default-image

রাশিয়ার কারাবন্দী বিরোধী নেতা অ্যালেক্সি নাভালনির রাজনৈতিক ও দুর্নীতিবিরোধী নেটওয়ার্ক নিষিদ্ধ করতে পারেন দেশটির আদালত। আজ রোববার বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে এই আশঙ্কার কথা জানানো হয়।

মস্কোর একটি আদালতে কাল সোমবার এ-সংক্রান্ত একটি মামলার রুদ্ধদ্বার শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। মামলায় নাভালনির রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও দুর্নীতিবিরোধী ফাউন্ডেশনকে ‘উগ্রবাদী’ সংগঠন হিসেবে ঘোষণার আরজি জানিয়েছেন সরকারি কৌঁসুলিরা। এই আরজি অনুযায়ী আদালত নাভালনির নেটওয়ার্ক নিষিদ্ধ করতে পারেন বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আদালত যদি নাভালনির নেটওয়ার্ক নিষিদ্ধের আদেশ দেন, তবে তা ক্রেমলিনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একটি সুদূরপ্রসারী আঘাত হিসেবে গণ্য হবে।

মামলায় যেসব তথ্য-প্রমাণ ব্যবহার করা হচ্ছে, তা রাষ্ট্রীয় গোপনীয় নথি বলে জানা গেছে। নাভালনির আইনজীবীকে বলা হয়েছে, শুনানির আগে তিনি মামলার নথিপত্র দেখার সুযোগ পাবেন।

নাভালনির রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও দুর্নীতিবিরোধী ফাউন্ডেশনকে ‘উগ্রবাদী’ সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করা হলে সেগুলো রুশ কর্তৃপক্ষের কাছে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস), আল-কায়েদা ও তালেবানের মতো বলে বিবেচিত হবে।

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, নাভালনির রাজনৈতিক ও দুর্নীতিবিরোধী নেটওয়ার্ক যদি সত্যিই নিষিদ্ধ করা হয়, তবে তা হবে সোভিয়েত পরবর্তী রাশিয়ায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংগঠন করার অধিকারের প্রতি অন্যতম গুরুতর আঘাত।

এমনকি ‘রাশিয়া সুখী হবে’ বলে নাভালনির স্লোগান লেখা টি-শার্ট পরাও দেশটিতে নিষিদ্ধ হতে পারে। তেমনটা হলে কেউ এমন টি-শার্ট পরলে তাঁকে জেলে যেতে হতে পারে।

সংগঠন নিষিদ্ধের ঘোষণার পর নাভালনির কোনো সহকর্মী যদি কার্যক্রম চালান, তাহলে তাঁদের কারাদণ্ড হতে পারে।

নাভালনিকে ইতিমধ্যে জেলে পুরেছে রুশ কর্তৃপক্ষ। তাঁর অনেক সহযোদ্ধাকেও কারাগারে পাঠানো হয়েছে। নাভালনির সমর্থনে বিক্ষোভ ডাকলে তা বেআইনি হবে বলে বলছে কর্তৃপক্ষ। বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে নাভালনির হাজারো সমর্থককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জেল-জরিমানাসহ সরকারের রোষানল থেকে বাঁচতে নাভালনির অনেক সহকর্মী রাশিয়া ছেড়েছেন।

রাশিয়ায় নাভালনির রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব কমাতে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নানা আগ্রাসী পদক্ষেপ নিচ্ছেন বলে অভিযোগ সমালোচকদের।

বিজ্ঞাপন

চলতি বছরের শুরুর দিকে রাশিয়া ছাড়েন নাভালনির দুর্নীতিবিরোধী ফাউন্ডেশনের পরিচালক ইভান জাদানভ। তিনি বলেন, চলমান ঘটনাপ্রবাহ তাঁকে সোভিয়েত আমলের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। তখন যাকে-তাকে গুপ্তচর বা বিদেশি এজেন্ট হিসেবে ঘোষণা করা হতো। তারপর গোপন বিচার হতো।

ইভান বলেন, পুতিন রাশিয়াকে সোভিয়েত আমলে ফিরিয়ে নিতে চান।

ইভানের ভাষ্য, উগ্রবাদী হিসেবে নাভালনির সংগঠন নিষিদ্ধ করা হলে রাশিয়ায় গণহারে দমন-পীড়নের দরজা খুলে যাবে।

ইভান বলেন, রুশ কর্তৃপক্ষ সত্যিকার অর্থেই তাঁদের ধ্বংস করে দিতে চায়। কারণ, তাঁদের কার্যক্রম কর্তৃপক্ষকে ঝুঁকিগ্রস্ত করে তুলছে।

৪৪ বছর বয়সী নাভালনি রাশিয়ার সুপরিচিত বিরোধী নেতা। তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের কট্টর সমালোচক।

নাভালনি বর্তমানে রাশিয়ার কারাগারে। তিনি ৩১ মার্চ থেকে কারাগারে অনশন শুরু করেছিলেন। সুচিকিৎসা না পেয়ে তিনি অনশনে গিয়েছিলেন। তাঁর চিকিৎসকদের অনুরোধে ২৪ দিন পর গত শুক্রবার অনশন ভাঙেন তিনি। চিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলেছিলেন, অনশন না ভাঙলে তিনি মারা যেতে পারেন। নাভালনির স্বাস্থ্য নিয়ে গত বুধবার জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক একদল বিশেষজ্ঞও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।

নাভালনির স্বাস্থ্য নিয়ে দেশ-বিদেশে উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে নাভালনিকে গত সোমবার ভ্লাদিমির অঞ্চলের একটি কারা হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। রাশিয়ার কারা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, তাঁকে একজন চিকিৎসক নিয়মিত দেখছেন। তাঁকে ভিটামিন দেওয়া হয়েছে। তিনি তা নিতে সম্মত হয়েছেন।

ক্রেমলিনের হুমকি উপেক্ষা করে গত ১৭ জানুয়ারি জার্মানি থেকে দেশে ফেরেন নাভালনি। বিমানবন্দরেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। অর্থ আত্মসাতের পুরোনো একটি মামলায় গত ফেব্রুয়ারি মাসে নাভালনিকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এই দণ্ডকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেন তিনি।

নাভালনিকে গত বছরের আগস্টে হত্যার চেষ্টা করা হয়। সে সময় তিনি সাইবেরিয়ার টমসক শহর থেকে উড়োজাহাজে করে মস্কোয় ফিরছিলেন। যাত্রাপথে উড়োজাহাজেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে বহনকারী উড়োজাহাজ সাইবেরিয়ার ওমস্কে জরুরি অবতরণ করে। সেখানকার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয় তাঁকে। তখন তিনি কোমায় চলে গিয়েছিলেন। পরে তাঁকে জার্মানির বার্লিনে নেওয়া হয়। সেখানে তিনি ধীরে ধীরে সেরে ওঠেন।

বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভিত্তিতে গত সেপ্টেম্বরে জার্মানি জানায়, নাভালনিকে রাশিয়ান নার্ভ এজেন্ট ‘নোভিচক’ প্রয়োগ করা হয়েছিল। পরে অন্য দেশের বিশেষজ্ঞরাও একই কথা বলেন। বিষ প্রয়োগের জন্য সরাসরি পুতিনকে দায়ী করেন নাভালনি। তবে পুতিন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বানে ক্রেমলিন কর্ণপাত করেনি।

ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন