বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

রাশিয়ার সেনাদের এমনভাবে মোতায়েন করা হবে, যাতে ইউক্রেনের সঙ্গে পোল্যান্ডের পূর্বাঞ্চলের সীমান্তের ৬৫০ মাইলের পুরোটাতে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা যায়। একই সঙ্গে ইউক্রেনের পাশের দেশ স্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরি এবং রোমানিয়ার উত্তরাঞ্চলের সীমান্তেও রুশ প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে। মলদোভা রুশ নিয়ন্ত্রণে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে মস্কোর দখলে থাকা ক্রিমিয়া থেকে মলদোভার ট্রান্সনিসট্রিয়া প্রদেশ পর্যন্ত একটি সেতু নির্মাণ করতে হবে রাশিয়াকে। তাহলে ক্রিমিয়ার সঙ্গে দেশটি সংযুক্ত হবে। ইউক্রেনে কবজা করতে পারলে বর্তমান রাশিয়ার কৌশলগত গুরুত্ব অনেকটাই বেড়ে যাবে, তাতে সন্দেহ নেই।

তবে রুশ বাহিনী ইউক্রেন কবজা করলে বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলো তাৎক্ষণিকভাবে ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ অঞ্চলের দেশ এস্তোনিয়া, বেলারুশ ও লাটভিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার সরাসরি সীমান্ত রয়েছে। পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার গা ঘেঁষে বাল্টিক সাগরের তীরে রয়েছে রাশিয়ার কালিনিনগ্রাদ। সেখান থেকে বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলোর ওপর মস্কোর ছড়ি ঘোরানো সহজ। কালিনিনগ্রাদ রাশিয়া নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আগে থেকেই বাল্টিক অঞ্চলের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য আগ্রাসন মোকাবিলার বিষয়ে ন্যাটো জোটে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়ে গেছে। এখন রাশিয়া যদি পুরো ইউক্রেনে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে পুরোনো ওই প্রশ্ন নতুন করে জরুরি হয়ে সামনে আসবে।

কালিনিনগ্রাদ রাশিয়ার অংশ হলেও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে তা মূল রুশ ভূখণ্ড থেকে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন। ওই সময় থেকে সমুদ্রপথ ছাড়া কালিনিনগ্রাদে প্রবেশের জন্য রাশিয়া পুরোপুরি পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার ওপর নির্ভরশীল। এখানে রাশিয়ার বাল্টিক নৌবহরের সদর দপ্তর অবস্থিত। তাই এ অঞ্চলটি রাশিয়ার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখন পুতিনের কৌশল হতে পারে কালিনিনগ্রাদে প্রবেশের জন্য সরাসরি একটি করিডর তৈরি করা। আর তাতে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে থাকা দেশগুলো পুতিনকে সর্বোচ্চ সহায়তা করতে পারে। তাই বাল্টিক অঞ্চলে ন্যাটোর সম্প্রসারণ ঠেকানোর চেয়ে পুতিনের কাছে এ স্বার্থ পূরণ বেশি জরুরি।

পুতিনের লক্ষ্য নতুন সীমানা

ইউক্রেনকে কবজায় নিয়ে রাশিয়া নতুন যে সম্প্রসারিত ভৌগোলিক সীমানা গড়তে চাইছে, তার সঙ্গে পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি ছাড়া আরও পাঁচটি ন্যাটোভুক্ত দেশের সরাসরি সীমান্ত রয়েছে। আর পুতিনের সম্প্রসারিত এ সীমানা গড়ার পরিকল্পনা বাস্তব হলে পূর্ব ইউরোপের মিত্রদের কাছে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর প্রভাব, সক্ষমতা এবং নিয়ন্ত্রণ গুরুতরভাবে কমে যাবে।

নতুন এই পরিস্থিতি বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলোর কাছে মিত্রতার সংজ্ঞা ও উদ্দেশ্যও বদলে দেবে। পুতিন তাঁর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে অবিচল—তিনি পূর্ব ও মধ্য ইউরোপে রাশিয়ার ঐতিহ্যবাহী প্রভাববলয় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চান। তবে এ অঞ্চলের কিছু দেশ তাঁর এমন স্বপ্ন বাস্তবায়নে অন্তরায়। রুশ সাম্রাজ্যের শানশওকত যখন তুঙ্গে, তখন পোল্যান্ড পৃথক কোনো রাষ্ট্র ছিল না। বাল্টিক দেশগুলো রুশ সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবে অস্ট্রিয়া ও জার্মানির সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে ছিল। এমনকি মাঝেমধ্যে মন–কষাকষি করলেও সাবেক সোভিয়েত আমলে এ অঞ্চলের দেশগুলো মস্কো থেকে নিয়ন্ত্রিত হতো। মস্কোকে সঙ্গে নিয়েই তখন এসব দেশ ন্যাটোর প্রভাব রুখতে নিরাপত্তাসংক্রান্ত ওয়ারশ চুক্তি সই করেছিল। যদিও সোভিয়েত পতনের পর পোল্যান্ড ও রোমানিয়ার মতো দেশগুলো এখন ন্যাটোভুক্ত।

শতকের পর শতক ধরে ইউরোপের মানচিত্র নানা ঘটনায়, নানা কৌশলে বদলে গেছে। এখনকার ইউরোপীয় মানচিত্র গত শতকের রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ। আশির দশকের পর থেকে এখন পর্যন্ত ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রভাব ক্রমশ বেড়েছে। বিপরীতে কমেছে রাশিয়ার প্রভাব। কিন্তু সময় বদলাচ্ছে। ইউরোপের পরিবর্তিত মানচিত্রে উল্টো চিত্র দেখা যেতে পারে।

এখন পুতিন স্পষ্টত এ অঞ্চলে ন্যাটোকে এমনভাবে দেখতে চাইছেন যেখানে একসময়ের ওয়ারশ চুক্তিতে থাকা দেশগুলোয় ন্যাটো জোটের সেনা উপস্থিতি থাকবে না। এ ছাড়া ইউরোপে নতুন ‘নিরাপত্তাকাঠামো’ চালু করতে চাইছেন পুতিন। অবশ্যই সেটা রাশিয়ার নেতৃত্বে। যদিও পূর্ব ইউরোপের সীমান্ত বরাবর ন্যাটো সেনাদের অবস্থান রয়েছে। তবে এ সামরিক জোট পুতিনের উচ্চাভিলাষ রুখতে কতটা সক্ষম, সেটা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

এটা অনেক ক্ষেত্রে পূর্ব এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত হুমকির সমতুল্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৌশলগতভাবে পূর্ব এশিয়ায় চীনা আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাইওয়ান। তাই শান্তিপূর্ণ উপায় সফল না হলে পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম তীরবর্তী অঞ্চলে প্রভাববলয় বিস্তারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে তাইওয়ানে সামরিক আগ্রাসনে পিছপা হবে না বেইজিং। আর এমনটা হলে পুরো অঞ্চলে অশান্তি ছড়াবে। এশিয়ার অন্য দেশগুলোও আতঙ্কিত হয়ে পড়বে। সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ডাকবে।

রাশিয়া–চীনের মিলিত ঝুঁকি

একই সময়ে দুটি দূরবর্তী অঞ্চলে প্রায় একই রকমের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হওয়াটা আমাদের গত শতকের ত্রিশের দশকের কথা মনে করিয়ে দেয়। ওই সময় নিজ নিজ অঞ্চলের প্রচলিত নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রতি চ্যালেঞ্জ জানায় জার্মানি ও জাপান। দুটি দেশেরই বিশ্বাসযোগ্য কোনো মিত্র ছিল না। তারা একে অপরকে বিশ্বাসও করত না। এমনকি নিজেদের কৌশলগুলো নিয়ে সরাসরি সমন্বয় ছিল না জাপান ও জার্মানির মধ্যে। ফলে জার্মানি ইউরোপে শক্তি অর্জন করতে থাকে। আর জাপান পূর্ব এশিয়ার জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দুই অঞ্চলে দুই শক্তির উত্থান নাৎসি নেতা এডলফ হিটলারের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তোলে। তিনি মনে করতেন, যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে দুই অঞ্চলে পৃথক দুটি দেশের সঙ্গে বিরোধে জড়ানোর ঝুঁকি নেবে না।

বর্তমানে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের কাছে এটা স্পষ্ট হওয়া উচিত যে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় বিরোধে পুরোপুরি জড়িয়ে পড়েছে। ইউক্রেনে রুশ হস্তক্ষেপের আগে তিনি হয়তো ভেবেছিলেন, তাইওয়ান কিংবা দক্ষিণ চীন সাগরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অগ্রযাত্রা এগিয়ে নিতে পারবেন তিনি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি আরও অনুকূল হয়েছে। তবে অনেকেই মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল একই সঙ্গে মস্কো ও বেইজিংয়ের মিলিত ঝুঁকি মোকাবিলা করতে সক্ষম।

অনেক দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কৌশলে এখনকার মতো বিশ্বের দুই প্রান্তে ভিন্ন দুই সামরিক ঝুঁকি মোকাবিলা করার আশঙ্কার কথা বলা হয়েছিল। তবে গত শতকের নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ক্রমান্বয়ে এ ঝুঁকি কমিয়ে এনেছিল। এর ফলে বিষয়টি গুরুত্ব হারাতে থাকে। অবশেষে ২০১২ সালের প্রতিরক্ষা নীতিবিষয়ক গাইডলাইনে এটা আনুষ্ঠানিকভাবে বাদ দেওয়া হয়।

এখন বিশ্বের দুই প্রান্তে দুটি পৃথক সামরিক ঝুঁকির চিত্রটা আরও প্রকট হয়ে উঠেছে; যা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে ওয়াশিংটনকে এমন একটা পৃথিবী মেনে নিতে হবে, যেখানে পূর্ব ইউরোপে রাশিয়ার প্রভাব আগের তুলনায় জোরদার হয়েছে। একইভাবে পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম তীরের দেশগুলোয় প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে বেইজিং। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ ও এশিয়ায় তার গণতান্ত্রিক মিত্রদের নতুন করে এটা নির্ধারণ করতে হবে যে পরিবর্তিত সেই পৃথিবী তারা মেনে নিতে পারবে কি না।

ইউক্রেনের চূড়ান্ত পরিণতি

স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অস্তিত্ব হারাতে পারে ইউক্রেন। কেননা পুতিনসহ রাশিয়ার অনেকে মনে করেন যে ইউক্রেন সার্বভৌম রাষ্ট্র নয়। রাশিয়ার অংশমাত্র। অতীত ইতিহাস ও আবেগের বশে তাঁরা এমনটাই প্রমাণ করতে চান। তাই সাম্প্রতিক সংঘাত ও হস্তক্ষেপের সার্বিক আয়োজনের পর পুতিন ইউক্রেনের সার্বভৌমত্বে আঘাত হানবেন না, এটা বিশ্বাস করা কঠিন। এমনটা হলে তা পুতিনের ভীষণ দুর্বল সামরিক কৌশল হিসেবে ইতিহাসে প্রতীয়মান হবে।

default-image

যদিও এখনকার আগ্রাসী পরিস্থিতি ইউক্রেনকে ঘিরে সীমাহীন সংঘাতের জন্ম দেবে। ইউক্রেনে মস্কো–সমর্থিত একটি সরকার বসাতে চাইবেন পুতিন। সেই সরকার দেশটিকে চূড়ান্তভাবে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা চালাবে। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনে ধীরে ধীরে বিদ্রোহ অঙ্কুরিত হচ্ছে। তবে দেশটির সাধারণ মানুষ পুরোদমে যুদ্ধে জড়ানোর বিপক্ষে। তাঁরা শান্তি চান। নিজ ভূমিতে রুশ আগ্রাসন সমর্থন করেন না। রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হলে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে ইউক্রেনবাসীর সমর্থন ও সহায়তা প্রয়োজন হবে।

পোল্যান্ড সেই ভূমিকা পালন করতে পারে। সে ক্ষেত্রে রুশ বাহিনীর সরাসরি দেশটির সীমান্ত অতিক্রম করার ঝুঁকি রয়ে যায়। হাঙ্গেরি কিংবা বাল্টিক অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর ভূমিকাও একই রকম হতে পারে। যদি তারা এমনটা করে, তবে রাশিয়ার বাহিনী বিরোধীদের রসদ সরবরাহের পথগুলোয় হামলা চালাবে। তা বন্ধ করে দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। শেষ অবধি ন্যাটোর সদস্য হোক কিংবা না হোক, বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলোর ভৌগোলিক অখণ্ডতার ওপর রাশিয়ার চূড়ান্ত আঘাতের আশঙ্কা উপেক্ষা করা যাবে না। তাই চলমান সংকট আপাতত ইউক্রেনে সীমিত থাকছে, সামগ্রিক বিবেচনায় এমনটা ভেবে নেওয়াই শ্রেয়।

শতকের পর শতক ধরে ইউরোপের মানচিত্র নানা ঘটনায়, নানা কৌশলে বদলে গেছে। এখনকার ইউরোপীয় মানচিত্র গত শতকের রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ। আশির দশকের পর থেকে এখন পর্যন্ত ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রভাব ক্রমশ বেড়েছে। বিপরীতে কমেছে রাশিয়ার প্রভাব। কিন্তু সময় বদলাচ্ছে। ইউরোপের পরিবর্তিত মানচিত্রে উল্টো চিত্র দেখা যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব সংকুচিত হতে পারে। সামরিক শক্তির জেরে বাড়তে পারে রুশ প্রভাব।

একই সময়ে যদি পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম তীরের দেশগুলোয় চীনের প্রভাববলয় বেড়ে যায়, তবে তা প্রচলিত বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাবে। প্রায় সব অঞ্চলে একসঙ্গে চলমান সংঘাত ও অশান্তির নতুন এক যুগে প্রবেশ করবে বিশ্ব, যা বিশ্বের সামনে সম্পূর্ণ নতুন একটি শক্তিকাঠামো হাজির করতে পারে।
অনুবাদ করেছেন অনিন্দ্য সাইমুম ইমন।

ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন