default-image

আফগানিস্তানের শহরটিতে তখন মধ্যরাত। একটা বাজে। সাইফুল্লাহর পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে গভীর ঘুমে বিভোর। হেলিকপ্টারের শব্দে হঠাৎ তাঁদের ঘুম ভেঙে যায়। মেগাফোনে সেনাসদস্যদের চিৎকার করে নির্দেশ দেওয়ার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। এর মধ্যেই কিশোর সাইফুল্লাহ নিজেকে আবিষ্কার করল বিশেষ বাহিনীর ‘কিল অর ক্যাপচার’ (হত্যা কর বা ধর) অভিযানের লক্ষ্যস্থলে। সময়টা ২০১১ সাল। ওই সময় রাতবিরাতে এমন অভিযান খুব সাধারণ ছিল।

২০১১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি আফগানিস্তানের হেলমান্দ প্রদেশের নাওয়া জেলায় ওই রাতের অভিযানে সাইফুল্লাহর পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শুধু তার চাচা মোহাম্মদ বাংকে আটক করাই ছিল লক্ষ্য। রাতের আঁধারে তালেবানের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের লক্ষ্য করে নেওয়া সেসব অভিযানে আফগান বাহিনীর সঙ্গে অংশ নিত ব্রিটিশ বিশেষ বাহিনী।

সাইফুল্লাহর পরিবারে সেই অভিযান ঘিরে নতুন যে তথ্য প্রকাশ পেয়েছে, এতে অভিযোগ উঠেছে, ব্রিটিশ বাহিনীর সদস্যরা নিরস্ত্র-নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছে।

বিবিসি প্যানোরামাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাইফুল্লাহ ঘারেব ইয়ার ওই দিনের ঘটনা সম্পর্কে বলেন, ‘আতঙ্কে আমার পুরো শরীর কাঁপছিল। সবাই প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিল। ভয়ে নারী ও শিশুরা চিৎকার করে কাঁদছিল।’ সাইফুল্লাহ জানান, তাঁকে নারী ও শিশুদের সঙ্গে এক জায়গায় রাখা হয়। তাঁদের হাত বেঁধে ফেলা হয়। এর অল্প সময় পরই সে সেই অবস্থা থেকে গুলিবর্ষণের শব্দ শুনতে পায়।

সেনাসদস্যরা চলে যাওয়ার পর বাড়ির পাশে মাঠে সাইফুল্লাহর দুই ভাইয়ের লাশ পাওয়া যায়। পাশের বাড়িতে তাঁর চাচাতো ভাইয়ের গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায়। বাড়িতে ফিরে সাইফুল্লাহ তাঁর বাবাকে মৃত অবস্থায় মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেন। বাবার মাথা-কপালে একাধিক বুলেটের চিহ্ন ছিল। গুলির আঘাতে পা ভেঙে গিয়েছিল বাবার।

সাইফুল্লাহর দাবি, তাঁর পরিবারকে ভুল করে অভিযানের লক্ষ্যস্থলে পরিণত করা হয় এবং পরিবারের সদস্যদের ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয়।

আফগানিস্তানে গোয়েন্দা বাহিনীর এমন অনেক অভিযানের লক্ষ্য যথাযথ ছিল না বলে গত বছর বিবিসির প্যানোরামা অনুষ্ঠানে তুলে আনা হয়।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বিষয়ে জাতিসংঘের সাবেক বিশেষ দূত ফিলিপ অ্যালস্টন অনুষ্ঠানে বলেন, নিরপরাধ মানুষকে হত্যার অনেক অভিযোগ ন্যায়সংগত, এতে কোনো সন্দেহ নেই। রাতের অভিযানগুলোয় বিপুলসংখ্যক বেসামরিক লোককে হত্যা করা হয়েছে। এটা একদমই অসমর্থনযোগ্য।

নাওয়া জেলায় ওই দিনের হত্যাকাণ্ডের পর হেলমান্দ প্রদেশের গভর্নরেরও দাবি ছিল, নিরীহ লোকজনকে হত্যা করা হয়েছে।

ঘটনাটি নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে বিশেষ বাহিনীর দুই কর্মকর্তার আলাপের মাধ্যমে।

আফগান যুদ্ধ নিয়ে বিশেষ বাহিনীর দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ইংল্যান্ডের ডোরসেটের এক বারে গোপন আলোচনায় বসেন। তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, যুক্তরাজ্যের সর্বাধিক উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেনাদলটি নিরস্ত্র মানুষকে হত্যার এক ‘ইচ্ছাকৃত নীতি’ গ্রহণ করেছিল। এখন যেসব তথ্য–প্রমাণ বেরিয়ে আসছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, ওই দুই কর্মকর্তার ধারণা ঠিক ছিল।

ওই দুই কর্মকর্তা ঘটনার সময় হেলমান্দ প্রদেশে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন সম্প্রতি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরেছেন। অপরজন হেডকোয়ার্টারে রয়েছেন। ওই সব অভিযান নিয়ে বিশেষ বাহিনীর পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ‘অভিযানে শত্রু নিহত’।

যুক্তরাজ্যের স্পেশাল ফোর্স বা বিশেষ বাহিনী সেনাবাহিনীর বিশেষায়িত অভিজাত দল। এতে স্পেশাল এয়ার সার্ভিস (এসএএস) ও স্পেশাল বোট সার্ভিস (এসবিএস) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

ধারণা করা হয়, ওই দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার আলোচনার পর, যুক্তরাজ্যের বিশেষ বাহিনীর অন্যতম প্রধান জ্যেষ্ঠ এক সদস্যের লেখা নোট চেন অব কমান্ডের কাছে পাঠানো হয়।

ওই নোটে স্পষ্ট সতর্কবার্তা ছিল বিশেষ বাহিনীর সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতি। অপরাধমূলক এমন আচরণ বন্ধে হত্যার ঘটনাগুলোয় উদ্বেগ প্রকাশ করে গভীর তদন্তের উল্লেখ করা হয় ওই নোটে।

হাইকোর্ট চলমান মামলার অংশ হিসেবে এ–সংক্রান্ত সব নথিপত্র আইনজীবী লেই ডের কাছে প্রকাশ পায়।

মামলাটি করেছেন সাইফুল্লাহ ঘারেব ইয়ার। তিনি জানান, ২০১১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারির ওই অভিযানে তাঁর পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করা হয়।

ওই দিনের অভিযান সম্পর্কে সরকারের কাছে রক্ষিত তথ্য অনুসারে, সেনাসদস্যরা আত্মরক্ষার স্বার্থে গুলি করলে সাইফুল্লাহর পরিবারের সদস্যরা নিহত হন।

তবে নতুন প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, বিশেষ বাহিনীর সেই অভিযান নিয়ে গভীর উদ্বেগের বিষয় রয়েছে। সেটা আত্মরক্ষা নয়, হত্যাই ছিল।

ওই সময় ব্রিটিশ সামরিক ই–মেইলে আফগান বাহিনীর প্রত্যক্ষদর্শীদের মন্তব্য থেকে সাইফুল্লাহর অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়। একজন আফগান কমান্ডার জানান, দুজনকে দৌড়ে পালানোর সময় হত্যা করা হয়। বাকি দুজনকে আটকের পর হত্যা করা হয়। ব্রিটিশ সেনাদলটির প্রতি কেউ গুলিবর্ষণ করেনি। অথচ পরিবারটির চারজনকে হত্যা করা হয়। তিনি যা দেখেছেন, তাতে প্রমাণিত হয়, নিরীহ মানুষদের হত্যা করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন