বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কেন ডুবল মস্কভা?

স্থানীয় সময় গত বৃহস্পতিবার কৃষ্ণসাগরের ইউক্রেন উপকূলে ডুবে যায় মস্কভা। ইউক্রেন বলেছে, তারা মস্কভায় জাহাজ–বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। এতে মস্কভায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে ও গোলাবারুদ বিস্ফোরিত হয়। রুশ সরকারি গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে জাহাজটিতে মজুত করে রাখা গোলাবারুদে অজ্ঞাত কারণে আগুন লাগে। এরপর এটি বিস্ফোরিত হয়। নিকটবর্তী একটি বন্দরে টেনে নিয়ে যাওয়ার সময় খারাপ আবহাওয়ার কবলে পড়ে জাহাজটি সাগরে ডুবে যায়।

default-image

রুশ সংবাদ সংস্থা তাসের খবরে অজ্ঞাত সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়, জাহাজের নাবিকদের ক্রিমিয়ায় সেভাতোপোল বন্দরে পৌঁছে দেওয়া হয়। তবে জাহাজ থেকে উদ্ধার করা নাবিকদের বিষয়ে আর কোনো তথ্য দেয়নি তাস।
রুশ জাহাজ মস্কভায় জাহাজ–বিধ্বংসী ও বিমান–বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, টর্পেডো, নৌবাহিনীর ব্যবহৃত বন্দুক, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও প্রচুর বিস্ফোরক ছিল।
ডুবে যাওয়ার সময় মস্কভায় পারমাণবিক অস্ত্র ছিল বলে মনে করেন না যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। মার্কিন দুই শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা সিএনএনকে এমন তথ্য জানিয়েছেন।

মস্কভার মতো যুদ্ধজাহাজ শেষ কবে ডুবেছিল?

ফকল্যান্ড যুদ্ধ চলাকালে ১৯৮২ সালের ২ মে আর্জেন্টিনার ক্রুজার জেনারেল বেলগ্রানোর ওপর টর্পেডো হামলা চালানো হয়। ব্রিটিশ পারমাণবিক শক্তি ক্ষমতাসম্পন্ন সাবমেরিন এইচএমএস কনকোয়েরর এ হামলা চালায়। এতে জাহাজটি ডুবে যায়।
জেনারেল বেলগ্রানো ক্রুজার জাহাজটি আকারে ছিল মস্কভার সমান। প্রতিটি দৈর্ঘ্যে ৬০০ ফুট। ১২ হাজার টন জায়গা দখল করে। তবে মস্কভাতে ছিলেন ৫০০ জন ক্রু। আর জেনারেল বেলগ্রানোতে ছিলেন ১ হাজার ১০০ জন ক্রু। মস্কভাতে অগ্নিকাণ্ড এবং ডুবে যাওয়ার ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা জানায়নি রাশিয়া। তবে জেনারেল বেলগ্রানো ডুবে যাওয়ার সময় ৩২৩ জন ক্রু এর মৃত্যু হয়।

মস্কভাডুবিতে রাশিয়ার ক্ষতি কতটা

মস্কভাডুবির ঘটনায় রাশিয়ার সেনাবাহিনীর মনোবলের ওপর বড় প্রভাব পড়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার যা ক্ষতি হয়েছে, তার মধ্যে দৃশ্যমান বড় ঘটনা হলো যুদ্ধজাহাজ মস্কভাডুবির ঘটনা। যুদ্ধ নিয়ে সব তথ্য না জানালেও এত বড় জাহাজডুবির তথ্য গোপন করতে পারেনি রাশিয়া। মস্কভা ডুবে যাওয়ায় রাশিয়ার যুদ্ধের ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রশ্ন রয়েছে, শত্রুতা না দুর্ঘটনা—কী কারণে ডুবেছে মস্কভা।
যুক্তরাষ্ট্রের থিঙ্কট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারে (আইএসডব্লিউ) যুদ্ধের দৈনিক ব্রিফিংয়ের বিশ্লেষক মেসন ক্লার্ক, কাতেরিয়ানা স্টেপানেনকো ও জর্জ ব্যারোস বলেছেন, মস্কভা ডুবে যাওয়া নিয়ে রাশিয়া যে ব্যাখ্যাই দিক না কেন, তাতে তাদের অক্ষমতাই প্রকাশ পেয়েছে। বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা, নিরাপত্তাব্যবস্থায় ত্রুটি প্রকাশ পেয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সাবেক ক্যাপ্টেন কার্ল স্কুহাসটার বলেন, নৌবাহিনীর সক্ষমতা, মনোবল ও পেশাদারত্ব পুনরুদ্ধার করতে যাচ্ছেন—রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের এমন ঘোষণার ১০ বছর পর দেশটির নৌবাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্কুহাসটার আরও বলেন, মস্কভা ডুবে যাওয়ার ঘটনায় এটা প্রমাণ হয়েছে যে রাশিয়ার সেনাবাহিনী নিয়ে দেওয়া কোনো প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেননি পুতিন।

তবে আইএসডব্লিউয়ের বিশ্লেষকরা বলছেন, মস্কভাডুবির ঘটনা রাশিয়ার জন্য খুব বড় ধাক্কা নয়। জাহাজটি ইউক্রেনের সেনা সরঞ্জাম ও বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জন্য ব্যবহৃত হয়। রাশিয়ার ভূমিভিত্তিক ব্যবস্থা ও যুদ্ধবিমান রয়েছে, যা দিয়ে একইভাবে হামলা চালানো সম্ভব।

আইএসডব্লিউয়ের বিশ্লেষকেরা আরও বলছেন, যদি মস্কভা ডুবে যাওয়ার কারণ ইউক্রেনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়, তাহলে রাশিয়ার নৌবাহিনীকে অভিযান নিয়ে আবার পরিকল্পনা করতে হবে। ইউক্রেন অঞ্চল থেকে জাহাজ সরিয়ে নিতে হবে। বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।

তবে পেন্টাগনের মুখপাত্র জন কিরবি বলেন, মস্কভার অভিযানের প্রধান লক্ষ্য কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার বাহিনীর জন্য বিমান প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা করা। মস্কভা ডুবে যাওয়ায় এ ক্ষেত্রে রাশিয়ার সক্ষমতার ওপর প্রভাব পড়বে।

চীনের জন্য শিক্ষা?

বিশ্লেষকেরা বলছেন, মস্কভার ডুবে যাওয়ার বিষয়টি সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছে পূর্ব এশিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের থিঙ্কট্যাংক র‍্যান্ড কর্পের জ্যেষ্ঠ আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা গবেষক টিমোথি হেলথ বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র মস্কভাডুবির ঘটনাকে হালকাভাবে দেখতে চায়। এটিকে কেন্দ্র করে যেকোনো সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতকে এড়িয়ে যেতে চায় দুটি দেশ। হেলথ ও অন্যরা বলছেন, ইউক্রেন যে ধরনের জাহাজ–বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে তাইওয়ানও সে রকম ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারে বলে চীনের আশঙ্কা রয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সাবেক সাবমেরিন কমান্ডার ও সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির বিশ্লেষক থমাস সুগার্ট বলছেন, দুই দেশের পরিস্থিতিতে পার্থক্য রয়েছে। তিনি বলেন, মস্কোর বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ক্ষতি করার মতো আধুনিক নয়। আর ইউক্রেনের জাহাজ–বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রগুলো চীনের মতো ভালো নয়।

সুগার্ট আরও বলছেন, সোভিয়েত যুগের যুদ্ধজাহাজ মস্কভা সাধারণ আক্রমণের ও প্রতিরোধের কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। তাই এটি ডুবে যাওয়ায় বড় ধরনের কোনো ক্ষতির আশঙ্কা নেই।

ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন