মূল লড়াইয়ে যাঁরা

ফ্রান্সে এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়ছেন ১২ প্রার্থী। এর মধ্যে আটজন পুরুষ, চারজন নারী। চূড়ান্ত তালিকায় ১২ প্রার্থীর নাম থাকলেও আলোচনা হচ্ছে কয়েকজনকে নিয়ে। এর মধ্যে একজন বর্তমান প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। অন্যজন কট্টর ডানপন্থী হিসেবে পরিচিত মারিন লা পেন। মাখোঁর জন্য এবারও মারিন লা পেন প্রধান চ্যালেঞ্জ। ২০১৭ সালের নির্বাচনে মাঁখোর সঙ্গে রান-অফে ছিলেন মারিন লা পেন। সেবার অল্প ব্যবধানে জয় পান মাখোঁ।

এবারের নির্বাচনে আবার জয়ের আশা দেখছেন ২০১৭ সালের নির্বাচনে বড় কোনো দলের সমর্থন ছাড়াই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া এমানুয়েল মাখোঁ। সেবার মাখোঁর জয়ের পর তাঁর দল লা রিপাবলিক এন মারশে পার্লামেন্ট নির্বাচনেও জয় পায়। সাবেক ব্যাংকার মাখোঁ ফ্রান্সের সাবেক সমাজতন্ত্রী প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাদের সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান বলছে, এমানুয়েল মাখোঁ মধ্য-ডানপন্থার দিকে ঝুঁকছেন বলেই মনে করছেন ভোটাররা।

২০১৭ সালে ফ্রান্সের সবচেয়ে কমবয়সী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার এক বছরেও কম সময় আগে বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানাতে লা রিপাবলিকা এন মারশে নামে রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু করেন মাখোঁ। এরপর পাঁচ বছর ফ্রান্সের রাজনীতিতে আধিপত্য করে চলেছেন তিনি। তবে ৪৪ বছর বয়সী মাখোঁকে এবার কঠিন চ্যালেঞ্জই জানাচ্ছেন লা পেন।

মাখোঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ডানপন্থী প্রার্থী মারিন লা পেনের রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। তিনি এবার ন্যাশনাল র‌্যালির (সাবেক ন্যাশনাল ফ্রন্টের) প্রার্থী। এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়ছেন। মারিন লা পেনের এবার জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। অনেকে বলছেন, এবার না জিতলে ৫৩ বছর বয়সী পেনের রাজনৈতিক জীবনের এখানেই শেষ।

ফ্রান্সের এবারের নির্বাচনে বামপন্থী প্রার্থী জ্যাঁ-লুক মেলেশঁ। মাখোঁ ও লা পেনের পর তিনি আছেন লড়াইয়ে। তিনি ফ্রান্স আনবাউড দলের প্রার্থী। এর আগে তিনি ফ্রান্সের সোশ্যালিস্ট পার্টিতে ছিলেন। তবে দল ছাড়ার পর থেকে বামপন্থী বিভিন্ন পক্ষের হয়ে দাঁড়িয়েছেন। গত দুই নির্বাচনেও প্রার্থী ছিলেন তিনি। প্রতিবার ১০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছেন। ২০১৭ সালের প্রেসিডেন্টে নির্বাচনে বিরোধী সোশ্যালিস্ট পার্টির প্রার্থীর চেয়েও বেশি ভোট পেয়েছিলেন মেলেশঁ।

মধ্যপন্থী মাখোঁ, অতিডানপন্থী ম্যারি লে পেন ও অতিবামপন্থী জ্যাঁ-লুক মেলেশঁর পর আছেন ভ্যালেরি পেক্রেস। ডানপন্থী রিপাবলিকানের প্রার্থী তিনি। সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজির সময়কার বাজেট মন্ত্রী পেক্রেস এখন ইলে-ডি-ফ্রান্স অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট। এই অঞ্চলেই রয়েছে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস ও আশপাশের এলাকাগুলো। পেক্রেস নিজেকে তিন ভাগের দুই ভাগ অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেল ও বাকি এক ভাগ মার্গারেট থেচার বলে দাবি করে থাকেন।

লড়াইয়ে আরও আছেন অতিডানপন্থী হিসেবে পরিচিত এরিক জিম্যো। মারিন লা পেন ও এরিক জিম্যো দুজনই অতিডানপন্থী হলেও জিম্যো বেশি কট্টরপন্থী। টেলিভিশন পণ্ডিত হিসেবে পরিচিত জিম্যো বর্ণবাদী ঘৃণা ছড়ানোর অপরাধে দোষীও সাব্যস্ত হয়েছিলেন। মুসলিম অভিবাসীরা ইউরোপের দেশগুলো থেকে ইউরোপীয়দেরই তাড়িয়ে দেবে—এ ধরনের কথাও বলেন তিনি।

ফ্রান্সে এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দুই বামপন্থীর মধ্যে একজন হলেন ইয়ানিক জাদো। গ্রিনদের প্রার্থী তিনি। গত নির্বাচনে সোশ্যালিস্ট প্রার্থী বেনওয়াঁ আমোঁর জন্য তিনি সরে দাঁড়িয়েছিলেন।

জরিপ কী বলছে

মতামত জরিপে এখন পর্যন্ত মাখোঁ এগিয়ে থাকলেও দেখা যাচ্ছে, তিনি জিতলেও ২০১৭ সালের চেয়েও এবার ব্যবধান আরও কমবে। মারিন লা পেনের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে মাখোঁর। বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, মাঁখো যদি এবার জয়ও পান তারপরও তাঁর সরকার সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে চাপে পড়বে। কারণ, আগামী ১২ ও ১৯ জুন হবে পার্লামেন্ট নির্বাচন। পার্লামেন্ট নির্বাচনে জয় পেতে হলে মাখোঁর মধ্যপন্থী লা রিপাবলিক এন মারশের বেশ ভালোই ঘাম ছুটবে।

জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, ফ্রান্সের ভোটারদের কাছে এবারের প্রধান উদ্বেগের বিষয় জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা মুদ্রাস্ফীতি। মারিন লা পেন তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় সফলভাবে এ দুটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন। ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরুর মধ্যেই ফ্রান্সে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়েছে। জরিপে দেখা যায়, যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টা করায় প্রাথমিকভাবে প্রেসিডেন্ট মাখোঁর জনপ্রিয়তা বেড়েছিল। তবে পরে অন্য প্রার্থীদের সঙ্গে ব্যবধান কমতে থাকে।

প্রথম ধাপের ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগের জরিপে দেখা যাচ্ছে, ২০১৭ সালে যে দুই প্রার্থী রান-অফে লড়েন অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ এবং মারিন লা পেনের মধ্যে ব্যবধান আরও কমে এসেছে। তবে জরিপে এখনো মাখোঁই কিছুটা এগিয়ে। তবে মাখোঁ জিতবেন—এমন কথাও জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। অনেকে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর এই ব্যবধানকে ‘মার্জিন অব এরর’ বলছেন।

সর্বশেষ স্থানীয় সময় গত শুক্রবার একটি জরিপ করা হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, এখন পর্যন্ত এবারের নির্বাচন নিয়ে যতগুলো জনমত জরিপ হয়েছে, সবটিতে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে ব্যবধান সবচেয়ে কম। জরিপে দেখা যাচ্ছে, মারিন লা পেনের জয়ের সম্ভাবনা ৪৯ শতাংশ।

ফ্রান্সের বিএফএম টিভির ওয়েবসাইটে শুক্রবার প্রকাশিত ওই জনমত জরিপের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, ভোটের সম্ভাব্য হারের দিক থেকে আরও দুই পয়েন্ট পিছিয়েছেন মাখোঁ। ৪ ও ৫ এপ্রিলের জনমত জরিপেও দেখা যাচ্ছিল মাখোঁ ২৮ শতাংশ ভোট পাবেন। কিন্তু এখন সেটা ২৬ শতাংশে নেমেছে। অন্যদিকে মারিন লা পেন দুই পয়েন্ট এগিয়েছেন। সর্বশেষ জরিপে দেখা যাচ্ছে, তিনি ২৫ শতাংশ ভোট পেতে পারেন। এতে ভোটে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতারই আভাস মিলছে।

জরিপে অতিবামপন্থী প্রার্থী জ্যাঁ-লুক মেলেশঁও এগিয়েছেন। তৃতীয় স্থানে আছেন তিনি। সর্বশেষ ওই জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, মেলেশঁ ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট পেতে পারেন, যা এপ্রিলের শুরুর চেয়ে ২ শতাংশ বেশি। তবে জরিপের ফল বলছে, তিনি দ্বিতীয় ধাপে যেতে পারবেন না।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স, বিবিসি, এএফপি, আল-জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান