মাদ্রিদের ট্যাক্সিচালকদের কেন ‘হিরো’ বলছে ইউক্রেনের শরণার্থীরা

ট্যাক্সিবহর বারগোসে যাত্রাবিরতির জন্য থামলে একজন ট্যাক্সিচালক ইউক্রেনীয় এক শরণার্থী শিশুকে আলিঙ্গন করছেন
ছবি: এএফপি

ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে পালিয়ে গাড়ি আর পায়ে হেঁটে পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ পৌঁছান ২২ বছরের ক্রিশ্চিনা থ্রাখ। বুঝতে পারছিলেন না কীভাবে স্পেনে থাকা তাঁর বোনের কাছে পৌঁছাবেন। তখন তিনি জানতে পারেন, মাদ্রিদের একদল ট্যাক্সিচালক পোল্যান্ডে এসেছেন। তাঁরা আসার সময় ত্রাণ নিয়ে এসেছেন। আর যাওয়ার সময় ওয়ারশর শরণার্থীকেন্দ্র থেকে ১৩৫ জন ইউক্রেনীয়কে নিয়ে স্পেনে ফিরবেন।

মধ্য মাদ্রিদের একটি চার্চের বাইরে দাঁড়িয়ে থ্রাখ বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘তাঁরা আমাদের হিরো।’ পাঁচ দিনের যাত্রা শেষে বৃহস্পতিবার দিনের শুরুতে ২৯ ট্যাক্সির ওই বহরটি সেখানে পৌঁছায়। তাদের দেখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে সেখানে জড়ো হওয়া শুভাকাঙ্ক্ষীরা। অধিকাংশ শরণার্থীই নারী ও শিশু। থ্রাখের মতো অন্যদের স্বজন ও বন্ধুরা স্পেনেই থাকেন। তাঁদের সঙ্গে ছিল পোষ্য চারটি কুকুর ও একটি বিড়াল।

থ্রাখ বলেন, ‘আমি একটি চাকরি পেতে চাই। আমি সেই অর্থ দিয়ে আমার দেশ ও পরিবারকে সহায়তা করতে পারি।’

থ্রাখের মা-বাবা বেঁচে নেই। কিয়েভে দাদা-দাদিকে রেখে এসেছেন তিনি। সেখানে অনলাইনে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করতেন এই তরুণী। তিনি স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলতে পারেন। ছোট বয়সে তিন মাস পরিবারের সঙ্গে স্পেনে থাকার সময় শিখেছেন।

এই বহরের প্রতিটি ট্যাক্সির দুজন করে চালক ছিলেন। ছয় হাজার কিলোমিটারের রাউন্ড-ট্রিপ দিতে শুক্রবার তাঁরা স্পেনের রাজধানী ছেড়ে যান।

নিজের ১৫ বছরের ছেলেকে নিয়ে কিয়েভ থেকে পালিয়ে এসেছেন ৪৬ বছর বয়সী ওলহা শোকারিয়েভা। তাঁর মতো অম্লমধুর অভিজ্ঞতা অন্যদেরও। ইংরেজিতে তিনি বলেন, ‘আমি এখানে এসেছি কেবল আমার ছোট ছেলেকে নিয়ে। আমার স্বামী এখন কিয়েভে। বড় ছেলে (পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর) ভিনিৎসিয়ায়। তাঁরা যুদ্ধ করতে সেখানে অবস্থান করছেন। আমরা জানি না, আমাদের বাড়ি অক্ষত আছে কি না। আমরা জানি না, আমাদের ভবিষ্যৎ কী।’

ইউরোপ পাড়ি দেওয়ার এই যাত্রা শেষের পর অনেক চালক ও তাঁদের যাত্রীরা কোলাকুলি করেন। একে অপরকে বিদায় জানাতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন।

বদলে যাওয়া জীবন

এই কর্মযজ্ঞের সমন্বয় করেন মাদ্রিদ প্রোফেশনাল ট্যাক্সি ফেডারেশনের হোসে মিগুয়েল ফুনেস। তিনি বলেন, মাদ্রিদ বিমানবন্দরে অন্যদিনগুলোর মতো যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করছিলেন এই ট্যাক্সিচালকেরা। আলোচনা করছিলেন ইউক্রেনে রাশিয়ার বোমাবর্ষণ নিয়ে। হঠাৎ তাঁদের মাথায় এই চিন্তা আসে। যখন তাঁদের একজন পোল্যান্ড থেকে শরণার্থীদের আনার প্রস্তাব দেন, তখন আরও কয়েকজন রাজি হয়ে যান।

কিছুক্ষণের মধ্যেই কয়েক ডজন ট্যাক্সিচালক যাওয়ার জন্য নিবন্ধন করেন। ফুনেস বলেন, ‘এই সাড়া ছিল অবিশ্বাস্য। আমরা এতটা আশা করিনি।’

হাভিয়ের হার্নান্দেসের ট্যাক্সিতে ছিলেন এক দম্পতি ও তাঁদের ১২ বছর বয়সী ছেলে। তিনি বলেন, বোমা হামলা থেকে শিশু ও নারীদের পালানোর দৃশ্য দেখে তিনি আর স্থির থাকতে পারছিলেন না।

যখন তাঁরা প্রথম রওনা হন, শুরুতে শরণার্থীরা চুপচাপ ছিলেন। ট্যাক্সিবহর যাত্রাবিরতির জন্য থামলেও তাঁরা নামতে চাননি। প্রথম দিন পার হওয়ার পর তাঁরা ‘আমাদের সঙ্গে কোলাকুলি করছিলেন, কৌতুক করছিলেন’, বলেন ৪৭ বছর বয়সী এই ট্যাক্সিচালক।

এই বহরের প্রতিটি ট্যাক্সির দুজন করে চালক ছিলেন। ছয় হাজার কিলোমিটারের রাউন্ড-ট্রিপ দিতে শুক্রবার তাঁরা স্পেনের রাজধানী ছেড়ে যান।

তিনি বলেন, ‘মাত্র এক দিনের ব্যবধানে তাঁদের (শরণার্থীদের) জীবন বদলে যায়। এটা খুবই নাড়া দেওয়ার মতো। এটা আসলে কিছুই না, এটা কেবল কয়েক দিন গাড়ি চালানো, যা আমরা মাদ্রিদেই করি।’

আয়োজকেরা জানান, এই কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করতে তাঁদের প্রায় ৫০ হাজার ইউরো খরচ হয়েছে, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৪৭ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। গাড়ির জ্বালানি আর টোল ফি দিতে গিয়ে অধিকাংশ অর্থ খরচ হয়েছে। ডোনেশনের মাধ্যমে এই অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। মূলত অন্য ট্যাক্সিচালকেরাই এই অর্থ দিয়েছেন।

তিনজন ইউক্রেনীয় নারীকে এনেছেন ৩৮ বছর বয়সী জেসাস আন্দ্রেদেস। তিনি সমন্বয়কদের একজন। এই ট্যাক্সিচালক বলেন, ‘আমাদের মানুষগুলো বিস্ময়কর। কিছু ট্যাক্সিচালকের ছোট্ট শিশুরা বাসায় ব্যাংকে জমানো টাকা পর্যন্ত দিয়ে দিয়েছে।’

নিজেদের কাজটাই করেছি

সংকটের সময় মানবিক সহায়তার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে মাদ্রিদের ট্যাক্সিচালকদের। মাদ্রিদে ২০০৪ সালে ট্রেনে বোমা হামলায় প্রায় ২০০ মানুষ নিহত হন। ওই সময় আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে নিয়ে যান তাঁরা। এমনকি ২০২০ সালের বসন্তে যখন করোনো মহামারি দেখা দেয়, তাঁরা চিকিৎসকদের এক বাসা থেকে অন্য বাসায় নিয়ে ছুটেছেন। কিংবা অসুস্থ ব্যক্তিদের হাসপাতালে নিয়ে গেছেন এই ট্যাক্সিচালকেরা।

হার্নান্দেস বলেন, ‘আমরা সাধারণ মানুষ। দিন শেষে সাধারণ মানুষই সাহায্য নিয়ে বেশি এগিয়ে আসে বলে আমি মনে করি।’ ডিভোর্সের পর বিষণ্নতায় এক বছর রাস্তায় রাস্তায় কাটিয়েছিলেন তিনি।

অন্য ট্যাক্সিচালকদের মতো বহরে অংশ নেওয়া ৩৪ বছর বয়সী নুরিয়া মার্তিনেস বলেন, শরণার্থী আনার জন্য তিনি আবারও রাস্তায় নামতে প্রস্তুত।

ট্যাক্সিবহরের জন্য শরণার্থী নির্বাচনে সহায়তা করেছে মাদ্রিদে অবস্থিত ইউক্রেনীয় দূতাবাস। জাতিসংঘের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার হামলা শুরুর পর থেকে ইউক্রেন ছেড়েছেন ৩০ লাখের বেশি মানুষ। তাদের বড় অংশই পোল্যান্ডে আশ্রয় নিয়েছে।