বিজ্ঞানী ওজলেম ট্রুসি  ও ইউগুর শাহিন
বিজ্ঞানী ওজলেম ট্রুসি ও ইউগুর শাহিনছবি : বায়ো এন টেকের সৌজন্যে

আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) কাছে করোনার টিকার জরুরি ব্যবহারের জন্য অনুমোদন চাইবে টিকা প্রস্তুতকারক বায়োএনটেক ও ফাইজার। গতকাল মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন  বায়োএনটেকের প্রধান নির্বাহী ইউগুর শাহিন।

শাহিন টিকা নিয়ে সুখবর দিয়ে বলেন, তিনি মনে করেন, বায়োএনটেক ও ফাইজারের টিকাটি কেবল কোভিড-১৯–এর একমাত্র টিকা নয়; বেশ কয়েকটি টিকার তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা চলছে। এখন তাদের লক্ষ্য হচ্ছে টিকাটির উৎপাদন বাড়ানো। এর অনুমোদন পেলে ২০২১ সালের শেষ নাগাদ ১৩০ কোটি ডোজ টিকা তৈরির লক্ষ্য তাঁদের।

বিজ্ঞাপন
default-image

সিএনএন এক প্রতিবেদনে বলেছে, বিজ্ঞানী ইউগুর শাহিন ও ওজলেম ট্রুসিকে বিশ্ব দীর্ঘদিন মনে রাখবে। সংক্রামক রোগ ও টিউমারের চিকিৎসাক্ষেত্রে জীবন উৎসর্গ করেছেন এ জুটি। জীবনের দীর্ঘ সময় ক্যানসার চিকিৎসাপদ্ধতি উদ্ভাবনে কাজ করেছেন দুজন। কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারির সময়ে এই দুই বিজ্ঞানীর পরিবর্তিত জেনেটিক কোডের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক উদ্ভাবন মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। বিশ্বের প্রথম কার্যকর করোনার টিকা হিসেবে যে ফাইজারের টিকাকে দাবি করা হচ্ছে, তার পেছনে রয়েছেন এই দুই বিজ্ঞানী।

২০০৮ সালে জার্মানির মেইঞ্জ শহরে শাহিন (৫৫) ও ট্রুসি (৫৩) জৈবপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বায়োএনটেক প্রতিষ্ঠা করেন। গত সোমবার প্রতিষ্ঠানটির সহযোগী মার্কিন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি ফাইজার করোনার টিকা নিয়ে সুখবর দিয়েছে। নতুন টিকা দিয়ে কোভিড-১৯ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সুরক্ষার দাবি করেছে উৎপাদনকারী দুটি প্রতিষ্ঠান। করোনাভাইরাস মহামারির শুরু থেকেই ফাইজার ও বায়োএনটেক নামের দুটি প্রতিষ্ঠান টিকা তৈরির চেষ্টা করে আসছিল। এবার প্রতিষ্ঠান দুটি জানিয়েছে, তাদের তৈরি টিকা ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর।

শাহিন ও ট্রুসি দুজনের আগ্রহ ছিল ক্যানসার গবেষণায়। তাঁদের বিয়ের দিনটিতেও গবেষণাগারে যেতে ভুলে যাননি।

বায়োএনটেক টিকা তৈরিতে যে পদ্ধতি ব্যবহার করেছে, তাকে বলে মেসেঞ্জার আরএনএ বা এমআরএনএ, যা টিকা হিসেবে শরীরে দেওয়ার পর প্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। এ টিকাপ্রযুক্তি এর আগে কখনোই অনুমোদন পায়নি। গতকাল মঙ্গলবার সাংবাদিকদের কাছে টিকা কার্যকর হওয়ার খবরটির গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং বিশ্বকে একটি আশার বার্তা পাঠান।

শাহিন বলেন, ‘আমি মনে করি, মানবজাতির জন্য ভালো বার্তাটি হলো আমরা এখন বুঝতে পারি যে একটি টিকা দিয়ে কোভিড-১৯ সংক্রমণকে প্রকৃতপক্ষে প্রতিরোধ করা যেতে পারে।’
টিকা কার্যকর প্রসঙ্গে সোমবার সিএনএনকে ফাইজারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যালবার্ট বোরলা বলেছিলেন, ‘গত ১০০ বছরের মধ্যে চিকিৎসাক্ষেত্রে বৃহত্তম অগ্রগতির ঘটনা।’

default-image

টিকাটি বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি বিশাল পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। শাহিন ও ট্রুসিকে চিকিৎসাক্ষেত্রে বিশাল এ অর্জনের জন্য সম্মান জানাচ্ছে বিশ্ব।

শাহিন ও ট্রুসি দুজনেই দক্ষ চিকিৎসক হিসেবে খ্যাতিসম্পন্ন। এর আগে তাঁরা গ্যানিমিড ফার্মাসিউটিক্যাল নামে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ২০০১ সালে দুজন ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়তে সক্ষম অ্যান্টিবডি তৈরি করেছিলেন। ২০১৬ সালে তারা ১৪০ কোটি মার্কিন ডলারে ওই কোম্পানি বিক্রি করে দেন।

শাহিন ও ট্রুসি জার্মানির শীর্ষ ১০০ ধনী ব্যক্তির কাতারে রয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির সাপ্তাহিক ওয়েল্ট অ্যাম সনট্যাগ সংবাদপত্র। গতকাল বায়োএনটেকের বাজারমূল্য ২ হাজার ৫৭২ কোটি মার্কিন ছাড়িয়ে গেছে। গত বছরে এ কোম্পানির বাজারমূল্য ছিল ৪৬০ কোটি মার্কিন ডলার।

শীর্ষ ধনীর কাতারে থাকলেও এ দম্পতির দাতব্য নীতি, একাডেমিক এবং বিজ্ঞানের প্রতি দীর্ঘকালীন প্রতিশ্রুতির কারণে পা মাটিতেই থেকেছে। কোভিড-১৯ টিকা নিয়ে তাঁদের কাজ বৈশ্বিক মঞ্চে উঠে এলেও তাঁরা কাজে মনোযোগ ধরে রেখেছেন।

গত মে মাসে এই দম্পতি সিএনএনকে বলেছিলেন, তাঁরা সমাজের জন্য কিছু করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দুই দশক ধরে তাঁরা চিকিৎসাক্ষেত্রে নতুন উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করছেন।

বিজ্ঞাপন

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, শাহীনের জন্ম তুরস্কের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত ইস্কেন্ডরুন শহরে। অবশ্য চার বছর বয়সেই জার্মানির কোলঞ্জ শহরে তাঁর পরিবার চলে আসে। সেখানে তাঁর বাবা ফোর্ডের কারখানায় কাজ করতেন। শাহিন পরে ক্যারিয়ার গঠনের সময় তুরস্কের চিকিৎসকের মেয়ে ট্রুসির সাক্ষাৎ পান। এরপর দুজনে ক্যারিয়ার গঠনের পথে এগিয়ে যান। বর্তমানে বায়োএনটেকের প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ট্রুসি।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, শাহিন ও ট্রুসি দুজনের আগ্রহ ছিল ক্যানসার গবেষণায়। তাঁদের বিয়ের দিনটিতেও গবেষণাগারে যেতে ভুলে যাননি।

মানবজাতির জন্য ভালো বার্তাটি হলো, আমরা এখন বুঝতে পারি যে একটি টিকা দিয়ে কোভিড-১৯ সংক্রমণকে প্রকৃতপক্ষে প্রতিরোধ করা যেতে পারে
ইউগুর শাহীন, সিইও, বায়ো এন টেক

এ বছরের জানুয়ারি মাসে দুজন যখন চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস সম্পর্কে জানতে পারেন, তখন শাহিন ক্যানসাররোধী এমআরএনএ–ভিত্তিক গবেষণাকে ভাইরাসজনিত গবেষণায় রূপান্তরে পদক্ষেপ নেন। বায়োএনটেক তাদের ৫০০ কর্মীকে এ গবেষণায় নিযুক্ত করে।

তাঁরা কয়েকটি সম্ভাব্য এমআরএনএ যৌগ নিয়ে কাজ শুরু করেন। তাঁরা কোভিড-১৯ টিকাটি তৈরিতে জিনগত উপাদান ব্যবহার করেন। এতে কোষে ভাইরাসের অনুরূপ একধরনের প্রোটিন তৈরি হয়। শরীরের প্রতিরোধী ব্যবস্থা এতে ভাইরাসকে চিনতে শেখে এবং আক্রমণ করে।

শাহীনকে তাঁর সহকর্মীরা বিনয়ী ও ভদ্র বলে বর্ণনা করেন। মেইঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ম্যাথিয়াস থিওব্ল্যাড তাঁর সঙ্গে দুই দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করেছেন। তিনি তাঁকে যথেষ্ট বিনয়ী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। জার্মানির ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান এমআইজি এজির সদস্য ম্যাথিয়াস ক্রোমেয়ার বলেন, বিশাল অর্জন সত্ত্বেও তাঁর মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখেননি। তিনি আগের মতোই বিনয়ী।

মন্তব্য পড়ুন 0