মিনেকায়েভ বলেন, ট্রান্সনিস্ট্রিয়ায় রুশ ভাষাভাষী জনগণের ওপর নিপীড়ন করা হচ্ছে। ট্রান্সনিস্ট্রিয়া–সংলগ্ন ইউক্রেন সীমান্তে ১ হাজার ৫০০ রুশ সেনা রয়েছে।

কিয়েভের আশঙ্কা, ট্রান্সনিস্ট্রিয়া থেকে নতুন আক্রমণ শুরু করতে পারেন রুশ সেনারা। ট্রান্সনিস্ট্রিয়া মূলত রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দখলে থাকা সীমিত ভূখণ্ড, যা মলদোভার পূর্বাঞ্চল থেকে ইউক্রেনীয় বন্দর ওদেসার প্রায় ৪০ কিলোমিটারের মধ্যে পড়েছে।

পশ্চিমা দেশগুলো মনে করছে, গত মাসে রুশ সেনারা কিয়েভ দখলে ব্যর্থ হওয়ার পর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একটি বিজয় ঘোষণার জন্য মরিয়া ছিলেন।

এপ্রিলের শুরুর দিকে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা বলেছিলেন, ট্রান্সনিস্ট্রিয়া অঞ্চলের একটি বিমানঘাঁটি যুদ্ধজাহাজ ওঠানামার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। এখান থেকে ইউক্রেনে হামলা করা হতে পারে। তবে মলদোভার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ট্রান্সনিস্ট্রিয়ার কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই পরিকল্পনাকে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বলে নিন্দা করেছে। কিয়েভ বলছে, রাশিয়া স্বীকার করেছে, তাদের যুদ্ধ নাৎসিদের ওপর বিজয় অর্জনই নয়, ইউক্রেনের পূর্ব ও দক্ষিণ অঞ্চল দখলে নেওয়া। এটা রাশিয়ার সাম্রাজ্যবাদী আচরণ।

আজভস্টাল ইস্পাত কারখানা ছাড়াও ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্ব বন্দর শহর মারিউপোলকে সম্পূর্ণরূপে ‘মুক্ত’ করার দাবি করে মস্কো। এর এক দিন পর রুস্তম মিনেকায়েভ ইউক্রেনের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে পরিকল্পনার কথা জানালেন।

কিয়েভ স্বীকার করেছে, মারিউপোলের অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে মস্কোর হাতে। তবে শহরটি পুরোপুরি দখলে নিতে পারেননি রুশ সেনারা। ওয়াশিংটন রাশিয়ার দাবিকৃত বিজয়কে মিথ্যা তথ্য বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

রাশিয়ার সংবাদ সংস্থা আরআইএ জানিয়েছে, রাশিয়ার সামরিক বিপর্যয় নিয়ে গণমাধ্যমে আসা তথ্যের বিষয়েও মুখ খুলেছেন মিনেকায়েভ। তিনি বলেছেন, ‘গণমাধ্যম এখন আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর কিছু ব্যর্থতা নিয়ে অনেক কথা বলছে। কিন্তু ব্যাপারটা এমন নয়। শুরুর দিনগুলোতে ইউক্রেনীয় ইউনিটগুলোর কৌশল নিশ্চিত হতে কিছু পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। রুশ সেনারা সামনে এগোনোর পর ইউক্রেনের আগে থেকে প্রস্তুত করা চোরাগোপ্তা হামলার শিকার হয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। কিন্তু রুশ সেনারা দ্রুত এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেন এবং কৌশল পরিবর্তন করেন।’

আরআইএর মতে, মিনেকায়েভ বলেন, ইউক্রেনীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিদিনের ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য হামলার অর্থ, রাশিয়া সৈন্য না হারিয়ে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে, তা বোঝানো।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, মারিউপোলে বিজয় ঘোষণার পর গতকাল থেকে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে হামলা বাড়িয়েছেন রুশ সেনারা। এদিকে মারিউপোল শহর থেকে মৃতদেহ উদ্ধারে কাজ শুরু করেছেন স্বেচ্ছাসেবকেরা।

ইউক্রেনের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, খারকিভসহ দেশের পূর্বাঞ্চলে হামলা জোরদার করেছেন রুশ সেনারা। তাঁদের মূল লক্ষ্য দনবাস। তবে পূর্বাঞ্চল দখল করেই ক্ষান্ত দেবেন না তাঁরা।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি মহাকাশপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাক্সার টেকনোলজিস বলছে, ইউক্রেনের মারিউপোলে ৮৫ মিটার দীর্ঘ গণকবর শনাক্ত হয়েছে স্যাটেলাইট চিত্রে। এতে কমপক্ষে ২০০টি কবর থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কথিত গণকবরটি মারিউপোলের ২০ কিলোমিটার দূরে মানহুশ নামের একটি গ্রামের কাছে। মাক্সার বলছে, সারিবদ্ধ কবরের চারটি ভাগ রয়েছে, যা প্রায় ৮৫ মিটার দীর্ঘ।

রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনী নির্বিচার জনবহুল এলাকায় গোলা ও বোমাবর্ষণ করেছে। তারা বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা, হাসপাতাল, স্কুল এবং অন্যান্য বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করেছে। এ কার্যকলাপ যুদ্ধাপরাধের সমান হতে পারে।
রাভিনা শামদাসানি, জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের অফিসের মুখপাত্র

রুশ বাহিনী ওই একই জায়গায় বেসামরিক নাগরিকদের সমাহিত করছে বলে এর আগে এক বিবৃতিতে সিটি কাউন্সিল অভিযোগ করেছিল। তারা বলেছিল, রুশ বাহিনী পরিখা খনন করছে এবং সেখানে মরদেহ নিয়ে যেতে ডাম্পলরি ব্যবহার করছে। তারা ওপর থেকে নেওয়া নিজস্ব একটি ছবিও প্রকাশ করেছিল। সিটি কাউন্সিলের দাবি, পাশের সমাধিক্ষেত্রটির চেয়ে গণকবরটি ইতিমধ্যে দ্বিগুণ বড় হয়ে গেছে।

সিটি মেয়র ভাদিম বোইচেঙ্কো বলেছেন, মারিউপোলে হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিক মারা পড়তে পারেন। তবে ইউক্রেন ও তার পশ্চিমা মিত্রদের ব্যাপক হারে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে রাশিয়া।

অন্যদিকে এএফপি জানায়, জাতিসংঘ বলেছে ইউক্রেনে রুশ সেনাদের কর্মকাণ্ড, যার মধ্যে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা এবং বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের মতো কাজগুলো যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য করা হতে পারে।

গতকাল জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের অফিসের মুখপাত্র রাভিনা শামদাসানি বলেছেন, রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনী নির্বিচার জনবহুল এলাকায় গোলা ও বোমাবর্ষণ করেছে। তারা বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা, হাসপাতাল, স্কুল এবং অন্যান্য বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করেছে। এ কার্যকলাপ যুদ্ধাপরাধের সমান হতে পারে।’

পশ্চিমা দেশগুলো মনে করছে, গত মাসে রুশ সেনারা কিয়েভ দখলে ব্যর্থ হওয়ার পর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একটি বিজয় ঘোষণার জন্য মরিয়া ছিলেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদেমির জেলেনস্কিও বলেছেন, অন্তত কিছু জয় দেখানোর জন্য রাশিয়ার পক্ষ থেকে যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন