দিন বাড়ছে ইরানে।

default-image

আলবোরজ পার্বত্য অঞ্চলের ছোট একটি চা দোকানের মালিক হাদির কথায় এর প্রমাণ পাওয়া যায়। হাদির ভাষ্য, ‘আমাদের অনেক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। কঠিন সময়েও আমরা টিকে থেকেছি। যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে দাঙ্গার সৃষ্টি হবে, যা সরকারকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করবে। কিন্তু সত্য হচ্ছে, আমরা আরও ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। উদারবাদী ও রক্ষণশীলেরা কাছাকাছি আসছে। পরিস্থিতি যত কঠিন হবে আমরা তত ঐক্যবদ্ধ হব।’

তেহরানের দক্ষিণাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র আরোপিত নিষেধাজ্ঞার প্রভাব ভালোভাবে দৃশ্যমান, যেখানে মূলত শ্রমিক শ্রেণির বাস। নিষেধাজ্ঞার আগে থেকেই এই এলাকার বাসিন্দারা বেশ সংকটে ছিলেন। নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। খাবারের দাম আগের চেয়ে দ্বিগুণ হয়েছে। অর্থনীতিতে মন্দার ভাব দেখা দেওয়ায় অনেকে আবার কাজ হারিয়েছে। ফলে তাদের পক্ষে খাবার জোগাড় করাটাই এক বিরাট সংগ্রামে রূপ নিয়েছে।

এই এলাকার বাসিন্দা জোহরেহ ফারজানার আয় দিনে ২ ডলার। তিন সন্তান নিয়ে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয় তাঁকে। তাঁর জিজ্ঞাসা, ‘আমাদের কষ্ট দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প কী পাচ্ছেন, তা আমার বোধগম্য নয়।’

এই মা তাঁর ছোট সন্তানকে দাতব্য সংস্থায় পাঠাচ্ছেন শুধু এ জন্য যে, সে যেন দিনে অন্তত একবেলা ভালো খেতে পায়। কারও কাছে সাহায্য চাওয়াটা তাঁর কাছে অপমানজনক মনে হয়। নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর থেকে এমনকি নিজের জন্য ইনহেলারও কিনতে পারছেন না এ অ্যাজমা রোগী। তারপরও তিনি কৃতজ্ঞ যে, অন্তত কোনো যুদ্ধ হচ্ছে না।

বিবিসি সাংবাদিক মার্টিন পেশেন্স তাঁর প্রতিবেদনে লিখেছেন, দশ দিনের সফরে তিনি এমন কোনো ইরানির দেখা পাননি, যিনি যুদ্ধের আশঙ্কা করছেন। সবাই একবাক্যে এমন আশঙ্কাকে খারিজ করে দিয়েছেন। বিষয়টির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেন শেইখুলইসলাম বলেন, জনগণের এমন বিশ্বাসের কারণ, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইরান—কেউই যুদ্ধ চায় না। যুদ্ধ উভয় পক্ষের স্বার্থবিরোধী।

default-image

হোসেন শেইখুলইসলাম বলেন, ‘অবশ্যই কোনো যুদ্ধ হবে। হ্যাঁ, যে কারও পক্ষে ভুল করা সম্ভব। কিন্তু আমরা যুদ্ধ চাই না। আমার বিশ্বাস ট্রাম্প বুঝতে পেরেছেন যে যুদ্ধ তাঁর পক্ষে যাবে না। কারণ, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অর্থ, মার্কিন সেনাদের মরদেহ—আর তিনি নিশ্চয় ওয়াশিংটন ডিসিতে যুদ্ধে নিহত সেনাদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করতে প্রস্তুত নন।’

তবে ইরানে অস্থিরতার আশঙ্কা একেবারে নেই এমনটিও নয়। অনেক নাগরিকই বেফাঁস এমন কিছু মন্তব্য করেছেন, যা দাঙ্গার আশঙ্কার কথা প্রকাশ করে দেয়। আলবোরজ পার্বত্য এলাকায় এক নারী মার্টিন পেশেন্সকে বলেন, ‘(যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে) যুদ্ধ হওয়াটাই বরং ভালো। এর মাধ্যমে শাসনকাঠামোয় পরিবর্তন আসতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, এর মাধ্যমে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা অন্তত এড়ানো যাবে। গৃহযুদ্ধের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ হওয়াটা ভালো।’

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের শাসকগোষ্ঠী সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচার যেমনই হোক, সত্য হচ্ছে ইরানে বহু রাজনৈতিক মত রয়েছে। দেশটিতে রক্ষণশীলদের পাশাপাশি উদারবাদীরাও রয়েছে। উদারবাদীর সংখ্যাই সম্ভবত বেশি ইরানে। এ ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ একটি বিভাজনও রয়েছে, যাকে কাজে লাগাতে ছক কষছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্টের মনে রাখা জরুরি যে, উদারবাদী কিংবা রক্ষণশীল, যে-ই হোক না কেন যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধের প্রশ্ন সামনে আসে, তখন তাদের সামনে দেশই সবার আগে হাজির হয়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন