default-image

করোনাভাইরাসের এই মহামারির সময় চেক প্রজাতন্ত্রের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে অনন্য ভালোবাসার নজির স্থাপন করেছে দেশটিতে থাকা ভিয়েতনামের নাগরিকেরা। দেশটির নাগরিকদের জন্য বিনা মূল্যে খাবার বিতরণ, নাগরিক ও হাসপাতালের জন্য মাস্ক তৈরিসহ হাসপাতাল, স্কুল ও সিটি কাউন্সিলেও ভিয়েতনামের কমিউনিটি মোটা অঙ্কের অর্থ সহায়তাও করছে।

আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউরোপে যখন করোনাভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, তখন চেক সরকার দেশটিতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। অস্ট্রিয়া ও হাঙ্গেরির মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সীমান্ত সংযোগ বন্ধ করে দেয় সরকার। তবে করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার কমে আসায় সম্প্রতি সীমান্ত খুলে দিয়েছে দেশটি। রাজধানী প্রাগে বাইরে গেলে সবার জন্য মাস্ক ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক করা হয়। যদিও তখনো দেশটিতে মাস্কের অপ্রতুলতা ছিল, তারপরও তা ব্যবহার না করে উপায় ছিল না কারও। চেক প্রজাতন্ত্র ছোট্ট একটি দেশ। জনসংখ্যা এক কোটির বেশি। জোগানের তুলনায় দেশটিতে এ কারণে মাস্কের চাহিদা দ্রুত বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে কেউ কেউ বাড়িতে নিজেরাই মাস্ক তৈরি করে বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে। আর কেউ কেউ মাস্কের সরবরাহ বাড়িয়ে অন্যদের হাতে তুলে দিতে নিজেদের দক্ষতাকে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয়। আর এই কাজে দ্রুত সাড়া দেয় চেক প্রজাতন্ত্রে লাম চা মে নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ভিয়েতনামের একদল নারী।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লাম চা মের প্রতিনিধি অ্যামি লুয়ং বলেন, চেক হাসপাতালে কর্মরত ভিয়েতনামের বংশোদ্ভূত চিকিৎসকদের সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ট যোগাযোগ রয়েছে। তাঁরাই আমাদের জানিয়েছি যে, হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় উপকরণের কতটা সংকট।

প্রাগভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লাম চা মে প্রায় দুই বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়। চেকে বাস করা ভিয়েতনামের বংশোদ্ভূত একদল তরুণী মায়ের প্রচেষ্টায় এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠানটির মূল উদ্দেশ্য ছিল চেক প্রজাতন্ত্রে থাকা ভিয়েতনামের অভিবাসীদের আইনি ও প্রশাসনিক বিষয়ে নানা তথ্য দিয়ে সহায়তা করা।

করোনাভাইরাসের এই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি মাস্ক তৈরির কাজ করার জন্য ফেসবুকে একটি গ্রুপ খুলে মানুষদের আহ্বান জানাতে থাকে। যাদের সেলাইয়ে দক্ষতা আছে এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ রয়েছে এমন প্রায় এক হাজার মানুষ তাদের আহ্বানে সাড়া দেয়।

অ্যামি লুয়ং বলেন, প্রথমে সাড়া দেওয়া এক হাজার সদস্যদের মধ্যে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন মানুষ সক্রিয়ভাবে প্রতিদিন মাস্ক তৈরি করছেন। এই নারীরা মূলত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। সরকারের জারি করা লকডাউনের কারণে তাঁদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। এ কারণে তাঁরা এই প্রতিষ্ঠানটির হয়ে কাজ করছেন। দেশটিতে মাস্কের চাহিদা দিন দিন বন্যার মতো বেড়ে যেতে থাকে। স্বেচ্ছাসেবকেরা একটি ওয়েবসাইট ডেভেলপ করেছেন। সেখানে যে কেউ মাস্কের জন্য অর্ডার দিতে পারেন। বেশিরভাগ অর্ডার এসেছে হাসপাতাল, অবকাশ ভবন ও সিটি কাউন্সিল থেকে। তিনি বলেন, ভিয়েতনামের নাগরিকেরা নিজস্ব কাপড় দিয়ে মাস্ক তৈরি করেছে। এ কারণে তা দ্রুত তৈরি হয়ে যায়। প্রতিদিন হাজার হাজার মাস্কের অর্ডার আসতে থাকে। এগুলো চাহিদামতো সময়ে সরবরাহ করতে আমাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, চেক পরিসংখ্যান অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চেক প্রজাতন্ত্রে বর্তমানে প্রায় ৬২ হাজার ভিয়েতনামের বংশোদ্ভূত নাগরিক বাস করেন। এদের মধ্যে অনেকেই প্রায় ৩০ বছর ধরে এখানে আছেন। তাঁদের কেবল একটি অংশের চেক নাগরিকত্ব রয়েছে। স্লোভাক ও ইউক্রেনের পরে তারা দেশটিতে সংখ্যালঘুর দিক থেকে তৃতীয়। আর এই সংখ্যালঘুরাই দেশটিতে বাড়িয়ে দিয়েছে সহযোগিতার নির্ভর হাত।

ভিয়েতনামের বংশোদ্ভূতরা এখনো চেক ভাষা ও সাংস্কৃতিক বাধা দূর করতে সংগ্রাম করে চলেছে। এরপরও এঁদের অনেকেই উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন। তাঁদের বেশিরভাগই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। চেক প্রজাতন্ত্রে অ্যাসোসিয়েশন অব ইয়ং ভিয়েতনামিস এন্টারপ্রেনারসের প্রতিষ্ঠাতা নগুয়েন মানহ তুং বলেন, সবখানেই আমাদের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ নিজস্ব ব্যবসা রয়েছে। এসব ব্যবসার মধ্যে রয়েছে রেস্টুরেন্ট, নেইল স্টুডিও, নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান ও বাইরের মার্কেট।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে গত ১৪ মার্চ চেক সরকার যেকোনো খুচরা পণ্য বিক্রি ও সেবার ক্ষেত্রে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তবে খাদ্যসামগ্রী ও ওষুধ এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে। ৩১ এপ্রিল পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ পরে বাড়ানো হয়। এ কারণে দেশটির ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েন। বিশেষ করে ভিয়েতনাম বংশোদ্ভূতদের আয় বন্ধ হয়ে যায়। মাস্ক তৈরির কাজে আবেদনকারীদের বেশিরভাগই তাঁরা।

নগুয়েন মানহ তুং বলেন, চিন্তার কিছু নেই। এই সংকট সবার। সবাইকেই তা কাটিয়ে উঠতে হবে। তবে ভিয়েতনামিদের একটা সুবিধা আছে, তারা অর্থ সঞ্চয় করতে পারে। কারণ, তাঁরা ভিয়েতনাম থেকে চেক প্রজাতন্ত্রে এসেছেন তাঁদের সন্তানদের উন্নত জীবনের জন্য। এ ছাড়া ভিয়েতনামে বাবা-মাকে তাঁদের অর্থ পাঠাতে হয়। তাই এই দেশে আসার শুরু থেকেই তাঁরা অর্থ সঞ্চয়ে মনোযোগী হয়।

ভিয়েতনামের নাগরিকদের আরেকটি বড় সুবিধা হলো, এই কমিউনিটির মানুষেরা সহমর্মী হয়। বিপদের সময় একে অন্যকে সহযোগিতা করতে তাঁরা এতটুকুও পিছপা হয় না। এ প্রসঙ্গে নগুয়েন মানহ তুং বলেন, ২০০৮ সালে অর্থনৈতিক সংকটের সময় আমরা একই ধরনের পরিস্থিতির মুখে পড়েছিলাম। অনেকেই চাকরি হারিয়ে বেকার বসেছিল। এক বেলা খাবারের জোগার করার মতো অর্থও ছিল না। সেই সময় কমিউনিটির সামর্থ্যবানেরা অর্থনৈতিকভাবে তাঁদের যথেষ্ট সহযোগিতা করেছিলেন।
করোনাভাইরাসের এই প্রাদুর্ভাবের সময়ে চেক প্রজাতন্ত্রে এবার সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন ভিয়েতনামি বংশোদ্ভূত নাগরিকেরা। অ্যামি লুয়ং বলেন, আমাদের সেচ্ছাসেবকেরা এই কঠিন সময়ে দেশটিকে সাহায্য করা নিজেদের দায়িত্ব মনে করছে। এই ভেবেই তাঁরা কাজ করে যাচ্ছে। তাঁরা চেক প্রজাতন্ত্রকে তাঁদের দ্বিতীয় বাড়ি বা দেশ মনে করে। আর সেই দেশে সাহায্য দরকার, তাই তাঁরা এই সময়ে বসে নেই। এটা কিন্তু কেবল অর্থ বা জাতীয়তার ব্যাপার নয়। তাঁরা কেউই চেক প্রজাতন্ত্র ও ভিয়েতনামের মধ্যে কোনো বৈষম্য করে না। তাঁরা শুধু এটা জানে যে, এই মুহূর্তে মাস্কের জরুরি প্রয়োজন। তাই তাঁরা মাস্ক তৈরির কাজ করে যাচ্ছে।

ভিয়েতনামের নাগরিক ট্রান ভ্যান সাং একজন সামাজিক উদ্যোক্তা। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেও তিনি বেশ জনপ্রিয়। তিনি তাঁর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভিয়েতনামের কমিউনিটির জন্য নিজ দেশের ভাষায় চেক প্রজাতন্ত্রের রাজনীতি ও বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরেন। সবাইকে সচেতন করেন। তাঁর ফেসবুক পেজে ফলোয়ারের সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। তিনি বলেন, তিনি মূলত চেক প্রজাতন্ত্রে বাস করা ভিয়েতনামের নাগরিকদের জন্য সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে পোস্ট করেন, যাতে তারা উপকৃত হয়।

ট্রান ভ্যান সাং আরও বলেন, যখন ভিয়েতনামের নাগরিকেরা চেক প্রজাতন্ত্রের জন্য মাস্ক তৈরি শুরু করল, তখন আমার ভিয়েতনামি ফলোয়ারেরা দেশটির জন্য আরও বেশি কিছু করার কথা বলেন। এর পরেই আমরা দেশটিতে এই সময়ে জরুরি কাজে নিয়োজিত কর্মীদের জন্য বিনা মূল্যে স্ন্যাকস বিতরণ কার্যক্রম শুরু করি।

এ ছাড়া ট্রান ভ্যান সাংয়ের উদ্যোগে চেক প্রজাতন্ত্রে ভিয়েতনামের নিত্য প্রয়োজনীয় দোকানে পুলিশ, অগ্নিনির্বাপন কর্মী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বিনামূল্যে পণ্য সরবরাহ করা হয়। ওই সব দোকানে ছোট হৃদয় আকৃতির চিহ্ন দিয়ে এখন লেখা রয়েছে 'দ্য ভিয়েতনামিজ হেল্প'। এই নামে ভ্যান সাং ফেসবুকে নিয়মিত পোস্টও দিচ্ছেন। চেক প্রজাতন্ত্রের নাগরিকেরাও তাঁদের নিজেদের দেশের মানুষকে এসব কাজে উদ্বুদ্ধ করতে বলছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে চেক প্রজাতন্ত্রের একজন অগ্নিনির্বাপক কর্মী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের খাদ্য সংগ্রহ করা অনেক কঠিন ব্যাপার। আর সেই কাজটিই করছেন ভিয়েতনামের নাগরিকেরা। এতে আমরা যারপরনাই আনন্দিত।
চেক স্বেচ্ছাসেবক আন্তোনিন নেভোলে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেছেন। এ ছাড়া প্রায় পাঁচ হাজার হার্ট শেপ স্টিকার প্রিন্ট করে চেক রেস্টুরেন্টগুলোতে বিতরণ করেছেন। যেন তাঁরাও ভিয়েতনামের নাগরিকদের মতো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। এ বিষয়ে ট্রান ভ্যান সাং বলেন, এতে আমি আনন্দিত। কারণ এই উদ্যোগ এখন পুরো চেক প্রজাতন্ত্রেই ছড়িয়ে পড়ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ছাড়া চেক প্রজাতন্ত্রের হাসপাতাল, স্কুল ও সিটি কাউন্সিলেও ভিয়েতনামের কমিউনিটি মোটা অঙ্কের অর্থ সহায়তাও করছে। 

বিজ্ঞাপন
ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন