বর্তমান পরিস্থিতিতে রাশিয়ার বিষয়ে চীন চুপচাপ থাকলেও ‘মিথ্যা তথ্য ছড়ানো’ ও উত্তেজনা তৈরির জন্য বারবার যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে উত্তেজনা বৃদ্ধির জন্য ওয়াশিংটনকে দায়ী করার পাশাপাশি রাশিয়ার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়ার দাবিও জানানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউক্রেন আগ্রাসনে বেইজিং থেকে কূটনৈতিক সমর্থন পাচ্ছে মস্কো। পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞার মুখে অর্থনৈতিকভাবে চীনা সমর্থন পেতে পারে মস্কো। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মস্কোকে সামরিক সহায়তা দেওয়া থেকে দূরে থাকবে বেইজিং।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে পারে চীন। পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও চীন তেমন প্রভাব পড়তে দেবে না।

যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে চীনের সম্পর্কও উষ্ণ নয়। বেইজিংয়ে শীতকালীন অলিম্পিক কূটনৈতিকভাবে বয়কট করেছে বেশ কয়েকটি দেশ। এর মধ্যে উদ্বোধনীতে ৪ ফেব্রুয়ারি চীন সফরে যান পুতিন। সেখানে চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বসে তিনি ঘোষণা দেন, দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্বের গভীরতায় ‘কোনো সীমা থাকবে না’। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো বলছে, বিশ্বে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় চীন-রাশিয়া কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে।

ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের কারণে নতুন এক পরীক্ষার মুখে পড়েছে চীন। রাশিয়াকে সমর্থন করে তারা যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছে, বাস্তবে তা কতটা কার্যকর করা সম্ভব, তা এখন দেখার বিষয়। বিশেষ করে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার পররাষ্ট্রনীতির কথা বলে বারবার বলে আসছে চীন।

default-image

রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সি ইয়িংহং বলেন, যদিও আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে তারা একটি জোট, জোটে নিজেদের সুসম্পর্ক আগের চেয়ে ছাড়িয়ে গেছে, তবু আনুষ্ঠানিক জোট গঠন থেকে অনেকটা তফাতে আছে তারা। অর্থাৎ একজন আক্রান্ত হলে অপরজন সেনা ও সামরিক সহায়তা পাঠাবে, এমন জোট তারা এখনো হয়নি।’

চীন আগে থেকেই সংলাপের মাধ্যমে ইউক্রেন সংকটের সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আসছে। সিঙ্গাপুরের এস রাজারত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক লি মিংজিয়াং বলেন, তাইওয়ানের সঙ্গে যুদ্ধে চীন যেমন রাশিয়ার কাছ থেকে সামরিক সহায়তা প্রত্যাশা করে না, রাশিয়ার চাওয়াও ঠিক তেমন। ইউক্রেন আগ্রাসনে চীনের কাছে রাশিয়ার কোনো সামরিক সহায়তা প্রত্যাশা নেই।

আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বে যেভাবে মেরুকরণ ঘটেছে, তাতে রাশিয়ার সঙ্গে চীনকেও বিচ্ছিন্ন কিংবা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রাখতে পারে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো।
সি ইয়িংহং, অধ্যাপক

ইউক্রেন সীমান্তে রাশিয়া যখন বিপুলসংখ্যক সেনাসদস্য মোতায়েন করে যাচ্ছিল তখন এর বিরোধিতা করে গত মাসে জাতিসংঘের ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক ডেকেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে সেই বৈঠক ঠেকাতে রাশিয়ার সঙ্গে একমাত্র চীনই ভোট দিয়েছিল, যদিও তা ব্যর্থ হয়েছিল।

২০১৪ সালের তুলনায় দুই দেশের সম্পর্কের আরও অগ্রগতি হয়েছে। তখন ইউক্রেনের ক্রিমিয়া অঞ্চল রাশিয়া নিজের অধিভুক্ত করে নিয়েছিল। অন্যান্য দেশকে এর স্বীকৃতি না দিতে যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা পরিষদে খসড়া প্রস্তাব আনলে চীন ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে পারে চীন। পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও চীন তেমন প্রভাব পড়তে দেবে না।

রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালালে চীন ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব চায়নাসহ চীনের কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেবে।

default-image

গত সোমবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন রুশপন্থী বিদ্রোহীনিয়ন্ত্রিত ইউক্রেনের দুই অঞ্চল দোনেৎস্ক ও লুহানস্ককে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করেন। সেখানে ‘শান্তিরক্ষায়’ সেনা পাঠানোর নির্দেশ দেন তিনি। এরপর উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। পরদিন মঙ্গলবার যুক্তরাজ্য রাশিয়ার পাঁচটি ব্যাংক এবং পুতিন-ঘনিষ্ঠ তিন ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। এর কয়েক ঘণ্টা পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন রাশিয়ার দুটি ব্যাংক এবং পাঁচ ধনকুবেরের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেন। রাশিয়ার ২৭ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞায় পড়ছে। নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসছেন দেশটির ৩৫১ জন এমপিও। জার্মানি রাশিয়া থেকে গ্যাস নেওয়ার জন্য চলমান নর্ড স্ট্রিম ২ গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। কানাডা ও জাপানও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

চলতি মাসের শুরুর দিকে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নেড প্রাইস বলেছিলেন, ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের ঘটনায় মস্কোর ওপর কোনো রপ্তানি–নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে যদি চীন তা অগ্রাহ্য করে, তাহলে চীনা কোম্পানিগুলোকে পরিণতি ভোগ করতে হবে।

default-image

একই সুরে কথা বলেছেন অধ্যাপক সি ইয়িংহং–ও। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বে যেভাবে মেরুকরণ ঘটেছে, তাতে রাশিয়ার সঙ্গে চীনকেও বিচ্ছিন্ন কিংবা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রাখতে পারে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো।

কিন্তু যুদ্ধ চায় না চীন। চীন মনে করে আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান সম্ভব। ইউক্রেন সংকটে কোনো অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়তে চায় না চীন। বিশেষভাবে, প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এখন তাঁর ক্ষমতার তৃতীয় মেয়াদ নিশ্চিত করতেই ব্যস্ত। তিনি স্থিতিশীলতাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ঘনিষ্ঠ একজন বলেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার সামাল দেওয়া চীনের সক্ষমতার বাইরে। চীন ইচ্ছা করলেই রাশিয়ার সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারবে না।

চীন সব পক্ষকে নিয়ে এ সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান চাইলেও পুতিন যে তাতে কান দেবেন না এটা আজ সকালে তাঁর দেওয়া সামরিক অভিযানের নির্দেশেই দৃশ্যমান।

রয়টার্স, সিএনএন, বিবিসি ও আল জাজিরা অবলম্বনে লিপি রানী সাহা

চীন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন