পুতিনের বিষেই নীল নাভালনি?

বাংলা প্রবাদ আছে—বিষে বিষক্ষয়। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বাংলা জানেন বলে মনে হয় না। তবে তিনি এই প্রবাদটি অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলছেন বলেই বোধ হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আলেক্সেই নাভালনিকে বিষপ্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে ক্রেমলিনের বিরুদ্ধে। এর আগে যুক্তরাজ্যে সাবেক এক রুশ গুপ্তচরের দেহে বিষপ্রয়োগের ঘটনাতেও অভিযোগের তির গিয়েছিল একই দিকে। তবে বিষ দিয়েই শত্রুকে নিকেশ করার পরিকল্পনা নিয়েছেন পুতিন?

রাশিয়ার প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা আলেক্সেই নাভালনি গত মাস থেকে অসুস্থ। ২০ আগস্ট সাইবেরিয়া থেকে আকাশপথে মস্কো যাওয়ার পথে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে রাশিয়ায় কিছুদিন চিকিৎসার পর তাঁকে জার্মানি নিয়ে যাওয়া হয়। গতকাল বুধবার জার্মানি এক বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করেছে। বলা হচ্ছে, নাভালনির দেহে নোভিচক নামের নার্ভ এজেন্ট প্রয়োগ করা হয়েছে। জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল এই তথ্যে সত্যতা নিশ্চিত করেছেন এবং রাশিয়ার কাছে এই ঘটনার বিষয়ে জবাব চেয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় এই ঘটনা নিয়ে পুরো বিশ্বে তোলপাড় শুরু হয়েছে। পুতিনের সমালোচকেরা বলছেন, পথের কাঁটা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দূর করতেই ক্রেমলিন এই বিষপ্রয়োগ করেছে। যদিও রাশিয়া সরকারিভাবে এ ধরনের অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে।

বিষপ্রয়োগের অভিযোগ এবং তা অস্বীকারের ঘটনা রাশিয়ার জন্য নতুন নয়। ২০১৮ সালের মার্চে যুক্তরাজ্যের সলসবুরিতে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল সের্গেই স্ক্রিপালের বেলায়। স্ক্রিপাল ছিলেন একজন সাবেক রুশ গুপ্তচর। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর তাঁর বিরুদ্ধে রাশিয়ায় উঠেছিল বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ। পরে তিনি যুক্তরাজ্যে ঘাঁটি গাড়েন। বলা হয়ে থাকে, স্ক্রিপাল ছিলেন ডবল এজেন্ট। অর্থাৎ রুশ আনুগত্য অস্বীকার করে অন্য পক্ষে চলে গিয়েছিলেন তিনি। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক নিবন্ধে বলা হয়, বিশ্বাসঘাতকতার কারণে এক সময়ের সহকর্মী স্ক্রিপালের ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। আর সেই রাগই নাকি নোভিচক প্রয়োগে ইন্ধন জুগিয়েছিল। দ্য সানে প্রকাশিত সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, প্রাণে বেঁচে যাওয়া স্ক্রিপাল নাকি এখন অন্য দেশে ভিন্ন পরিচয়ে জীবনযাপন করছেন। যদিও এ ব্যাপারে যুক্তরাজ্য বা রাশিয়া কোনো সরকারই আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য দেয়নি।

বিজ্ঞাপন
default-image

প্রশ্ন হলো, কেন নোভিচকের নাম উঠলেই রাশিয়ার দিকে অভিযোগের আঙুল ওঠে? বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নোভিচক তৈরি হয়েছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে। এটি এক ধরনের রাসায়নিক অস্ত্র। প্রাণঘাতী হিসেবে সারিন গ্যাসের চেয়ে ৫ থেকে ১০ গুণ ভয়ানক এই নোভিচক। বিশেষজ্ঞের বরাত দিয়ে আল জাজিরায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নোভিচক মানুষের দেহে ঢোকার পর স্নায়ু ও পেশির মধ্যকার যোগাযোগ নষ্ট করে দিতে পারে। একই সঙ্গে মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলোর কর্মক্ষমতাও নষ্ট করে দিতে পারে। এসব কারণেই নোভিচক ভয়ংকর।

রুশ ভাষায় নোভিচক অর্থ, ‘নবাগত’। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে এই নোভিচক তৈরি করা হয়। ১৯৯০-এর দশকে ভিল মিরজায়ানভ নামের একজন রুশ গবেষক নোভিচক-বৃত্তান্ত গণমাধ্যমে প্রকাশ করে দিয়েছিলেন। এ সম্পর্কে অনেক আগ থেকে জানা গেলেও, কোনো মানুষের দেহে নোভিচক প্রয়োগের দৃষ্টান্ত সামনে আসে মাত্র ২ বছর আগে—স্ক্রিপাল কাণ্ডে।

১৯৯৭ সালে হওয়া রাসায়নিক অস্ত্র সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী কোনো রাসায়নিক বস্তুকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই চুক্তিতে সাক্ষর করেছে মস্কোও। তাই এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে বরাবরই অস্বীকারের নীতি অবলম্বন করে চলে রাশিয়া। তবে বিশ্লেষকদের দাবি, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকেই নোভিচকের উত্তরাধিকার পেয়েছে রুশ সরকার এবং বর্তমানেও নোভিচক উৎপাদনের সক্ষমতা তাদের রয়েছে। ২০১৪ সালে নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভ নামের একটি নিরপেক্ষ গোষ্ঠীর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে, রাশিয়ার হাতে এখনো হাজার হাজার টন নোভিচক রয়েছে এবং এগুলো অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত। নোভিচক মূলত কৃষিকাজে ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে তৈরি করা যায় এবং যেকোনো বাণিজ্যিক কারখানার আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে এর উৎপাদনও সম্ভব।

default-image

অর্থাৎ, ফেসবুকের সঙ্গে যেমন অঙ্গাঙ্গিভাবে মার্ক জাকারবার্গের নাম জড়িয়ে থাকে, ঠিক তেমনি নোভিচকের নাম উঠলেই এসে যায় রাশিয়ার নাম। সের্গেই স্ক্রিপালের ক্ষেত্রে অবশ্য রাশিয়া স্রেফ উড়িয়ে দিয়েছিল সব অভিযোগ। আলেক্সেই নাভালনির ঘটনাতেও একই কৌশল নিয়েছে পুতিনের সরকার। শুরু থেকেই বিষপ্রয়োগের অভিযোগ অস্বীকার করা হচ্ছে। নোভিচকের বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি রুশ কর্তৃপক্ষ। তবে নাভালনি অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই পুতিনের সরকার একে গুরুত্ব দিতে নারাজ। এ বিষয়ে তদন্তের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে সম্প্রতি পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, এর সঙ্গে ক্রেমলিনের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই এবং এর তদন্ত করার কোনো কারণ নেই। এমনকি এই বক্তব্য দেওয়ার সময় নাভালনির নাম উচ্চারণেও অনীহা ছিল পেসকভের। নাভালনিকে ‘ওই রোগী’ হিসেবে সম্বোধন করেছিলেন তিনি।

নাভালনির নাম উচ্চারণে অনীহা আছে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনেরও। গত কয়েক বছরে প্রকাশ্যে কখনোই আলেক্সেই নাভালনির কথা মুখে আনেননি কেজিবির এই সাবেক কর্মকর্তা। অথচ পুতিনের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এই নাভালনি।

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, পুতিন রাশিয়ায় এমন এক সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন যেখানে ভিন্নমতের কোনো স্থান নেই। পুরো রাষ্ট্রক্ষমতা চলে গেছে অভিজাত একটি গোষ্ঠীর হাতে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পুতিনের বিরোধী হিসেবে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম ছিলেন আলেক্সেই নাভালনি। রাষ্ট্রীয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার ছিলেন, জনমত গঠন করছিলেন। ২০১১-১২ সালে রাশিয়ায় যে গণ-আন্দোলন হয়েছিল, তার পুরোধা ছিলেন নাভালনি। চলতি মাসে রাশিয়ায় আঞ্চলিক কিছু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেই নির্বাচনের কাজেই গত মাসে সাইবেরিয়া গিয়েছিলেন নাভালনি। তা ছাড়া ধারণা করা হয়, রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলে যে জনবিক্ষোভ গত কিছুদিন ধরে চলছে, তাতেও তিনি জড়িত ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

এদিকে নতুন করোনাভাইরাস মহামারির কারণে পুরো পৃথিবীর পাশাপাশি রাশিয়ার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও ঝুঁকিতে আছে। তবে এর মধ্যেই গণভোটের আয়োজন করে সংবিধান সংশোধনের বিষয়টিতে বৈধতা আদায় করে নিয়েছেন পুতিন। এর ফলে ২০৩৬ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর গদিতে থাকা পাকা। যদিও স্বাধীন জরিপকারী প্রতিষ্ঠান লেভাদা সেন্টারের মতে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুতিনের ওপর আস্থা ক্রমাগত কমছে রুশদের। এমন পরিস্থিতিতে নাভালনির ওপর ক্ষমতাসীনদের ক্ষোভ অনুমেয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ক্রেমলিনের মানবাধিকার কাউন্সিলের বহিষ্কৃত সদস্য একাতেরিনা শুলমান বলছেন, রাশিয়ায় এখন পুতিনের সরকার মনে করে, বিরোধীরা সবাই বহিঃরাষ্ট্রের প্ররোচনায় কাজ করছে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকেও বিদেশি হুমকি হিসেবে দেখা হয় এবং সেভাবেই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

নাভালনির ওপর বিষপ্রয়োগের ঘটনায় রাজনৈতিক বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান ‘আর.পলিটিক’-এর প্রতিষ্ঠাতা তাতিয়ানা স্টানোভায়া বলছেন, পুতিনের রাষ্ট্রযন্ত্র পুরোপুরি নিজস্ব যুক্তিতে চলে। আর সেই যুক্তি হলো গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির যুক্তি। কোনো বিচারেই প্রতিপক্ষের ওপর বিষপ্রয়োগ করা কোনো কার্যকর উপায় নয়। এটি পুরোপুরি মূর্খতা।

default-image

লন্ডনভিত্তিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের জ্যেষ্ঠ রিসার্চ ফেলো নিকোলাই পেতরভ মনে করেন, নাভালনিকে বিষপ্রয়োগের ঘটনায় রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের সবুজ সংকেত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি বলছি না যে, নাভালনিকে বিষপ্রয়োগের বিষয়ে পুতিন সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু রাশিয়ায় এটিও সম্ভব নয় যে, বস খুশি হবেন কিনা এবং শাস্তি দেবেন কিনা—সেই ব্যাপারে নিশ্চিত না হয়ে কেউ এ কাজ করবে।’

তবে পুরো বিষয়টি নিয়ে এখনো চুপটি করেই রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ভাবটা এমন যে, কিছুই ঘটেনি! বিশ্লেষকেরা বলছেন, স্ক্রিপালের মতো এই ক্ষেত্রেও অস্বীকার ও এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দিয়েই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে চাইছে ক্রেমলিন। কারণ রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় অভিধানে ভিন্নমতের মতো বিষপ্রয়োগ বা আলেক্সেই নাভালনি শব্দগুলোরও কোনো স্থান নেই।

ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন