default-image

রাশিয়ার কারাবন্দী বিরোধী নেতা অ্যালেক্সি নাভালনির দুর্নীতিবিরোধী ফাউন্ডেশন (এফবিকে) ও তার আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের সব ধরনের কার্যক্রম স্থগিতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেশটির সরকারি কৌঁসুলিরা গতকাল সোমবার এ নির্দেশ দেন বলে এফবিকের পরিচালক জানিয়েছেন। আজ মঙ্গলবার বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

এফবিকে ও তার আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোকে ‘উগ্রবাদী’ হিসেবে ঘোষণার বিষয়ে গতকাল মস্কোর একটি আদালতে প্রাথমিক শুনানি শুরু হয়েছে। এফবিকে ও তার আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোকে উগ্রবাদী সংগঠন হিসেবে ঘোষণার জন্য আদালতের কাছে আরজি জানিয়েছেন দেশটির সরকারি কৌঁসুলিরা। এ আরজির পরিপ্রেক্ষিতেই এ বিষয়ে মস্কোর আদালতে শুনানি শুরু হলো।

এফবিকের পরিচালক ইভান জাদানভ গতকাল তাঁর টুইটারে সরকারি কৌঁসুলির (প্রসিকিউটর) সিদ্ধান্তের স্ক্রিনশট যুক্ত করে একটি পোস্ট দিয়েছেন। পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘নাভালনির কার্যালয়গুলো ও এফবিকের কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে।’

মস্কো নগর আদালত নিশ্চিত করেছেন, গোষ্ঠীটির আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। আদালত ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সরকারি কৌঁসুলিদের রয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন আদালত।

মস্কোয় নাভালনির কার্যালয় তাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে এক বিবৃতিতে বলেছে, গোষ্ঠীটি এখন আর স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারবে না। এ সিদ্ধান্ত তাদের কর্মচারী ও সমর্থকদের জন্য খুবই ভয়ানক হবে।

বিবৃতিতে বলা হয়, তারা যার যার অবস্থান থেকে দুর্নীতি, ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টি ও প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে অঙ্গীকারবদ্ধ। এ লড়াই সহজ হবে না, তবে তারা অবশ্যই জয়ী হবে। কারণ, তারা সংখ্যায় অনেক। আর তারা শক্তিশালী।

রাশিয়ার সরকারি কৌঁসুলিরা গত শুক্রবার বলেন, তাঁরা এফবিকে ও তার আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোকে উগ্রবাদী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করতে চান। কারণ, এগুলো রাশিয়ার সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।

সরকারি কৌঁসুলিরা অভিযোগ করেন, নাভালনির সংগঠন রাশিয়ার সাংবিধানিক শৃঙ্খলার ভিত্তি উল্টে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের কার্যক্রমকে ‘অবাঞ্ছিত’ বলে আখ্যায়িত করেন সরকারি কৌঁসুলিরা।

রাশিয়ায় সন্ত্রাস ও উগ্রবাদের তালিকায় বর্তমানে ৩৩টি সংগঠনের নাম রয়েছে। তার মধ্যে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস ও আল-কায়েদাও রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আদালত যদি নাভালনির সংগঠন নিষিদ্ধ করেন, তবে তা ক্রেমলিনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একটি সুদূরপ্রসারী আঘাত হিসেবে গণ্য হবে।

সংগঠন নিষিদ্ধ হলে নাভালনির কোনো সহকর্মী-সমর্থক যদি তার কার্যক্রম চালান, তাহলে তাঁদের কারাদণ্ড হবে।

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, নাভালনির সংগঠনকে সত্যিই নিষিদ্ধ করা হলে তা হবে সোভিয়েত–পরবর্তী রাশিয়ায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংগঠন করার অধিকারের প্রতি অন্যতম গুরুতর আঘাত।

নাভালনির দুর্নীতিবিরোধী ফাউন্ডেশনের পরিচালক ইভান জাদানভ চলতি বছরের শুরুর দিকে রাশিয়া ছাড়েন। তিনি বলেন, চলমান ঘটনাপ্রবাহ তাঁকে সোভিয়েত আমলের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। তখন যাকে-তাকে গুপ্তচর বা বিদেশি এজেন্ট হিসেবে ঘোষণা করা হতো। তারপর গোপন বিচার হতো। পুতিন রাশিয়াকে সোভিয়েত আমলে ফিরিয়ে নিতে চান। উগ্রবাদী হিসেবে নাভালনির সংগঠন নিষিদ্ধ করা হলে রাশিয়ায় গণহারে দমন-পীড়নের দরজা খুলে যাবে।

৪৪ বছর বয়সী নাভালনি রাশিয়ার সুপরিচিত বিরোধী নেতা। তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের কট্টর সমালোচক।

রাশিয়ায় নাভালনির রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব কমাতে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নানা আগ্রাসী পদক্ষেপ নিচ্ছেন বলে অভিযোগ সমালোচকদের।

নাভালনি বর্তমানে রাশিয়ার কারাগারে রয়েছেন। তাঁর অনেক সহযোদ্ধাকেও কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

নাভালনি গত ৩১ মার্চ থেকে কারাগারে অনশন শুরু করেছিলেন। সুচিকিৎসা না পেয়ে তিনি অনশনে গিয়েছিলেন। তাঁর চিকিৎসকদের অনুরোধে ২৪ দিন পর গত শুক্রবার অনশন ভাঙেন তিনি। চিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলেছিলেন, অনশন না ভাঙলে তিনি মারা যেতে পারেন।

নাভালনির স্বাস্থ্য নিয়ে দেশবিদেশে উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে নাভালনিকে সম্প্রতি ভ্লাদিমির অঞ্চলের একটি কারা হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। রাশিয়ার কারা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, তাঁকে একজন চিকিৎসক নিয়মিত দেখছেন। তাঁকে ভিটামিন দেওয়া হয়েছে।

ক্রেমলিনের হুমকি উপেক্ষা করে গত ১৭ জানুয়ারি জার্মানি থেকে দেশে ফেরেন নাভালনি। বিমানবন্দরেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। অর্থ আত্মসাতের পুরোনো একটি মামলায় গত ফেব্রুয়ারি মাসে নাভালনিকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এই দণ্ডকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেন তিনি।

নাভালনিকে গত বছরের আগস্টে হত্যার চেষ্টা করা হয়। সে সময় তিনি সাইবেরিয়ার টমসক শহর থেকে উড়োজাহাজে করে মস্কোয় ফিরছিলেন। যাত্রাপথে উড়োজাহাজেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে বহনকারী উড়োজাহাজ সাইবেরিয়ার ওমস্কে জরুরি অবতরণ করে। সেখানকার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয় তাঁকে। তখন তিনি কোমায় চলে গিয়েছিলেন। পরে তাঁকে জার্মানির বার্লিনে নেওয়া হয়। সেখানে তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন।

বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভিত্তিতে গত সেপ্টেম্বরে জার্মানি জানায়, নাভালনি ‘নোভিচক’কে প্রয়োগ করা হয়েছিল। পরে অন্য দেশের বিশেষজ্ঞরাও একই কথা বলেন। বিষ প্রয়োগের জন্য সরাসরি পুতিনকে দায়ী করেন নাভালনি। তবে পুতিন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বানে ক্রেমলিন কর্ণপাত করেনি।

ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন