default-image

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তি। তিনি দেশের সর্বেসর্বা, একক কর্তৃত্বের অধিকারী। কিন্তু এই মহাপ্রতাপশালী ব্যক্তিও অন্তত একজনকে ভয় পান। ভাবছেন, তিনি কে?

বছর সাতেক আগে এই প্রশ্নের উত্তর আসে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল পত্রিকায়। পত্রিকাটিতে বলা হয়, পুতিন সবচেয়ে বেশি ভয় পান যে ব্যক্তিকে, তিনি হলেন অ্যালেক্সি নাভালনি।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল পত্রিকায় যখন এভাবে নাভালনিকে চিত্রায়িত করা হয়, তখন তাঁর বয়স মাত্র ৩৭। এখন তিনি ৪৪।

নাভালনি সম্পর্কিত এই ‘তকমা’ অনেকের কাছে অতিশয়োক্তি মনে হতে পারে। কিন্তু সম্প্রতি তাঁকে ফের জেলে পোরা থেকে শুরু করে সার্বিক দিক ও ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে এই তকমার ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়।

বিজ্ঞাপন
default-image

প্রমাণ খুঁজতে বেশি দূরে যেতে হবে না। গত বছরের আগস্টের ঘটনাটাই তো একটা জলজ্যান্ত প্রমাণ। সাইবেরিয়ার টমসক শহর থেকে উড়োজাহাজে করে মস্কোয় ফিরছিলেন নাভালনি। যাত্রাপথে উড়োজাহাজেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে বহনকারী উড়োজাহাজ সাইবেরিয়ার ওমস্কে জরুরি অবতরণ করে। সেখানকার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয় তাঁকে।

নাভালনির অসুস্থতা এমন গুরুতর ছিল যে তিনি কোমায় চলে যান। পরে তাঁকে চিকিৎসার জন্য জার্মানির বার্লিনে নেওয়া হয়। সেখানে তিনি ধীরে ধীরে সেরে ওঠেন।

বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভিত্তিতে গত সেপ্টেম্বরে জার্মানি জানায়, নাভালনিকে রাশিয়ান নার্ভ এজেন্ট ‘নোভিচক’ প্রয়োগ করা হয়েছিল। রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগের জন্য সরাসরি পুতিনকে দায়ী করেন নাভালনি। পুতিন এই অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বানে ক্রেমলিন কর্ণপাত করেনি।

নাভালনির ওপর হামলা নতুন নয়। গত আগস্টের আগে একাধিকবার তাঁকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়। তবে সবশেষ হামলাটি ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর। তিনি অনেকটা মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরেছেন।

জীবন ফিরে পেলেও নাভালনি আর রাশিয়ায় ফেরত আসুক, তা কোনোমতেই চায়নি ক্রেমলিন। তাই রাশিয়ার কর্তৃপক্ষ আগেভাগেই হুমকি জারি করে। মস্কোয় ফিরলেই নাভালনিকে জেলে যেতে হবে।

default-image

ক্রেমলিনের হুমকি, রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ১৭ জানুয়ারি দেশে ফেরেন নাভালনি। বিমানবন্দরেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে আদালত বসিয়ে তাঁকে ৩০ দিনের আটকাদেশ দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।

কারাবন্দী নাভালনি আরও বেশি শক্তিশালী। তাঁর ডাকে, তাঁর মুক্তির দাবিতে হাজারো মানুষ রাশিয়ার রাজপথে নেমে আসে। রাজধানী মস্কোসহ দেশটির অন্তত ১০০টি শহর-নগরে বিক্ষোভে শামিল হয় হাজারো মানুষ। সাম্প্রতিক সময়ে পুতিনবিরোধী এত বড় বিক্ষোভ কর্মসূচি দেখেনি রাশিয়া। বিক্ষোভ দমাতে বেপরোয়া কৌশল নেয় ক্রেমলিন। চলে বেধড়ক মারধর। গণহারে ধরপাকড়। সাম্প্রতিক সময়ে পুতিনবিরোধী এত বড় কর্মসূচি দেখেনি রাশিয়া।

পুতিন অনেক আগে থেকেই জানেন, নাভালনি তাঁর গলার কাঁটা। তাই নাভালনিকে দমন করতে মামলা-জেল-জুলুম কোনোটাই বাদ রাখেননি তিনি। এমনকি ২০১৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও তাঁকে লড়তে দেওয়া হয়নি।

নাভালনিকে নিয়ে পুতিনের এত ভয় কেন?

বিজ্ঞাপন
default-image

বয়সে নাভালনি অনেক ছোট হলেও তিনি পুতিনের জন্য বড় রাজনৈতিক হুমকি। নাভালনি হুট করে উড়ে এসে জুড়ে বসা রাজনীতিবিদ নন। তিনি তরুণ বয়স থেকেই রাজনীতিতে যুক্ত। করেছেন যুব আন্দোলন।

নাভালনি এক দশকের বেশি সময় ধরে রাশিয়ায় তাঁর রাজনৈতিক সমর্থনের ভিত গড়েছেন। তাঁর এই রাজনৈতিক ভিত তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি দুর্নীতিবিরোধী প্রচারাভিযানের মাধ্যমে তিনি এই ভিত গড়তে সক্ষম হয়েছেন।

নাভালনি একজন আইনজীবী। পেশাগত এই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব হন। ২০০৭ সালে দুর্নীতিবিরোধী প্রচার শুরু করেন নাভালনি। শুধু তা-ই নয়, তিনি দুর্নীতির মুখোশও উন্মোচন করেন। এই কাজের মধ্য দিয়ে তিনি রাশিয়ার মধ্যবিত্ত ও তরুণদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে নাভালনি ব্লগ লিখতে শুরু করেন। তাঁর ব্লগ সাধারণ মানুষের মধ্যে দারুণ সাড়া ফেলে। একই সঙ্গে অস্বস্তি তৈরি করে ক্ষমতার কেন্দ্রে। বিবিসি বলছে, ২০০৮ সাল থেকে রাশিয়ার রাজনীতিতে একটি শক্তি হিসেবে নাভালনি উত্থান। সামাজিক মাধ্যমে তাঁর লাখো অনুসারী আছে। তারা প্রধানত তরুণ। এই অনুসারীরা তাঁর শক্তির অন্যতম উৎস।

default-image

রুশ অর্থনীতিবিদ সার্গেই গুরিয়েভ মনে করেন, নাভালনিকে নিয়ে ক্রেমলিনের ভয়ের কারণ দুটি। প্রথমত, তিনি অনেক বছর ধরে সরকারি দুর্নীতি তুলে ধরছেন। তাঁর এই কার্যক্রমের মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়ছে পুতিনের জনসমর্থনের ওপর। দ্বিতীয়ত, নাভালনি রাশিয়ার বর্তমান শাসনব্যবস্থার একটি জুতসই বিকল্প।

বিরোধী নেতা নাভালনি রাশিয়ার রূপান্তরের জন্য একটি বাস্তবসম্মত ও আধুনিক পরিকল্পনা দিয়েছেন। রাশিয়ার উন্নতি-অগ্রগতি-পরিবর্তনের জন্য কী করতে হবে, তা বলেই বসে থাকেননি তিনি; একই সঙ্গে কাজগুলো কীভাবে করা হবে, তাও বাতলে দিয়েছেন নাভালনি।

সাবেক মানবাধিকার আইনজীবী ও কলাম লেখক আমন্ডা টাব মনে করেন, নাভালনি রাশিয়ার অন্য সব রাজনীতিবিদের মতো নন। তিনি অন্যদের চেয়ে ভিন্ন প্রকৃতির রাজনীতিবিদ। তিনি সত্যিকারের একজন বিরোধী নেতা, যাঁর তৃণমূলে সমর্থন রয়েছে। যাঁর দেশজুড়ে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক আছে, তাঁর কৌশল ইতিমধ্যে কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর মধ্যে আছে ক্যারিশমা। সবকিছু মিলিয়ে পুতিনের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভীতির কারণ হয়ে উঠেছেন নাভালনি।

ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন