গত ২৯ মার্চ তুরস্কের ইস্তাম্বুলে ইউক্রেনের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনায় বসে রাশিয়ার প্রতিনিধিদল। আলোচনা শেষে রুশ উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী আলেকজান্দার ফোমিন ঘোষণা দেন, ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চলের চেরনিহিভ শহর এবং কিয়েভের আশপাশে সামরিক তত্পরতা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ইউক্রেনে অবস্থান করা রুশ সেনারা পূর্বাঞ্চলীয় দনবাস অঞ্চলে নজর দেবে বলে এর আগে জানান রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই সোইগু। তিনি বলেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযানের প্রথম পর্যায়ের প্রধান কাজগুলো শেষ হয়েছে। ‘দনবাসের স্বাধীনতার’ দিকে এখন নজর দেওয়া যেতে পারে।

লুহানস্ক ও দোনেত্স্ক অঞ্চল নিয়ে গঠিত দনবাস। ইউক্রেনে হামলার আগে এই দুই অঞ্চলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেয় রাশিয়া। এর কয়েক দিন পরই ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করে দেশটি।

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সহযোগী অধ্যাপক আলেকজান্দার বি দোনেস আল-জাজিরাকে বলেন, ইউক্রেনে যুদ্ধ দেশটির পূর্ব দিকে (দনবাসে) সরে যাবে এমনটি হতে পারে। বিষয়টি ভালো হবে। কারণ, এর অর্থ এমনটি হতে পারে, ইউক্রেন দখল ও দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্য ত্যাগ করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।

তবে হামলা কমানো ও কৌশল পরিবর্তন নিয়ে রাশিয়ার বিবৃতিগুলো বিশ্বাস করা কঠিন বলেও মনে করেন এই অধ্যাপক। তাঁর ভাষ্য, বিবৃতিগুলো “সাধারণ” কোনো নেতা বা দেশের কাছ থেকে এলে তা বিশ্বাসযোগ্য হতো। কিন্তু সেগুলো এসেছে পুতিনের কাছ থেকে।

আলেকজান্দার বি দোনেস বলেন, ‘এখন পর্যন্ত দেখা গেছে, কিয়েভের আশপাশ থেকে রাশিয়ার সেনাবহর আংশিক সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এটা একটা অস্পষ্ট সংকেত। তাদের (রুশ সামরিক বাহিনী) হয়তো পূর্ব ইউক্রেনে পাঠানো হবে। তবে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে আবার কিয়েভে ফিরিয়ে নেওয়াও হতে পারে। এই মুর্হূতে আমরা জানি না, কী হবে।’

ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে রুশ ভাষাভাষী কয়েকটি জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। জনগোষ্ঠীগুলোর কয়েকটি মস্কোর শাসনের আওতায় থাকাকে সমর্থন করবে বলে মনে করেন যুক্তরাজ্যের নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক অধ্যাপক ওয়েন রেস।

আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, ইউক্রেনের বাকি শহরগুলো, যেখানে রাশিয়ার বিরোধিতা করা হচ্ছে, সে শহরগুলোর চেয়ে পূর্ব ইউক্রেনের রুশভাষী অঞ্চলগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়াই রাশিয়ার কাছে বেশি আকর্ষণীয় হবে।

দনবাসের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে যুদ্ধের কৌশলে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, সেটি ইউক্রেনে হামলা চালানোর সময় রাশিয়ার যেসব লক্ষ্য ছিল, তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বলে মনে করছেন ওয়েন রেস।

এই অধ্যাপকের মতে, অভিযান শুরুর সময় রাশিয়া বলেছিল, ইউক্রেনে তাদের উদ্দেশ্য হবে দেশটিতে রুশপন্থী জনগোষ্ঠীকে গণহত্যা থেকে রক্ষা করা ও নব্য নাৎসিদের পরাজিত করা। অভিযান দনবাসে সরিয়ে নেওয়া ওই উদ্দেশ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।

তবে এ নিয়েও সন্দেহ প্রকাশও করেছেন ওয়েন রেস। তিনি বলেন, এটি স্বল্প সময়ের জন্য রাশিয়ার একটি কৌশলও হতে পারে। এ সময়ের মধ্যে ইউক্রেনে অবস্থান করা রুশ সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করা হতে পারে। রাশিয়া যা বলে ও যা করে, তা যে পুরোপুরি আলাদা, এটা প্রমাণিত।

এদিকে হামলা কমানোয় রাশিয়ার প্রতিশ্রুতি ও দনবাস অঞ্চলের দিকে নজর দেওয়ার পেছনে ভিন্ন কারণ দেখছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। দেশ দুটির দাবি, ইউক্রেনে বিফলে গেছে রাশিয়ার অভিযান।

যুক্তরাজ্যের সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও পোর্টসমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফ্র্যাঙ্ক লেডউইজ বলেন, ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চলে, বিশেষ করে কিয়েভের আশপাশে রাশিয়ার সেনাবাহিনী তাদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। নিজেদের ব্যর্থতা আরও বাড়ানোর চেয়ে, যেসব লক্ষ্য অর্জন করা যেতে পারে, সেগুলো নিয়ে কাজ করা রাশিয়ার জন্য অর্থবহ হবে।

রাশিয়ার কৌশল পরিবর্তনের পেছনে দ্বিতীয় কোনো কারণ থাকতে পারে বলে মনে করছেন জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সহযোগী অধ্যাপক আলেকজান্দার বি দোনেস। তাঁর ভাষ্য, রুশ বাহিনীর দনবাসে নজর দেওয়ার ঘোষণা একটি প্রতারণা হতে পারে। এর ফলে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী কিয়েভসহ অন্য অঞ্চলগুলোতে তত্পরতা কমাবে বলে মনে করছে রাশিয়া। এমনটি হলে নতুন করে হামলা চালিয়ে কিয়েভ দখল করার পথে হাঁটতে পারে দেশটি।

আলেকজান্দার বি দোনেস বলেন, পূর্ব ইউক্রেনে মোতায়েনের জন্য কিয়েভের উত্তর–পশ্চিম থেকে কিছু রুশ সেনা বেলারুশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিয়েভে নতুন করে হামলা চালানোর জন্য তাদের আবার ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এমনটি হবে কি না, তা শিগগিরই নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।

ইউক্রেন দখলের কৌশলগত লক্ষ্য রাশিয়া এখনো ত্যাগ করেনি বলে মনে করেন পোর্টসমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফ্র্যাঙ্ক লেডউইজ। তিনি বলেন, রাশিয়া এখন ওই লক্ষ্য ভিন্নভাবে অর্জনের চেষ্টা করছে। ঘোষণা অনুযায়ী, রাশিয়া যদি লুহানস্ক ও দোনেত্স্ক অঞ্চল ‘স্বাধীন’ করতে পারে। তাহলে মস্কোর পক্ষ থেকে ইউক্রেন অভিযানে বিজয় ঘোষণার সুযোগ থাকবে।

লেডউইজ বলেন, ‘আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে রাশিয়া সহজে পরাজয় মেনে নেবে না। ইউক্রেন যুদ্ধে তারা যেভাবে ধাক্কা খেয়েছে, তা সবার কাছে অপ্রত্যাশিত। যাহোক তারা এখনো অপ্রতিরোধ্য। আর ভুলের থেকে তারা শিক্ষা নিতে পারে।’

ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন