default-image

ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন শুরুর পর থেকে এক কোটির বেশি ইউক্রেনীয় তাদের বাড়িঘর ছেড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৪৩ লাখ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে। ইউক্রেনের বেশ কিছু এলাকা এখনো রুশ সেনাদের সরাসরি হামলার হুমকিতে রয়েছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দ্বিতীয় মাসে গড়িয়েছে। পশ্চিমা গণমাধ্যমের খবর বলছে, সাহসিকতার সঙ্গেই রুশ সেনাদের মোকাবিলা করছেন ইউক্রেনের সেনারা। যুদ্ধের প্রাক্কালে পশ্চিমাদের ভবিষ্যদ্বাণীর সমালোচনা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, পশ্চিমের সামরিক বিশ্লেষকেরা পূর্বাভাস দিয়েছিলেন যে রাজধানী কিয়েভ আক্রমণকারীদের হাতে পতনের জন্য মাত্র ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগবে। অথচ এখন ৪৮ দিনের বেশি সময় গড়িয়েছে।

পোলিশ সীমান্তে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেওয়া কয়েকজন ইউক্রেনীয় বলেন, বিদেশে শরণার্থী হিসেবে জীবন যাপন করে তাঁরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। নানা কারণে দেশে ফিরে যেতে মরিয়া হয়েছেন তাঁরা। কেউ কেউ রুশ হামলার পর ফেলে আসা গুরুত্বপূর্ণ নথি সংগ্রহ করতে, লুটেরাদের হাত থেকে তাঁদের বাড়ি রক্ষা করতে বা ফেলে আসা বাবা বা সন্তানের কাছে যেতে উদ্‌গ্রীব।

default-image

সীমান্ত এলাকায় একটি ফাস্টফুডের দোকানে হটডগ খাচ্ছিলেন সোফিয়া। মায়ের সঙ্গে তিনিও পোল্যান্ডে গিয়েছিলেন নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য। কিন্তু বেশি দিন থাকতে পারেননি। তিন সপ্তাহ পোল্যান্ডে থেকেই বাড়ি ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মায়ের নিষেধ করা সত্ত্বেও নিজ শহর লিভিভ ফিরে যাচ্ছেন। তাঁর মতে, যুদ্ধ যুদ্ধের জায়গায়। আর ইস্টার হলো ইস্টার। লিভিভ ফিরে তিনি প্রিয়জনদের দেখতে আগ্রহী।

২০ বছর বয়সী সোফিয়া বলেন, মার্চের শেষ দিকে লিভিভে হামলা শুরুর পর সীমান্ত অতিক্রম করেন তিনি। ইউক্রেনের এই তরুণী বলেন, ‘মা আমাকে জোর করেছিলেন। তখন তিনি বেশ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু বিদেশে কখনো স্থায়ী বসবাসের কথা ভাবিনি। যদিও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এবং পোলিশ সরকার উদ্বাস্তুদের অনেক সাহায্য করেছে। কিন্তু নিজের বাড়িতে থাকার অনুভূতি অন্য রকম।’

সোফিয়া ও ওলেনার মতো ইউক্রেনে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আরও অনেকে। পোলিশ সীমান্ত কর্তৃপক্ষ বলছে, ইউক্রেন থেকে পোল্যান্ডে যাওয়া এবং পোল্যান্ড থেকে ইউক্রেনে আসা মানুষের সংখ্যা এখন কাছাকাছি চলে এসেছে। গত বুধবার ২৪ হাজার ৭০০ মানুষ ইউক্রেন থেকে পোল্যান্ডে প্রবেশ করেছেন। একই সময়ে ২০ হাজার পোল্যান্ড থেকে ইউক্রেনে ফিরেছেন। সংখ্যাটি গত ৬ মার্চ পোল্যান্ডে প্রবেশকারী রেকর্ড ১ লাখ ৪২ হাজার মানুষের সংখ্যার একেবারে উল্টো।

লিভিভ-হোলোভনি রেলস্টেশন পশ্চিম ইউক্রেনের অন্যতম আশ্রয়কেন্দ্র। যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল থেকে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ট্রেনে এই স্টেশনে পৌঁছায়। দাতব্য সংস্থাগুলো তাদের খাবার, জামাকাপড় এবং সিমকার্ড সরবরাহ করছে। বেশির ভাগ মানুষ এখানে পূর্বাঞ্চল থেকে আসে। আবার এখান থেকে অনেক মানুষ বিপরীত দিকেও যায়।

ইরিনা তাঁর মেয়ে কাতেরিনা, মা লিনা এবং শাশুড়ি ইয়েভজেনিয়া মধ্য ইউক্রেনের শহর ক্রিভি রিহ থেকে এসেছেন। তাঁরা মলদোভায় আত্মীয়ের সঙ্গে থাকার জন্য দেশ ছেড়েছিলেন। এখন তাঁরা ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁদের যাত্রার জন্য ট্রেনের টিকিট কিনতে হয়েছে। তবে যুদ্ধকবলিত এলাকা থেকে যাঁরা পশ্চিম দিকে যাচ্ছেন, তাঁরা বিনা টিকিটে ট্রেনে যাতায়াত করতে পেরেছেন।

ইরিনা বলেন, তাঁরা আরও আগেই ফিরে আসতেন। তবে আট বছর বয়সী মেয়ের অসুস্থ থাকায় অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ইউক্রেনে ফেরার সিদ্ধান্তের কারণ জিজ্ঞাসা করলে বলেন, ‘বাড়ি, বাড়িই।’ তবে বাড়ি ফিরলেও মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত ইরিনা। বললেন, দেশ ছাড়ার সময় তাঁদের শহরে রুশ হামলা শুরু হয়নি। কিন্তু এখন রুশ সেনারা ওই শহরের বেশ কাছে অবস্থান করছেন। ছোট কাতেরিনাকে যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে সত্যটাই বলেছেন ইরিনা।

ইরিনা, সোফিয়া, ওলেনার মতো লাখো ইউক্রেনীয় রয়েছেন অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে। নিজ দেশে তাঁরা বাস্তুচ্যুত। বিদেশে শরণার্থী হয়ে জীবনধারণ করাও কষ্টের। তাই ঝুঁকি নিয়েই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশে ফিরছেন তাঁরা।

ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন