দুই তরুণ-তরুণী যেভাবে বেঁচে গেলেন

১৬ মার্চ রাশিয়ার বোমা হামলায় মারিউপোলের থিয়েটার ভবনটি ধ্বংস হয়ে গেছে।
ছবি: রয়টার্স

ইউক্রেনের বন্দরনগরী মারিউপোলে যখন রাশিয়ার বোমা হামলা শুরু হয়েছিল, তখন নারী, শিশুসহ হাজারো মানুষ যে যেখানে পেরেছে লুকানোর চেষ্টা করেছে। সবচেয়ে বেশি মানুষ লুকিয়ে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন আমলের একটি থিয়েটার ভবনে। কিন্তু রাশিয়ার হামলায় শেষ রক্ষা হয়নি। ১৬ মার্চের হামলায় ভবনটি দুই ভাগ হয়ে পুরোটাই ধ্বংস হয়ে গেছে। এই ভবনে আশ্রয় নেওয়া ঠিক কতজনের মৃত্যু হয়েছে সেই হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। কিন্তু এই বোমার আঘাত আর ভবনের ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসা দুই তরুণ-তরুণী বিবিসিকে জানিয়েছেন সেই লোমহর্ষক কাহিনি।

মারিয়া রেডিওনোভা পেশায় একজন স্কুলশিক্ষক। যুদ্ধ শুরুর পর নিজের ১০ তলার অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে দুটি পোষা কুকুর নিয়ে মারিউপোল থিয়েটারে আশ্রয় নেন। ভবনটির পেছনের একটি মিলনায়তনে মঞ্চের পাশেই তিনি ক্যাম্প করেন।

আরও পড়ুন

মারিয়া বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রতিদিন সকালেই রাশিয়ার বিমান আকাশে মহড়া দেয়। সেদিনও দিচ্ছিল। সকালে পানি না খাওয়ায়, সকাল ১০টার দিকে কুকুর দুটিকে লাগেজের সঙ্গে নিয়ে তিনি থিয়েটার ভবনের সামনের ফটকের দিকে যাচ্ছিলেন। সেখানে গরম পানি নেওয়ার জন্য দীর্ঘ সারি লেগেছিল। আর ঠিক তখনই বোমার বিস্ফোরণ হয়। প্রথমে জোরে হাততালির শব্দ মনে হয়েছিল। তারপর কাচ ভাঙার শব্দ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক ব্যক্তি পেছন থেকে এসে তাঁকে দেয়ালের সঙ্গে ঠেসে ধরে নিজের শরীর দিয়ে আগলে রাখেন। বিস্ফোরণের শব্দ এতটাই বিকট ছিল যে মারিয়া এক কানে খুব ব্যথা অনুভব করছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল, ওই কানের পর্দা ফেটে গেছে। চারদিকে কেবল মানুষের চিৎকার আর বাঁচার আহাজারি।

আগুন জ্বলছে মারিউপোলের থিয়েটার ভবনে।
ছবি: এএফপি

বিস্ফোরণে এক লোক ছিটকে ভবনের জানালার কাছে পড়ে যান। জানালার ভাঙা কাচে তাঁর মুখ ঢেকে যায়। পাশে এক নারী মাথায় আঘাত নিয়ে ওই ব্যক্তিকে সাহায্য করার চেষ্টা করছিলেন। মারিয়া রেডিওনোভা ইউক্রেন রেডক্রসের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে মারিউপোলে কাজ করছেন। তাই তিনি ঝুঁকির বিষয়টি জেনে চিৎকার করে ওই নারীকে থামতে বলেন।

মারিয়া বলেন, ‘তাঁকে ধরো না, অপেক্ষা করো। আমার প্রাথমিক চিকিৎসার কিট নিয়ে তোমাদের দুজনকেই সাহায্য করব।’ কিন্তু মারিয়া দেখেন তিনি প্রাথমিক চিকিৎসার কিট সঙ্গে আনেননি। সেগুলো থিয়েটারের ভেতরেই থেকে গেছে। থিয়েটারের যে অংশে তাঁর জিনিস রাখা আছে, সেই অংশটি ইতিমধ্যে বিস্ফোরণে ধসে গেছে। সেখানে ঢোকা আর কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

মারিয়া বলেন, ‘আমি কিছুই করতে পারলাম না। দুই ঘণ্টা সেখানে হতবাক হয়ে বসে থাকলাম।’

ভ্লাদিস্লাভ নামের ২৭ বছর বয়সী এক তরুণও সেদিন ওই থিয়েটার ভবনে ছিলেন। নিজের পুরো নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভ্লাদিস্লাভ পেশায় একজন তালা-চাবি মেরামতকারী। ওই দিন সকালে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে তিনি থিয়েটার ভবনে গিয়েছিলেন। তিনি যখন মূল ফটকের কাছে পৌঁছান, ঠিক তখনই বিস্ফোরণ ঘটে। প্রাণ বাঁচাতে অন্যদের সঙ্গে তিনি ভবনের বেসমেন্টের দিকে দৌড়ে যান। এর ১০ মিনিটের মধ্যে তিনি জানতে পারেন, পুরো ভবনে আগুন লেগেছে। চারদিকে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়ে গেছে।

ভ্লাদিস্লাভ বলেন, সেখানে ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। অসংখ্য মানুষ রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। কারও কারও শরীরের নানা অংশ উড়ে গিয়েছিল। একজন মা ধ্বংসস্তূপের মাঝে তাঁর সন্তানদের খোঁজ করছিলেন। এমন সময় পাঁচ বছর বয়সী এক শিশু চিৎকার করে বলে ওঠে, ‘আমি মরতে চাই না।’ছোট্ট ওই শিশুর চিৎকার ছিল হৃদয়বিদারক।

বোমা হামলার পর মারিউপোলের থিয়েটার ভবনের ধ্বংসস্তূপ।
ছবি: রয়টার্স

লন্ডনভিত্তিক ম্যাকেঞ্জি ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস বলছে, রাশিয়া মারিউপোল থিয়েটারকে লক্ষ্য করে লেজার গাইডেড বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। এটা সম্ভবত কেএবি-৫০০এল বা এ ধরনের কোনো বোমা বিমান থেকে ফেলা হয়েছে। বিস্ফোরণের ধরন ইঙ্গিত দেয়, বোমাটি একটি তাৎক্ষণিক ফিউজ দিয়ে সজ্জিত ছিল, তাই ভবনের নিচতলায় প্রবেশ করতে পারেনি। নিচতলা অনেকটাই নিরাপদ ছিল।

মার্কিন প্রতিষ্ঠান ম্যাক্সার স্যাটেলাইট দৃশ্য প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা গেছে, বোমা হামলার আগের দিন থিয়েটার ভবনের সামনের লনের দিকে রাশিয়ান ভাষায় ‘চিলড্রেন’ শব্দটি লেখা ছিল, যাতে বিমান থেকে বোমা ফেলার স্থানটি খুব সহজেই বোঝা যায়। তবে হামলার বিষয়টি অস্বীকার করেছে রাশিয়া।

ছবি: বিবিসি থেকে নেওয়া

মারিউপোলের অনুসন্ধানী সাংবাদিক আন্দ্রেই মারুসভ। বোমা বিস্ফোরণের দুই দিন আগে তিনি থিয়েটার ভবনে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, সেখানে নারী ও শিশু আশ্রয় নিয়েছিল বেশি। আর সেখানে সাধারণ নাগরিক ছাড়া কেউ ছিল না। ঘটনার দিন সকালে থিয়েটার ভবনের ছাদে উঠেছিলেন আন্দ্রেই। সেখানে তিনি দেখেন, রাশিয়ার বিমানগুলো থিয়েটার ভবনের চারদিকে মহড়া দিচ্ছে।

বোমা ওপর থেকে পড়ে নিচতলায় খুব একটা আসতে পারেনি বলে নিচে থাকা কয়েকজন প্রাণে বেঁচে গেছেন। সেই কয়েকজনের মধ্যে ছিলেন মারিয়া রেডিওনোভা ও ভ্লাদিস্লাভ।

এই ভবনে নারী ও শিশু আশ্রয় নিয়েছিল বেশি।
ছবি: রয়টার্স

মারিয়া রেডিওনোভা বলেন, বিস্ফোরণের পর তিনি তাঁর পোষা কুকুর হারিয়ে ফেলেছেন। আর বেঁচে থাকা, আহত হওয়া সবাই ভবনের নিচ থেকে স্রোতের মতো ছুটছেন নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে। সবার মতো তিনিও নিরুপায় হয়ে নিরুদ্দেশের দিকে ছুটে গেছেন।