default-image

খালেদা জানান, ডেনমার্কে এক বাংলাদেশি তাঁদের পরিবারকে ঈদের দাওয়াত দিয়েছেন। তাঁর বাসায় যাচ্ছেন। কোলন শহরে পরিচিত বলতে তেমন কেউ নেই। দাওয়াত পেয়ে তাই ভালোই লেগেছে।

আজ ঈদের দিনে তাঁর বড় বেশি মনে পড়ছে আগের বছরগুলোর ঈদের স্মৃতি। গত বছরও দিনটি কত আনন্দের ছিল, সব উল্টাপাল্টা হয়ে গেল ২৪ ফেব্রুয়ারির পর। ওই দিনই রাশিয়া ইউক্রেনকে আক্রমণ করে। শুরু হয় যুদ্ধ। লোকজন শহর ছেড়ে পালায় । অনেকেই ইউক্রেনের সীমান্ত পার হয়ে দেশান্তরী হয়। খালেদা নাসরিনও এক অজানার উদ্দেশে পার হয়েছিলেন সীমান্ত, চলে এসেছিলেন জার্মানির কোলনে। কেমন কাটছে সেখানে?

খালেদা বলেন, ‘নিজেদের বাড়িঘর ছাড়লে কি কেউ ভালো থাকে? আমরা এখানে একটি হোটেলে আছি সরকারি ব্যবস্থাপনায়। এখানকার ক্যান্টিনেই খাওয়াদাওয়া। থাকা–খাওয়ার অসুবিধা নেই। কিন্তু এ তো জীবন নয়।’

চার মাস হয়ে গেছে, জার্মানির কোলনে এসেছেন। এটি বন নগরের কাছাকাছি। থাকা–খাওয়ার ব্যবস্থা ভালো হলেও রান্না নিজেদের করার কোনো সুযোগ নেই। সবকিছু ক্যানটিন থেকে নিতে হবে।

তাঁদের দুই সন্তান বাঙালি খাবারের বাইরে বিচিত্র খাবার পছন্দ করলেও তাঁরা স্বামী–স্ত্রী ডাল–মাছ–ভাতের ভক্ত। খালেদা বলেন, ‘কোথায় পাব সেই মাছ–ভাত? ইউরোপে মাছের ব্যবহার অনেক কম।’

default-image

আজ ঈদের দিনেও বাড়তি কোনো আয়োজন নেই। অথচ, খারকিভে ঈদের দিন কত আনন্দের ছিল। ট্রেনে চলতে চলতেই মুঠোফোনে স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বলতে শুরু করেন ডা. খালেদা—গত বছর কী এক কারণে কোরবানি ঈদের দিনটিতে তাঁর ছুটি ছিল। এমনিতে ইউক্রেনে দুই ঈদের কোনো ছুটি থাকে না। কেউ চাইলে অবশ্য ছুটি নিতে পারেন। কিন্তু তিনি সেদিন বাড়িতেই ছিলেন। প্রতিবছর যা হয়, সকালে উঠে টেবিল ভরপুর করে ফেলেছিলেন নানা খাবারে। আগের দিন পায়েস, সেমাই জোগাড় করে রান্না করেছিলেন। দিনভর মানুষজন আসবে। বাংলাদেশিসহ অন্য অনেকের কাছেই তাঁর বাড়িটি ছিল অতিথিশালা। শুধু ঈদ বা কোনো উপলক্ষে নয়, এমন খুব কম দিন আছে, যেদিন তাঁদের বাসায় অতিথি থাকত না। ঈদের দিন সকালে নাশতা তৈরি করে স্বামীকে নিয়ে চলে যেতেন কোরবানির স্থানে। খারকিভে সাধারণত ছাগল কোরবানি হতো। এক বাংলাদেশি আগে থেকেই কার কতটা মাংস দরকার, তার অর্ডার নিয়ে রাখতেন। কোরবানি হওয়ার পর সেই মাংস বাসায় নিয়ে আসতেন। খারকিভে মাংস বিলি করার উপায় নেই। তাই যতটা প্রয়োজন, তা কেটেকুটে নিয়ে আসতেন। বাসায় ফিরে রান্না শুরু হয়ে যেত। এরপর এক এক করে আসতে শুরু করতেন অতিথিরা।

default-image

খালেদা বলেন, ‘শুধু বাংলাদেশি মুসলিম নয়, হিন্দু–বৌদ্ধ–জৈন সব ধর্মের মানুষই দাওয়াতে আসতেন। দিন ধরে চলত আপ্যায়ন। কেউ কেউ রাতে থেকে যেতেন। আমি একাই শুধু রান্না করতাম না। অতিথিরাও যোগ দিতেন। সেসব দিন কি আর ফিরে পাব?’

ইউক্রেন ছাড়ার পর অনিশ্চিত যাত্রা এখনো শেষ হয়নি এ পরিবারের। এখন জার্মানিতে আছেন, তবে যুক্তরাজ্যে চলে যাওয়ার চেষ্টাও আছে। হয়তো চলে যাবেন। ইউক্রেনের তুলনায় ইউরোপের এসব দেশ অনেক উন্নত। তবে খাস্যশস্য আর খনিজে সমৃদ্ধ ইউরোপের ইউক্রেনের মায়া তাঁরা ছাড়তে পারেননি। নিজের বাড়ি, সংসার, নিজেদের ইচ্ছেমতো চলা, খাওয়াদাওয়া এখন অতীতের স্মৃতি।

default-image

খালেদা বলছিলেন, ‘এক তীব্র মনোকষ্ট আমাদের পুরো পরিবারকে গ্রাস করেছে। এ থেকে বের হতে পারছি না। কবে এ থেকে মুক্তি পাব, তা–ও জানি না।’

খালেদা নাসরিন ও তাঁর পরিবার ইউক্রেনবাসী হলেও তাঁরা দেশ ছেড়েছেন। কিন্তু যেসব বাংলাদেশি এখনো রয়ে গেছেন, তাঁদের ঈদের দিনটি অন্য বছরগুলোর চেয়ে ছিল একেবারে ভিন্ন রকম। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের বাসিন্দা হাবিবুর রহমানের অভিজ্ঞাও এমন। বরাবর ঈদের দিনে কেন্দ্রীয় মসজিদে নামাজে যেতেন। এবার কিয়েভের ত্রয়সিনা এলাকার ছোট মসজিদেই নামাজ পড়েছেন আজ। সেখানে বড়জোর ৬০ জন ছিলেন। এর মধ্যে বাংলাদেশি ছিলেন ৫ জন। অথচ অন্য বছরগুলোয় শ খানেক বাংলাদেশি জড়ো হন। ঈদ বাংলাদেশিদের এক মিলনমেলার সুযোগ করত। দিনভর চলত আড্ডা, খাওয়াদাওয়া, আনন্দ। ঈদের পশু কোরবানির জন্য কিয়েভের ভাসিলকোভ এলাকায় চলে যেতেন বেশির ভাগ বাংলাদেশি। সেখানে গরু ও ছাগল কোরবানি হতো। এবার সেখানে যেতে পারেননি হাবিবুর। তিনি বলেন, ‘এবার ভাসিলকোভ এলাকায় যুদ্ধাবস্থা চলছে। সেখানে সাধারণ নাগরিকদের যেতে সমস্যা হচ্ছে। তাই এবার এখানেই ছাগল কোরবানি দিয়েছি।’

হাবিবুর প্রতিবছর এই ঈদে ভাগে গরু কোরবানি দিতেন। এখানকার গরুগুলো অনেক বড়। তাই একাধিক পরিবার মিলে কোরবানি দেওয়া হতো। এবার কারও সঙ্গে তেমন যোগাযোগ নেই।

রাশিয়ার সৈন্যরা ইউক্রেনের একাধিক শহর দখল করলেও কিয়েভের দিকে এখনো আসেনি। তারপরও পুরো নগরে সেই কোলাহল, মানুষের চলাচল নেই। হাবিবুর রহমানের এক ছেলে ইউক্রেনের হয়ে লড়াইয়ে গেছেন। প্রতিবছর ছেলেকে নিয়ে ঈদের নামাজ পড়েন। এবার সেও নেই। তবে ঈদের দিনের আনন্দ ভাগাভাগি করতে তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে অনেককে চা ও কফিতে আপ্যায়ন করেছেন, জানালেন গাজীপুরে জন্ম নেওয়া হাবিবুর।

default-image

আজ যখন কিয়েভের কেন্দ্রীয় মসজিদে নামাজের জন্য ঢুকছিলেন, তখনই কথা হয় হাসিনুল হকের সঙ্গে। তিনি ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের নিভকি এলাকায় থাকেন। তাঁর জন্ম চুয়াডাঙ্গা জেলায়। দুই যুগের বেশি সময় ধরে হাসিনুল থাকেন নিভকিতে। এটি রাজধানীর প্রায় কেন্দ্রস্থলের একটি জায়গা।

হাসিনুল জানান, কিয়েভের অবস্থা সেই ২৪ ফেব্রুয়ারির আগের মতো হয়নি বটে তবে সেখানে জীবনযাত্রা অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। তাঁর বিশ্বাস, রুশ বাহিনী এ শহরের দিকে এগোবে না। তিনি কিয়েভ ছাড়বেন না বলে জানান। হাসিনুল বলেন, ‘ভয়টা তো মিসাইল হামলায়। দূর থেকে যদি মারে, তবে তো কিছু করার থাকবে না। তবে আপাতত তেমন হামলার শঙ্কা দেখি না।’

তবে আপাত শান্ত কিয়েভেও আগের ঈদের সেই আনন্দ ফিরে পাননি হাসিনুল। দেশের পরিচিত অনেকেই কিয়েভ ছেড়ে, কেউ কেউ ইউক্রেন ছেড়ে চলে গেছেন। সেসব পরিচিত মুখের অনেকেরই দেখা পাননি আজ মসজিদে। তাদের সঙ্গে আবার দেখা হবে কি না, আবার আগের মতো আনন্দের ঈদ আসবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে।

ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন