ফিনল্যান্ডের মতো রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে ইউক্রেনেরও। রাশিয়া হামলা শুরুর পর দেশটিকে নানাভাবে সহায়তা করেছে ন্যাটো। তবে ইউক্রেন ন্যাটোভুক্ত না হওয়ায় দেশটিতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেনি জোটটি।
ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযানের পর ন্যাটো জোটের বাইরে থাকার সমস্যাগুলো সামনে এসেছে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। যুক্তরাজ্যের আবেরিস্টইউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউরোপীয় নিরাপত্তাবিষয়ক শিক্ষক আলিস্টার শেফার্ড বলেন, ফিনল্যান্ড ও সুইডেনকে ন্যাটোর পূর্ণ সদস্যপদের জন্য আবেদন করার কাছাকাছি নিতে মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছে ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযান।

রাশিয়ার অভিযান সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের রাজনীতিকদের বক্তব্যে নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন এনেছে। এ ছাড়া দেশ দুটির জনমতেও বদল এসেছে বলে মনে করেন আবেরিস্টইউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক।

গত শতকে যুক্তরাষ্ট্র ও তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধের সময় সুইডেন ও ফিনল্যান্ডকে জোটনিরপেক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। বিশ্লেষকেরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই দেশই নিরাপত্তা নীতিতে ঐতিহাসিক পরিবর্তন আনার দিকে হাঁটছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

আলিস্টার শেফার্ড বলেন, সুইডেনের নিরপেক্ষতা দেশটির পরিচয়ের অংশ। তবে ফিনল্যান্ডের নিরপেক্ষতা ১৯৪৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে দেশটির বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সহায়তার চুক্তির নামে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

ন্যাটোর সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্ক

স্নায়ুযুদ্ধের পর সুইডেন ও ফিনল্যান্ড দুই দেশই ন্যাটোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। বিশেষ করে ১৯৯৪ সালে পার্টনারশিপ ফর পিস (পিএফপি) প্রোগ্রাম ও ১৯৯৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগদানের পর এই সম্পর্কের পালে আরও হাওয়া লাগে।

ফিনল্যান্ড কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ন্যাটোর সদস্যপদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। এদিকে চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে সুইডেনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এ কারণে ন্যাটোতে যোগদানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ফিনল্যান্ডের চেয়ে সুইডেন বেশি সচেতনতা অবলম্বন করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তবে ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযান শুরুর পর থেকে ন্যাটোতে যোগ দেওয়া নিয়ে ফিনল্যান্ড ও সুইডেনে জনমতে পরিবর্তন এসেছে। আলিস্টার শেফার্ডের দেওয়া হিসাব বলছে, ফিনল্যান্ডের ৫৩ শতাংশ ও সুইডেনের ৪১ শতাংশ মানুষ ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার পক্ষে ছিল বলে জরিপে দেখা যায়। তবে সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, সুইডেনে ন্যাটোতে যোগদানের পক্ষে জনমত ৫০ শতাংশের বেশি হয়েছে। আর ফিনল্যান্ডে এই হার এখন ৬৮।

এদিকে ন্যাটোতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ না দিলেও অনেক আগে থেকেই জোটটির সঙ্গে কাজ করছে ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের সেনাবাহিনী। আফগানিস্তানের ন্যাটোর নেতৃত্বাধীন অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন দেশ দুটির সেনাসদস্যরা। দুই দেশই সামরিক সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের বিষয়ে ২০১৫ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ কারছে।

‘এ বছরই ন্যাটোতে যোগ দিতে পারে ফিনল্যান্ড ও সুইডেন’

দুটি বিষয়ের ওপর ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের ন্যাটোতে যোগদান নির্ভর করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। প্রথমটি হলো দুই দেশের সরকারকে এ বিষয়ে অনুমোদন দিতে হবে।

এ বিষয়ে একাত্মতা প্রকাশ করে ইউনিভার্সিটি অব ওয়াটারল্যুর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সহকারী অধ্যাপক আলেক্সান্দার লানোসজকা বলেন, ন্যাটোতে যোগদানের আবেদনের আগে দেশগুলোর পার্লামেন্টে এ বিষয়ে অনুমোদন নিতে হবে। মনে হচ্ছে ফিনল্যান্ড ও সুইডেন সরকার এ নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে।

দ্বিতীয় বিষয়টি হলো নতুন সদস্য নিতে ন্যাটোর অনুমোদন। ন্যাটোতে ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের যোগদানকে সমর্থন জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও পোল্যান্ডের মতো প্রধান সদস্যদেশগুলো। এখন পর্যন্ত জোটটির কোনো সদস্যদেশ এর বিরোধিতা করেনি। ন্যাটোতে নতুন কোনো সদস্য নিতে হলে জোটটির ৩০ সদস্যের সবার অনুমোদন লাগে।

যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসেল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক রাজনীতির জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ক্যাথারিন এ এম রাইট বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মুখে নিজেদের ঐক্য ও শক্তি প্রদর্শনের জন্য ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের ন্যাটোতে যোগদানের আবেদন শিগগিরই অনুমোদন দেওয়া হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। চলতি বছরেই এ অনুমোদন দেওয়া হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন ক্যাথারিন।

খুশি নয় রাশিয়া

এদিনে সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের ন্যাটোতে যোগদানের আগ্রহে খুশি না রাশিয়া। এ নিয়ে নানা হুঁশিয়ারি, এমনকি ন্যাটোর বিরুদ্ধে হুমকিও এসেছে মস্কো থেকে। সুইডেন ও ফিনল্যান্ড ন্যাটোতে যোগ দিলে এই অঞ্চলে রাশিয়ার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করা হবে বলে জানানো হয়েছে। এর অংশ হিসেবে দেশ দুটিকে লক্ষ্য করে সীমান্তে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে মস্কো।

ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন