বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

তবে এ আলোচনা যুদ্ধ বন্ধে ফল বয়ে আনবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান বিশ্লেষকেরা। রাশিয়ার পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক আন্দ্রেই কোরতুনোভ মনে করেন, এখানে সমঝোতায় পৌঁছানো খুবই কঠিন। কারণ, কোনো ঘোষণা দেওয়ার জন্য পুতিনকে কিছু পেতে হবে। তিনি পরাজয় মেনে নিতে পারেন না, রাজনৈতিকভাবে সেটা তাঁর জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হবে। জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল বা চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এই সংকটের সমাধানে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে পারেন।

সংকট সমাধানে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি সরাসরি আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধের এটাই একমাত্র পথ। রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে পশ্চিমাদের কাছে জঙ্গি বিমান চেয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট।

অন্যদিকে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেছেন, ইউক্রেনে অভিযান পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে। ইউক্রেনকে নিরস্ত্রীকরণ ও জোটনিরপেক্ষ অবস্থান নিশ্চিত করার যে লক্ষ্য নিয়ে অভিযান চলছে, তা অর্জিত হবে।

মারিওপোলে মানবিক সংকট

আজভ সাগর-তীরবর্তী ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মারিওপোলে টানা তিন দিন অবিরাম ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলা নিক্ষেপ করছেন রুশ সেনারা। চার লাখ মানুষের এই শহর এখন পানি, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট-সংযোগ বিচ্ছিন্ন। শহরের কেন্দ্রে একটি ভবনে দাদা-দাদির সঙ্গে আশ্রয় নিয়েছেন তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা ম্যাক্সিম (২৭)। তিনি গতকাল বলেন, ‘সকাল ছয়টা থেকে আবার গোলা নিক্ষেপ শুরু হয়েছে। চারদিক থেকে বিস্ফোরণের শব্দ আসছে।’ তিনি জানান, দুই দিন ধরে তাঁদের পানি, বিদ্যুৎ এবং শীত নিবারণে ঘর উষ্ণ করার ব্যবস্থা নেই। স্থানীয় প্রশাসন নগরবাসীকে রুটি ও পানি সরবরাহ করছে। কিন্তু তা-ও এখন শেষ হয়ে গেছে।

গতকাল রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় মারিওপোলের সাধারণ নাগরিকদের উদ্দেশে ‘গ্রিন করিডর’ দিয়ে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে। তবে শহরের মেয়র বলছেন, ‘এটা এখন অসম্ভব। অনবরত গোলা নিক্ষেপ করা হচ্ছে। আমরা রাস্তা ও অ্যাপার্টমেন্টগুলো থেকে আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার পর্যন্ত করতে পারছি না।’

বন্দরনগরী মারিওপোল রুশ বাহিনীর জন্য কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই শহর নিয়ন্ত্রণে নিতে পারলে ২০১৪ সালে রাশিয়ার দখলে যাওয়া ক্রিমিয়া অঞ্চলের সেনাদের সঙ্গে পূর্বাঞ্চলীয় রুশপন্থী যোদ্ধারা লড়াইয়ে যোগ দিতে পারবেন।

আরও হামলা

স্থানীয় সময় বুধবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে অন্তত চারটি শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে। তবে হামলার লক্ষ্য কী ছিল বা এতে কতজন হতাহত হয়েছেন, তা জানা যায়নি। পশ্চিমা গোয়েন্দাদের তথ্যমতে, রাশিয়ার বিশাল সেনাবহর কিয়েভের কাছে চলে এসেছে। সম্ভাব্য আক্রমণের শঙ্কায় কিয়েভ ছাড়তে চাওয়া মানুষের মরিয়া চেষ্টা আরও তীব্রতর হচ্ছে।

হামলা থেকে বাঁচতে কিয়েভের বাসিন্দাদের রাত কাটছে নিজেদের ভবনের মাটির নিচের তলা (বেসমেন্ট) অথবা পাতালরেলের সুরক্ষাকেন্দ্রগুলোতে। রাতে ভূগর্ভস্থ দুই তলা বাংকারেও বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে আসছে বলে বিবিসির সাংবাদিকেরা জানিয়েছেন।

ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর খারকিভেও রুশ বাহিনীর হামলা অব্যাহত রয়েছে। গতকাল শহরটির তিনটি স্কুল ও একটি গির্জায় হামলা করা হয়। হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে সিটি কাউন্সিল ভবনের আশপাশের বেশ কয়েকটি দোকানও। ওই অঞ্চলের আরেক শহর ওখতিরকায় রুশ বাহিনীর গোলা হামলায় বেশ কয়েকটি ভবন ধ্বংস হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

হামলা করা হয়েছে ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চলীয় শহর চেরনিহিভেও। সেখানে দুটি স্কুল ও কয়েকটি ভবনে বিমান থেকে বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে। হামলায় অন্তত ২২ জন নিহত হয়েছেন বলে আঞ্চলিক গভর্নর ভিয়াচেস্লাভ চাউস জানিয়েছেন।

রুশ সেনাদের অধীনে নতুন নিয়ম

ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগর খেরসন এখন পুরোপুরি রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। সেখানে বাসিন্দাদের জন্য নতুন নিয়ম চালু করা হয়েছে। নিনা (ছদ্মনাম) নামের একজন গতকাল বলেছেন, শহর এখন শান্ত। গতকাল কেউ ঘর থেকে বের হননি। তবে আজকে খাবার কিনতে অনেকেই বের হচ্ছেন। নগরবাসীকে কিছু বিষয় মেনে চলতে হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁদের আলোচনায় একটি বিষয় ঠিক হয়েছে যে আমরা কেউ রাশিয়ার সেনাদের উসকানি দেব না। আমরা একসঙ্গে জমায়েত হতে পারব না। দ্রুত গাড়ি চালানো যাবে না। রুশ সেনারা থামালে সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দেওয়া এবং গাড়িতে কী আছে, তা দেখানোর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’

হতাহত

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি হামলা শুরুর পর রাশিয়ার ৯ হাজার সেনা নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। এ ছাড়া রুশ বাহিনীর ২১৭টি ট্যাংক, ৯০টি কামান, ৩১টি হেলিকপ্টার এবং ৩০টি জঙ্গি বিমান ও অন্যান্য এয়ারক্রাফট ধ্বংস করার দাবি করেছে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী। অন্যদিকে ইউক্রেনের ২ হাজার ৮৭০ জন সেনা ও ‘জাতীয়তাবাদীকে’ হত্যার দাবি করেছে রাশিয়া। যুদ্ধে তাদের ৪৯৮ সেনা নিহত হওয়ার কথাও স্বীকার করেছে দেশটি। এদিকে কিয়েভসহ দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে লড়াইয়ে আহত রুশ সেনাদের বেলারুশের ইউক্রেন সীমান্তবর্তী এলাকার হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।

ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন