বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

স্থানীয় সময় রোববার থেকেই নেদারল্যান্ডসে কঠোর লকডাউন চালু হয়েছে। দেশটিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় ছাড়া অন্যান্য পণ্যের দোকান, পানশালা, ব্যায়ামাগার, সেলুন এবং অন্যান্য জনসমাগমের জায়গাগুলো আগামী বছরের জানুয়ারির মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। বাড়িতে দুজনের বেশি অতিথিকে নিমন্ত্রণ জানানো যাবে না। তবে বড়দিন উপলক্ষে ২৪ থেকে ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত এবং নতুন বছরের আয়োজনে একসঙ্গে সর্বোচ্চ চারজন অতিথি ডাকা যাবে।

দেশটিতে আগামী ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। তবে অন্যান্য বিধিনিষেধ কার্যকর থাকবে ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত। সংক্রমণ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে নেদারল্যান্ডস সরকার। তবে এ সময়ের মধ্যে সংক্রমণ ঠেকাতে জনগণকে বাড়িতে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। গত শনিবার লকডাউনের ঘোষণা দিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুট্টে বলেন, ‘এ ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।’

উচ্চমাত্রায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের শরীরে অমিক্রন দ্রুত ছড়াচ্ছে— গত শনিবার এমন তথ্য জানিয়েছে ডব্লিউএইচও। সংস্থাটি বলছে, এমনটি কেন হচ্ছে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ গতকাল রোববার বিবিসিকে বলেন, দেশটিতে এখন নতুন শনাক্ত হওয়া করোনা রোগীদের প্রায় ৬০ শতাংশই অমিক্রনে আক্রান্ত। আগামী সপ্তাহগুলোয় যুক্তরাজ্যে সংক্রমণের সুনামি বয়ে যেতে পারে। বড়দিনের আগে বিধিনিষেধ আরোপের ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

কয়েকদিন ধরে যুক্তরাজ্যে করোনার সংক্রমণ নতুন করে বাড়তে শুরু করেছে। এ ধারাবাহিকতায় গত শুক্রবার দেশটিতে নতুন করে ৯৩ হাজার ৪৫ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। মহামারি শুরুর পর এটাই যুক্তরাজ্যে একদিনে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ শনাক্তের ঘটনা। দেশটিতে একদিনে ১০ হাজারের বেশি মানুষের অমিক্রনে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

কঠোর লকডাউন ঘোষণা করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।
মার্ক রুট্টে, নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী

সংক্রমণ বৃদ্ধির জেরে লন্ডনের মেয়র সাদিক খান গতকাল রোববার বিবিসিকে বলেন, ‘নতুন করে বিধিনিষেধ আরোপ করা অনিবার্য হয়ে পড়েছে। সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার জনসমাগমস্থল, এমনকি ঘরের ভেতরেও মাস্ক পরতে এবং বাড়ি থেকে দাপ্তরিক কাজ করতে অনুরোধ জানিয়েছে।

তবে এসব উদ্যোগ পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন সাদিক খান। সরকারের প্রতি তিনি বলেন, আমি মনে করি, দ্রুত বিধিনিষেধ আরোপ করা না হলে সংক্রমণে গতি টেনে ধরা অসম্ভব হয়ে পড়বে। হাসপাতালগুলোয় রোগী বাড়তে শুরু করেছে। এর ফলে স্বাস্থ্যসেবা খাত ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

দ্রুত সংক্রমণশীল অমিক্রনের কারণে সরকারি নির্দেশনা না থাকলেও যুক্তরাজ্যের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। কর্মীদের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ ছাড়াও একের পর এক রিজার্ভেশন বাতিল হতে থাকায় বড়দিনের আগে বার–রেস্তোরাঁ এবং অনুষ্ঠান আয়োজনের ভেন্যুগুলোর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে সিএনএন বিজনেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। যদিও প্রায় দুই বছর ধরে চলা করোনা মহামারির মধ্যে আবার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়াটা যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি। পাশাপাশি এটি দেশটির সরকারের জন্যও মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমি মনে করি, দ্রুত বিধিনিষেধ আরোপ করা না হলে সংক্রমণে গতি টেনে ধরা অসম্ভব হয়ে পড়বে। হাসপাতালগুলোয় রোগী বাড়তে শুরু করেছে। এর ফলে স্বাস্থ্যসেবা খাত ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সাদিক খান, লন্ডনের মেয়র

সিএনএন জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যের বর্তমান করোনা পরিস্থিতি সবাইকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। ইতিমধ্যে অনেকেই রেস্তোরাঁ বা পানশালায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করেছেন। কারণ, ক্রিসমাসের মধ্যে তাঁরা নিজেদের অসুস্থ হওয়া কিংবা আইসোলেশনে যাওয়ার মতো পরিস্থিতির মধ্যে ফেলতে চাইছেন না। এর চেয়ে বাড়িতে বসে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো ভালো বলে মনে করছেন তাঁরা।

মহামারি শুরুর পর থেকে অমিক্রন যুক্তরাজ্যের জন্য ‘সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হুমকি’ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির হেলথ সিকিউরিটি এজেন্সির প্রধান নির্বাহী জেনি হ্যারিস। তিনি বলেন, করোনার আগের ধরনগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে আগামী কয়েক দিনে সংক্রমণের হার হতবাক করে দেওয়ার মতো হতে পারে বলে প্রাপ্ত হিসাব–নিকাশগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এর পরও আতঙ্ক ও সংক্রমণ বাড়লেও তা মোকাবিলায় নতুন করে বিধিনিষেধ জারির পক্ষে নন যুক্তরাজ্যের ১০০ জনের বেশি আইনপ্রণেতা। গত মঙ্গলবার এক ভোটাভুটিতে তাঁরা বিধিনিষেধের বিপক্ষে অবস্থান নেন। তবে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন করোনার নতুন ঢেউ আঘাত হানতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়ে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশনা দিয়েছেন।

এদিকে অমিক্রনের সংক্রমণ ঠেকাতে রোববার যুক্তরাজ্যের সঙ্গে চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে জার্মান সরকার। এর ফলে এখন শুধু জার্মানির নাগরিকেরা যুক্তরাজ্য থেকে দেশটিতে প্রবেশ করতে পারবেন। বড়দিনের আগে সিনেমা হল ও থিয়েটার বন্ধ করে দিয়েছে ডেনমার্ক সরকার। এমনকি দেশটিতে শপিং সেন্টারে ক্রেতার সংখ্যা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। রাজধানী রোমসহ কয়েকটি শহরে নববর্ষের আয়োজন বাতিল করেছে ইতালি সরকার।

করোনা সংক্রমণের পঞ্চম ঢেউ ঠেকাতে বড়দিন ও নববর্ষে বড় ধরনের জনসমাগম নিষিদ্ধ করেছে ফ্রান্স। দেশটির সরকার সতর্ক করে জানিয়েছে, নতুন বছরের শুরুতে ফ্রান্সকে অমিক্রনের ধাক্কা সামলাতে হতে পারে। এজন্য যুক্তরাজ্যে ভ্রমণ ও সে দেশ থেকে লোকজনের আসা ঠেকাতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েচে দেশটি। ফরাসি প্রধানমন্ত্রী জ্যঁ ক্যাসটেক্স শনিবার বলেছেন, ইউরোপে করোনা বিদ্যুৎগতিতে ছড়াচ্ছে। নতুন বছরের শুরুতে এটি ফ্রান্সেও প্রভাব বিস্তার শুরু করবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

উদ্বেগের খবর শুনিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটির মতে, করোনার ডেলটা ধরনের চেয়ে কয়েক গুণ দ্রুতগতিতে ছড়াচ্ছে ভাইরাসটির নতুন ধরন অমিক্রন। এ গতি এতটাই যে বিভিন্ন দেশে মাত্র দেড় থেকে তিন দিনে অমিক্রনে সংক্রমণের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় গত ২৪ নভেম্বর প্রথম অমিক্রনের সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এর পর থেকে মাত্র তিন সপ্তাহের কিছু বেশি সময়ে বিশ্বের ৯০টির বেশি দেশে করোনার নতুন ধরনটি ছড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া গেছে।

উচ্চমাত্রায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের শরীরে অমিক্রন দ্রুত ছড়াচ্ছে— গত শনিবার এমন তথ্য জানিয়েছে ডব্লিউএইচও। সংস্থাটি বলছে, এমনটি কেন হচ্ছে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের সমীক্ষায় দেখা গেছে, অমিক্রনে পুনঃসংক্রমণের আশঙ্কা ডেলটার চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি। তবে এখনই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত নেই বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যমতে, অমিক্রনে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ও মৃত্যুর হার তুলনামূলক কম।

অমিক্রন ঠেকাতে এখন পর্যন্ত টিকার ওপরই জোর দিচ্ছে ডব্লিউএইচও। ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের নেতারাও কঠোর বিধিনিষেধের সিদ্ধান্ত না নিয়ে টিকা দেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন। তবে টিকা বণ্টনের ক্ষেত্রে বৈষম্য হচ্ছে এবং মহামারি মোকাবিলায় নেওয়া পদক্ষেপে সমন্বয় খুব প্রয়োজন উল্লেখ করে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেজ বলেছেন, সমন্বয়হীন পদক্ষেপ নিলে মহামারি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন