পশ্চিমা সমরবিশারদেরা বলছেন, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর সুনাম নষ্ট হয়েছে। দেশটির সেনারা এখন নিষ্ঠুরতার দিকে এগোচ্ছেন। ইউক্রেন অভিযানের দায়িত্ব নতুন করে রুশ জেনারেল আলেকসান্দ্র ডোরনিকভকে দেওয়া হয়েছে।

চেচনিয়া ও সিরিয়া যুদ্ধে নৃশংসতা চালানোর জন্য এই সেনা কর্মকর্তার দুর্নাম রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়ার হামলা মোকাবিলার জন্য ইউক্রেনের বিপুল পরিমাণ ভারী অস্ত্রশস্ত্রের প্রয়োজন পড়বে।

ইউক্রেনের যেসব অস্ত্র দরকার, আর তারা যা পাচ্ছে

প্রায় দুই মাস ধরে ইউক্রেনে চলছে রুশ হামলা। আগামী দিনগুলোতেও তীব্র হামলার আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইউক্রেনের ভারী অস্ত্রের প্রয়োজন পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা। এসব সমরাস্ত্রের শীর্ষে রয়েছে যুদ্ধবিমান। তবে ইউক্রেনকে যুদ্ধবিমান সরবরাহ করতে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র।

পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর কাছে সুখোই ও মিগ যুদ্ধবিমান রয়েছে। এই বিমানগুলো চালানোয় দক্ষ ইউক্রেনের পাইলটেরা। বিমানগুলো ইউক্রেনে পাঠানোর জন্য ওই দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। তবে শেষ পর্যন্ত ওই চেষ্টা আলোর মুখ দেখেনি।

এর কারণও আছে। রাশিয়ার প্রতিবেশী ওই দেশগুলো, এমনকি পশ্চিমারাও চায় না যুদ্ধ ব্যাপক আকার নিক। যুদ্ধে সরাসরি নিজেদের জড়াতে চায় না পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোও। কারণ যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা হতে পারে আশঙ্কা করছে তারা।

ইউক্রেন এখন পর্যন্ত মিত্রদের কাছ থেকে যেসব অস্ত্র পেয়েছে সেগুলো প্রতিরক্ষামূলক। দেশটিকে এস-৩০০ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পাঠিয়েছে স্লোভাকিয়া। ফলে হামলা চালানোর জন্য রাশিয়ার যুদ্ধবিমানগুলোকে এস-৩০০-এর রাডারের আওতার নিচ দিয়ে ভূমির কাছাকাছি চলাচল করতে হচ্ছে।

এর ফলে স্বল্পপাল্লার কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে রুশ যুদ্ধবিমানগুলো। ইউক্রেনকে ‘স্কাইস্ট্রেক’ নামে এই ধরনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দিয়ে সহায়তা করেছে যুক্তরাজ্য। একই কাজে ব্যবহৃত ‘স্টিংগার’ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

কাঁধ থেকে ছোড়া যায় এমন আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাগুলো ইউক্রেন যুদ্ধে বড় প্রভাব ফেলেছে। এগুলোর আঘাতে রাশিয়ার যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টারগুলো ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এ ছাড়া কাঁধ থেকে ক্ষেপণাত্র নিক্ষেপের ‘জ্যাভলিন’ নামের সমরাস্ত্র রাশিয়ার সাঁজোয়া যানের বহরগুলোকে চাপের মুখে ফেলেছে।

এদিকে ইউক্রেনে পাঠাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাঁধে বহনযোগ্য প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মজুত কমে আসছে। ইতিমধ্যে এ ধরনের অস্ত্রের বড় একটি অংশ ইউক্রেনে পাঠিয়েছে দেশটি। জরুরি অবস্থায় নিজ দেশের প্রতিরক্ষার জন্য এই অস্ত্রের বাদবাকি মজুত নিজেদের হাতে রাখতে চাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নীতিনির্ধারকেরা।
ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর চাহিদা পূরণে গত সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র নির্মাতাদের এ ধরনের অস্ত্র উত্পাদন বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।

ইউক্রেনকে সহায়তা করতে শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নিজেদের অস্ত্র সরবরাহ নীতিতে পরিবর্তন আনেনি। গত ছয় সপ্তাহে নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন এসেছে ইউরোপের প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত পরিকল্পনায়।

ইউক্রেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তা

ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ প্রতিরক্ষা নীতি শক্তিশালী করা হয়েছে। জোটের দেশগুলো এখন আগে চেয়ে বেশি একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করছে। এখন পর্যন্ত ইউক্রেনে ১৬০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা পাঠিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। সম্প্রতি জোটটির প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন কিয়েভ সফর করেছেন। ইউক্রেনকে ইউরোপের দেশগুলোর সমর্থনের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।

যদিও যুদ্ধ ইউক্রেনের বাইরে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখনো একটি মাত্রার মধ্যে থেকে দেশটিকে সহায়তার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সহায়তার জন্য বেছে নেওয়া হচ্ছে ভিন্ন পথও। রাশিয়ার অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘রেইনমেটাল’ ইউক্রেনে ‘লেপার্ড ২’ মডেলের প্রায় ৫০টি ট্যাংক পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে। বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠান থেকে এই সহায়তার প্রস্তাব হলেও রাশিয়া এটা ভালোভাবেই জানে, জার্মান সরকারের অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের সহায়তা সামনে এগোতে পারে না।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রায় দুই মাস ধরে লড়াই চালিয়ে যাওয়া ইউক্রেন এখন রাশিয়ার এমন হামলার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছে, যেটি চলমান যুদ্ধে একটি ফল এনে দেবে। ইউক্রেন যে অস্ত্র পাবে তার ওপর এই ফল নির্ভর করবে। তবে দেশটির বিমানবাহিনী দুর্বল হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের ফল ইউক্রেনের পক্ষে নেওয়ার জন্য দেশটির বিমানবাহিনীকে শক্তিশালী করার প্রয়োজন পড়বে।

ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন