ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির দাবি, রাশিয়ার জন্য আকাশসীমা ‘বন্ধ করা দরকার’। সম্প্রতি ইউক্রেনের এক সাংবাদিক ইউক্রেনের আকাশকে উড্ডয়ন নিষিদ্ধ এলাকা (নো–ফ্লাই জোন) ঘোষণা করতে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের কাছে জোর দাবি জানান। যদিও সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন বরিস।

প্রশ্ন হচ্ছে, ইউক্রেনীয়রা কেন নো–ফ্লাই জোনের জন্য মরিয়া। এর স্পষ্ট কারণ হলো, এর ফলে ইউক্রেনের শহরগুলোতে রাশিয়ার বিমান হামলা চালানোর বিকল্প উপায়গুলো সীমিত হয়ে আসবে। তবে বরিসের দাবি, নো–ফ্লাই জোন ইউক্রেনে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিরোধে খুব একটা বাধা তৈরি করবে না। নো–ফ্লাই জোনের বিরুদ্ধে যুক্তি দিয়ে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস বলেছেন, এটাতে ভুগবে ইউক্রেনও। দেশটির যুদ্ধবিমানগুলোও স্থল রুশ সেনাদের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

যদিও নো-ফ্লাই জোনের বিরুদ্ধে আসা যুক্তিগুলো খুব বেশি বিশ্বাসযোগ্য নয়। নো-ফ্লাই জোন মানে এই নয় যে কোনো উড়োজাহাজ ওড়ার অনুমতি না দেওয়া। কারণ, নো-ফ্লাই জোনের নিষেধাজ্ঞা যুদ্ধবিমান দিয়েই বাস্তবায়ন করা হয়। এ সময় বিমানগুলো ক্রমাগত আকাশে টহল দিয়ে থাকে। নো-ফ্লাই জোন শুধু শত্রু যুদ্ধবিমানের জন্য প্রযোজ্য হতে পারে। যদি ইউক্রেনীয় যুদ্ধবিমানগুলো ন্যাটোর ‘বন্ধু বা শত্রু শনাক্তকরণ’ যন্ত্র দিয়ে সজ্জিত থাকে, তাহলে স্থল রুশ বাহিনীকে সাহায্য করা হেলিকপ্টারগুলোকে ঠেকিয়ে দিতে পারে।

এদিকে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের সরাসরি হুমকি দিয়ে রেখেছেন পুতিন। কিন্তু এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, রাশিয়ার বিশাল পারমাণবিক অস্ত্রাগার এবং ব্যাপক যুদ্ধের ঝুঁকি ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোকে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের বাইরে যেকোনো সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে কার্যকরভাবে বিরত রেখেছে।

রাশিয়া বনাম ইউক্রেন

ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর চেয়ে রাশিয়ার বিমানবাহিনীর অনেক বেশি সক্ষমতা রয়েছে, এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। যদিও অবাক করা বিষয় হচ্ছে, রাশিয়া এখনো নিজেদের যুদ্ধবিমানের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে পারেনি। চলমান যুদ্ধে রাশিয়া প্রায় ৩০০ আধুনিক যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে। তবে বেশির ভাগ অভিযানেই এগুলো ওড়েনি। এর কৌশলগত কারণগুলো এখনো অস্পষ্ট। যদিও যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের ভাষ্য, প্রয়োজনীয় যুদ্ধাস্ত্রের অভাব ছাড়াও রুশ পাইলটদের যুদ্ধবিমান চালানোর অভিজ্ঞতার অভাবের কারণে এটি হতে পারে।

default-image

রাশিয়া বনাম ন্যাটো

ন্যাটোর যুদ্ধবিমান রুশ যুদ্ধবিমানের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে রাশিয়া যদি শক্তি দেখানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তীব্র লড়াই বেধে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পঞ্চম প্রজন্মের মার্কিন যুদ্ধবিমান এফ-২২ র‌্যাপটর ও এফ-৩৫ লাইটনিং সবচেয়ে আধুনিক রাশিয়ান যুদ্ধবিমান এসইউ-৫৭ থেকে সক্ষমতার দিক থেকে বেশ এগিয়ে। আর ইউক্রেনে মোতায়েন করা বেশির ভাগ রুশ যুদ্ধবিমান অপেক্ষাকৃত কম সক্ষমতার এসইউ-৩০ এবং এসইউ-৩৫ মডেলের।

এদিকে ন্যাটোর কাছে এফ-১৫, এফ-১৬, ইউরোফাইটারসহ একাধিক যুদ্ধবিমান রয়েছে। সংখ্যা ও প্রযুক্তি উভয় ক্ষেত্রেই ন্যাটোর ইউক্রেনে অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা রয়েছে। ন্যাটোর একটি বিবৃতি অনুসারে, ন্যাটো জোটের পূর্বাংশে হাজারো অতিরিক্ত প্রতিরক্ষামূলক সেনা ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া ন্যাটো অঞ্চলজুড়ে সামুদ্রিক সম্পদ এবং এর প্রতিরক্ষায় পরিকল্পনা চলমান রয়েছে।

যুদ্ধের ব্যাপকতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা

নো-ফ্লাই জোন কার্যকরের জন্য রাশিয়ান যুদ্ধবিমানকে পরাস্ত ও ধ্বংস করার পাশাপাশি ইউক্রেনের অভ্যন্তরে মোতায়েন রুশ যুদ্ধবিমান প্রতিরক্ষা ক্ষমতার ওপর হামলার প্রয়োজন হবে, যা রাশিয়ার স্থলবাহিনীকেও আঘাত করবে। আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভাঙতে রাশিয়া ও বেলারুশ অঞ্চলে হামলার প্রয়োজন হবে।

ন্যাটোর বিমান হামলার প্রতিক্রিয়ায় মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে ন্যাটো বিমানবাহিনীর ওপর রাশিয়ার হামলার আশঙ্কা রয়েছে। ইউক্রেন ইতিমধ্যে দেশটির বাইরে একটি রাশিয়ান বিমানঘাঁটিতে আক্রমণ করেছে। এ ধরনের হামলা নো-ফ্লাই জোন কার্যকরের যেকোনো প্রচেষ্টার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তবে এটা নিশ্চিত, এর ফলে যুদ্ধ অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়বে।

একটা বিষয় পরিষ্কার হওয়া জরুরি, ইরাক ও সিরিয়া যুদ্ধের মতো ইউক্রেনে নো-ফ্লাই জোন ঘোষণা করাটা ভিন্ন বিষয়। ন্যাটো দেশগুলো এখন পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে অনড় যে তারা নো-ফ্লাই জোনের প্রস্তাব গ্রহণ করবে না। কিন্তু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় কাজ না হলে, সংঘাত আরও বেড়ে গেলে, ব্যাপক হারে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি হলে এবং ইউক্রেনের সরকারের পতন হলে পশ্চিমাদের ওপর আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার চাপ বাড়তে পারে।

এর আগে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ভোরে ইউক্রেনে হামলা শুরুর নির্দেশ দেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। রুশ সেনারা প্রথম দিনই ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের উপকণ্ঠে পৌঁছে যায়।

হামলা শুরুর পর রাশিয়ার ৯ হাজার সেনা নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। এ ছাড়া রুশ বাহিনীর ২১৭টি ট্যাংক, ৯০টি কামান, ৩১টি হেলিকপ্টার এবং ৩০টি জঙ্গি বিমান ও অন্যান্য এয়ারক্রাফট ধ্বংস করার দাবি করেছে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী। অন্যদিকে ইউক্রেনের ২ হাজার ৮৭০ জন সেনা ও ‘জাতীয়তাবাদীকে’ হত্যার দাবি করেছে রাশিয়া। যুদ্ধে তাদের ৪৯৮ সেনা নিহত হওয়ার কথাও স্বীকার করেছে দেশটি। এদিকে কিয়েভসহ দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে লড়াইয়ে আহত রুশ সেনাদের বেলারুশের ইউক্রেন সীমান্তবর্তী এলাকার হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণধর্মী সংবাদমাধ্যম দ্য কনভারসেশন , রয়টার্স ও বিবিসি অবলম্বনে রাকিব হাসান

ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন