যেখানে সাদা কাগজ হাতে দাঁড়ালেও দণ্ড

বিজ্ঞাপন
default-image

কাজাখস্তানে নির্বাচন নিয়ে জল ঘোলা কম হয়নি। গত রোববারের নির্বাচনে সাবেক প্রেসিডেন্ট নুরসুলতান নাজারবায়েভ–সমর্থিত প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। এই নির্বাচনের পেছনে রয়েছে দেশটির জনগণের টানা তিন দশক ধরে শোষিত হওয়ার গল্প। ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কাজাখস্তানের নির্বাচন–পূর্ববর্তী চিত্র।

স্বৈরাচারকে গণতন্ত্রের বৈধতা দিতে নির্বাচনে নিজেদের পছন্দমতো প্রতিপক্ষ বসানো, অন্যায়ের বিরোধিতা করার ‘অপরাধে’ শত শত নাগরিককে গ্রেপ্তার করা, প্ল্যাকার্ড বা ব্যানারে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করা—কাজাখস্তানের জন্য খুব সাধারণ ঘটনা। এরই জের ধরে অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছিল আসলান সাগুতদিনোভের।

ভিন্নমতের ব্যাপারে একেবারেই অসহিষ্ণু কাজাখস্তান কর্তৃপক্ষ। বিক্ষোভকারীরা প্ল্যাকার্ডে কী লিখছে, তা দেখারও প্রয়োজন নেই তাদের। হাতে কিছু একটা দেখলেই হলো, গ্রেপ্তার করার মতো যথেষ্ট কারণ পেয়ে যায় পুলিশ। গত এপ্রিল মাসে আসিয়া তুলেসোভা ও বেয়বারিস তোলিম্বেকভ নামের দুজন গণতন্ত্রকর্মীকে আটক করা হয়। তাঁদের অপরাধ ছিল দেশটির অর্থনৈতিক রাজধানী আলমাতির ম্যারাথনে অপ্রত্যাশিত ব্যানার উন্মোচন করা। সে ব্যানারে লেখা ছিল ‘সত্য থেকে পালিয়ে বাঁচতে পারবে না’।

হ্যাশট্যাগ দিয়ে তাঁরা স্বচ্ছ নির্বাচনের দাবি জানিয়েছিলেন, নিজেদের পছন্দের কথা জানিয়েছিলেন। জনসমাবেশে আইনভঙ্গের দায়ে ১০ দিনের কারাদণ্ড হয় তাঁদের দুজনের। কর্তৃপক্ষের দাবি, ৯ জুনের নির্বাচন যে স্বচ্ছ হবে এবং জনগণের প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকবে, সে ব্যাপারে আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তারপরও এ ধরনের কাজ তারা কীভাবে বরদাশত করবে? কাজেই ওই দুই গণতন্ত্রকর্মীর জেল-জরিমানা তো হওয়াই উচিত।

এ ঘটনার পর সরকারের সচেতনতা পরীক্ষা করতে উরালস্ক শহরের কেন্দ্রে একটি ঢাউস আকৃতির সাদা কাগজ নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন সাগুতদিনোভ। যা ভেবেছিলেন, তৎক্ষণাৎ চৌদ্দ শিকের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো তাঁকে। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আর দাঁড় করাতে পারেনি পুলিশ, তাই বাধ্য হয়ে সাগুতদিনোভকে ছেড়ে দিতে হয়। পরবর্তী সময়ে পুলিশের এক মুখপাত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, সাদা কাগজ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য সাগুতদিনোভকে গ্রেপ্তার করা হয়নি; বরং এই কাজ করার পেছনে তিনি যে যুক্তি দিয়েছেন, সে মন্তব্যের সাজা হিসেবে তাঁকে আটক করা হয়।

default-image

ম্যারাথনে অংশ নেওয়া বিক্ষোভকারী কিংবা সাগুতদিনোভের অনুকরণে দেশজুড়ে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটেছে। কাজাখস্তানের রাজধানী নুরসুলতানে এক স্কুলছাত্র নিজ দায়িত্বে সাদা কাগজ নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। বিভিন্ন স্থানে অনেকে সাদা কাগজ হাতে দাঁড়িয়ে থাকার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে। সংবিধানের বরাত দিয়ে ব্যানার লিখে আলমাতির রাস্তায় দাঁড়ানো এক ব্যক্তিকে কারাদণ্ডের পর অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। তিন দশকের স্বৈরাচারী শাসনে জর্জরিত জনগণ গণতন্ত্রের দাবিতে রাস্তায় ছোটখাটো বিক্ষোভ জানাচ্ছে। এ কারণে আটক করা হয়েছে বেশ কয়েকজনকে, স্বল্প মেয়াদে জেল খেটেছেন কেউ কেউ।

তেলসমৃদ্ধ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের দেশটির কর্তৃপক্ষ বেশ সংবেদনশীল অবস্থায় আছে। তিন দশক ক্ষমতায় থাকার পর কাজাখস্তানের ৭৮ বছর বয়সী সাবেক প্রেসিডেন্ট নুরসুলতান নাজারবায়েভ গত মার্চ মাসে পদত্যাগ করেন। নামকাওয়াস্তে একটি নির্বাচনের ব্যবস্থা করে তাঁর পছন্দের পাত্র ও অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট কাজিম জোমার্ট টোকায়েভের জয় নিশ্চিত করার ফন্দি আঁটছেন নাজারবায়েভ।

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এত কিছুর পরও নির্বাচনে নাজারবায়েভের পক্ষে জনসমর্থন হু হু করে বাড়তে। ৮১ শতাংশ থেকে বেড়ে তা ৯৮ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে কাউকে নির্ভরযোগ্য মনে করছেন না জনগণ। নাজারবায়েভের এক শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী বুকে দুটি ও মাথায় এক গুলি করে আত্মহত্যা করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। অবৈধ আন্দোলনে অংশগ্রহণের দায়ে আরেকজনের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়। আগেই ফলাফল অনুমান করতে পেরে নির্বাচন বর্জন করেছেন বাকিরা। এরপরও ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের এক প্রার্থীকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিয়েছিল কর্তৃপক্ষ।

তবে দেশবাসী চায়নি নতুন এই প্রার্থী—আমিরজান কোসানোভ—জিতুক। নির্বাচনকে বৈধতা দিতে তাঁকে প্রার্থী করা হলেও প্রার্থী হয়েই সরকারবিরোধী কথা বলা থামিয়ে দিয়েছেন কোসানোভ। সমর্থকেরা তাঁর পক্ষে প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়াতে পারবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা ছিল। শেষ পর্যন্ত সব জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে গত রোববার ৭০ শতাংশ ভোট পেয়ে ক্ষমতায় এসেছেন নাজারবায়েভের দল। সোভিয়েত আমলে জন্ম নেওয়া নেতাদের হাতে শোষিত হতে হতে ক্লান্ত তরুণসমাজ এর প্রতিবাদে নির্বাচনের পরদিন সোমবারও সড়কে অবস্থান করে। সেদিন ফলাফল হাতে পেয়ে পূর্ববর্তী নেতার বিজয়ের কথা জানতে পেরেও আশা ছাড়েননি তরুণেরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে তাঁদের আন্দোলন। হ্যাশট্যাগ দিয়ে সরকারকে সত্যের মুখোমুখি হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন তাঁরা।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন