এবারের চীনের শতবর্ষের স্মরণ উৎসব ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে চীন দেশের ভেতরে ও বাইরে এক ভিন্ন বার্তা দিতে চাইছে। এর আগে চীনের প্রেসিডেন্ট তাঁর দেশ সম্পর্কে ইতিবাচক গল্প তুলে ধরতে আহ্বান জানান। শতবর্ষ উদ্‌যাপনে সে বিষয়টিই প্রতিফলিত হচ্ছে।

তুলে ধরা হচ্ছে অর্জনটাই

শতবর্ষ উদ্‌যাপনে প্রকাশ করা ভিডিওতে কমিউনিস্ট পার্টি তাদের নানা অর্জনের বিষয়গুলো গর্ব করে তুলে ধরছে। এর মধ্যে রয়েছে তাদের প্রথম পারমাণবিক বোমা, গর্ব করার মতো নানা অবকাঠামো ও সম্প্রতি মঙ্গলে পাঠানো নভোযানের মতো নানা বিষয়। তবে বিশ শতকের বড় বড় বিক্ষোভ বা বিশৃঙ্খলার বিষয়গুলো আড়ালেই থেকে গেছে। ঐতিহাসিকদের মতে, এসব বিদ্রোহে লাখো মানুষ মারা গেছেন। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬০ সালের ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ নামের দুর্ভিক্ষ, ১৯৬৬ সাল থেকে শুরু হওয়া ‘সংস্কৃতি বিপ্লব’ ও ১৯৮৯ সালের তিয়েনআনমেন স্কয়ারের হত্যাকাণ্ডের বিষয়গুলো এখনো মুছে যায়নি।

যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ রবার্ট বিকার্স বলেন, ‘কমিউনিস্ট পার্টির অনেক ইতিহাস আছে, যা ভুলে যাওয়া দরকার। গত ১০০ বছরে দলটি তা মুছে দিতে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়েছে, যাতে ইতিহাসসম্মত একটি পাঠ্যকেই শুধু উদ্‌যাপন করা যায়।’

ঐতিহাসিক ধ্বংসযজ্ঞ

ইতিহাসকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য দীর্ঘকাল ধরেই চেষ্টা করছে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি। বর্তমান প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সময়ে সে প্রচেষ্টা আরও জোরালো হয়েছে। তিনি ঐতিহাসিক ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষেত্রে প্রচার চালানোর নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে অতীতের বিষয় নিয়ে চীনের নেতৃত্বকে প্রশ্ন না করার বা চীনের সমাজতন্ত্রের অনিবার্যতা নিয়ে কথা না বলার বিষয়গুলো।

চায়নিজ একাডেমি অব সোশ্যাল সায়েন্সেসের পক্ষ থেকে বিশেষ একটি ইতিহাসবিদের দল গঠন করা হয়েছে, যারা দলটির অতীত বিষয় নিয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়। এ বছর বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে জনগণের জন্য একটি হটলাইন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যাতে ইতিহাস বিকৃতির বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হুভার ইনস্টিটিউশনের ইতিহাসবিদ গ্লেন টিফার্ট বলেন, ‘দলটির প্রচারের বিষয়টি প্রমাণ করে যে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। এ ছাড়া এটি সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো ভেঙে পড়তে পারে বলে সির শঙ্কার প্রতিফলন।’

চীনকে পুনরুজ্জীবিত করতে দলের শতাব্দীর দীর্ঘ প্রচেষ্টা জারি রাখতে সির প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দলটি তার শিকড় থেকে দূরে সরে গেছে, মেমোরিয়াল হলটি তারই প্রতিফলন। যদিও দলটি তাদের প্রথম দশককে মার্ক্সবাদী তত্ত্বের জয় হিসেবে বর্ণনা করেছে, তবে তত্ত্বের সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই। বাজার পুনর্গঠনে তাদের অর্থনীতিকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পর্যায়ে নিয়ে এলেও তা সবচেয়ে বৈষম্যপূর্ণ বাজার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দলটির বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সম্প্রতি দেশটির সাংহাই ডেইলি প্রকাশ করে। তাতে দলটির কোনো মতাদর্শ প্রকাশ করা হয়নি। সেখানে বলা হয়েছে, দলটির লক্ষ্য হচ্ছে, চীনা নাগরিকদের সুখের সন্ধান ও চীনা জাতির নবজীবন।

ইতিহাসবিদ টিফার্ট বলেন, ‘তারা এখন আর কমিউনিজমে কথা বলে না, তারা মানুষকে ভালো রাখার কথা বলে। আর তা টেকসই করতে সব ভুল পদক্ষেপগুলো গোপন করতে চায়।’

ইয়াং শুজেনের বয়স এখন ৮৯। হুইলচেয়ারে করে মেমোরিয়াল হলে গিয়েছিলেন। তিনি কমিউনিস্ট পার্টির অর্জনগুলো স্মরণ করে গর্ব করেন। বলেন, সাত দশক আগে তিনি এ দলে যোগ দেন। দলটি তাঁকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছিল।

শুজেন বলেন, কমিউনিস্ট পার্টি দেশটিতে পরিবর্তন আনতে ব্যাপক সাহায্য করেছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে দরিদ্র ও সংখ্যালঘুদের জন্য ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে।

চীন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন